default-image

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মাওলানা ভাসানী হলের ৩২০ নম্বর কক্ষটি বেশ সাজানো–গোছানো। পরিপাটি ওই কক্ষের মেঝেতে সবুজ কার্পেট বিছানো। আছে এলইডি টিভিও। আয়েশি ভঙ্গিতে টিভি দেখতে পাতা হয়েছে ম্যাট্রেস। চার আসনবিশিষ্ট ওই কক্ষটি ‘রাজনৈতিক কার্যালয়’ হিসেবে ব্যবহার করেন বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি আখতারুজ্জামান সোহেল। পাশেই ৪ আসনবিশিষ্ট ৩২৩ নম্বর কক্ষে থাকেন তিনি।

আখতারুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, ‘হলের কোনো কক্ষ অফিস হিসেবে ব্যবহার করছি না। ওই কক্ষ চারজনের জন্য বরাদ্দ দেওয়া। তাঁরা ছাত্রলীগকে ভালোবাসেন, আমাকেও ভালোবাসেন। সে জন্য কক্ষটি একটু ভিন্নভাবে সাজিয়েছেন।’

তবে ভিন্ন চিত্র সাধারণ শিক্ষার্থীদের কক্ষগুলোতে। বিশ্ববিদ্যালয়ের মীর মশাররফ হোসেন হলের বি-ব্লকে পাশাপাশি ২ আসনবিশিষ্ট ৮টি কক্ষের প্রত্যেকটিতে থাকেন ১০-১২ জন করে শিক্ষার্থী। এর বাইরে গণরুমে থাকেন আরও প্রায় ৭০ জন। তীব্র আসনসংকটের কারণে গাদাগাদি করেই থাকতে হচ্ছে তাঁদের। সব মিলিয়ে ৭২০ আসনের হলে প্রায় ১ হাজার শিক্ষার্থী বসবাস করেন।

মীর মশাররফ হোসেন হলের মতো বিশ্ববিদ্যালয়ের বাকি হলগুলোর চিত্র প্রায় একই। বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৬টি আবাসিক হলে ৮ হাজার ৫৫২ আসনের বিপরীতে প্রায় ১৩ হাজার শিক্ষার্থী থাকছেন। গণরুম, মিনি গণরুম, ডাইনিং (খাবার ঘর), হল সংসদে গাদাগাদি করেই থাকতে হচ্ছে। কিন্তু আয়েশেই থাকেন ছাত্রনেতারা। এ ছাড়া হলের আসন বণ্টনসহ ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ আছে।

মীর মশাররফ হোসেন হলের গণরুমে থাকা এক শিক্ষার্থী প্রথম আলোকে বলেন, গণরুমে তাঁরা প্রায় ৭০ শিক্ষার্থী আছেন। অস্বাস্থ্যকর¯পরিবেশে থেকে পড়াশোনা করাটা খুবই কঠিন। কবে আসন পাবেন জানেন না তিনি।

ছাত্রলীগের জন্য কক্ষ ‘বরাদ্দ’ ছাত্রলীগের জন্য কক্ষ ‘বরাদ্দ’

ছেলেদের সব হলে ছাত্রলীগের জন্য আলাদা কক্ষ আছে। এসব কক্ষে সাধারণ শিক্ষার্থীরা আসন পান না। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মীর মশাররফ হোসেন হলে ১ আসনের ৩৭টি ও ২ আসনের ২৬টি, বঙ্গবন্ধু হলে ৪ আসনের ৪৯টি, আল বেরুনী হলে ২ আসনের ৩২টি, সালাম বরকত হলে ২ আসনের ৫২টি, ভাসানী হলে ৪ আসনের ২৭টি, রফিক জব্বার হলে ৪ আসনের ৩০টি, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হলে ৪ আসনের ৪৫টি, কামালউদ্দিন হলে ২ আসনের ৩০টি কক্ষে শুধু ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরাই থাকেন। সব মিলিয়ে ছেলেদের ৮টি হলের ৩২৫টি কক্ষে ৯২১টি আসন ছাত্রলীগের বরাদ্দ করা। যদিও হল প্রশাসন এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

শিক্ষার্থীরা বলছেন, ছাত্রলীগের কক্ষগুলোতে কেউ উঠতে পারেন না। এক যুগ ধরে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা সংগঠন–পরম্পরায় এসব কক্ষে থাকেন। প্রশাসনকেও এ ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি।

ছাত্রলীগের নির্দিষ্ট কক্ষের বিষয়ে কিছুই জানেন না দাবি করেছেন আকতারুজ্জামান। তিনি বলেন, যদি ছাত্রলীগের নাম ভাঙিয়ে কোনো নেতা-কর্মী কক্ষ দখল করেন, তাহলে তাঁর বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

হল প্রাধ্যক্ষ কমিটির সভাপতি আবদুল্লাহ হেল কাফী বলেন, হলগুলোতে আসনসংকট আছে। এর মধ্যে কেউ যদি আসন দখল করে থাকেন, তাহলে সেটি অন্যায়। তাঁরা খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নেবেন। তিনি আরও বলেন, যাঁরা রাজনীতি করেন, তাঁদের পাশের কক্ষের অনেকেই রাজনীতিতে যুক্ত হন, এভাবে পাশাপাশি কক্ষ হয়ে যায়। তাঁদের জন্য কোনো কক্ষ নির্দিষ্ট নয়।

আসন বণ্টনে ছাত্রলীগ

শিক্ষার্থীরা বলছেন, হলে আসন পাওয়ার ক্ষেত্রে নেতা-কর্মীদের সঙ্গে ব্যক্তিগত পরিচয়, শিক্ষার্থীর রাজনৈতিক পরিচয়কে বিবেচনায় নেওয়া হয়। ৪৯তম ব্যাচের শিক্ষার্থী হাসিবুল হাসান প্রথম আলোকে বলেন, ‘১টি কক্ষে ১০-১২ জন থাকাটা কষ্টের। আশা করছি, দ্রুত সিট পেয়ে যাব। বড় ভাইদের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো হলে সিট পাওয়াটা সহজ হয়।’

আকতারুজ্জামান বলেন, ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের আসন নিয়ন্ত্রণ করার সুযোগ নেই। প্রশাসনই আসন বণ্টন করে। ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে তাঁরা বিভিন্ন সময় প্রশাসনকে সুষ্ঠুভাবে আসন বণ্টনের তাগাদা দেন।

ছাত্র ইউনিয়নের বিশ্ববিদ্যালয় সংসদের সভাপতি রাকিবুল হক বলেন, হলে আসন বণ্টনসহ ছাত্রলীগের আধিপত্যের ব্যাপারে প্রশাসন মোটেও নারাজ নয়। হল প্রশাসনের সামর্থ্য কিংবা জনবল নেই এমন নয়, কিন্তু তারা কাজ করতে আগ্রহী নয়। নিজেদের অন্যায়, দুর্নীতি ঢাকতে প্রশাসন ও ছাত্রলীগ একে অন্যের পরিপূরক হয়ে কাজ করে।

অভিযোগের বিষয়ে আবদুল্লাহ হেল কাফী বলেন, হলের সিট বরাদ্দের বিষয়টি হল প্রশাসনই দেখে। ছাত্রলীগ সংশ্লিষ্ট থাকার কথা না। নতুন হল নির্মাণ হয়েছে, দ্রুতই আসন সংকটের সমাধান হয়ে যাবে।

রাজধানী থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন