আলোকচিত্রে মৃত্যুদণ্ড থেকে বেঁচে ফেরা মানুষদের গল্প
দেশের কারাগারগুলোতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের জন্য রয়েছে কনডেমড সেল। সেই কক্ষের অন্ধকার থেকে ফিরে আসার গল্প নিয়ে জাতীয় জাদুঘরের নলিনীকান্ত ভট্টশালী প্রদর্শন কক্ষে শুরু হয়েছে আলোকচিত্র প্রদর্শনী ‘মৃত্যুদণ্ড থেকে বেঁচে ফেরা’। ব্যতিক্রমী এই আলোকচিত্র প্রদর্শনীর কোনো আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনী পর্ব ছিল না। সোমবার বিকেল থেকে দর্শকদের জন্য প্রদর্শনীর দরজা খুলে দেওয়া হয়েছে।
বিভিন্ন অভিযোগে গ্রেপ্তারের পর নিম্ন আদালতে মৃত্যুদণ্ড পেয়ে দীর্ঘ আইনি লড়াই করে উচ্চ আদালতে নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছেন, এমন মানুষদের নিয়ে এই প্রদর্শনী। আলোকচিত্রী মোশফিকুর রহমান জোহান ২০২২ সাল থেকে এমন ১৩টি পরিবারের জীবনযাত্রা ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করে ক্যামেরায় এসব মানুষের দুঃখ–দুর্দশা, আতঙ্ক, অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মতো বিষয়গুলো তুলে ধরেছেন। তিনি এর আগে গুম হওয়া মানুষদের পরিবার ও গুমের শিকার হওয়ার পর ফিরে আসা লোকদের জীবনযাত্রা নিয়েও আলোকচিত্র প্রদর্শনী করেছিলেন। এটি তাঁর পঞ্চম একক আলোকচিত্র প্রদর্শনী।
যাঁদের নিয়ে এই প্রদর্শনী, তাঁরা হলেন মাজেদা বেগম, শেখ জাহিদ, আনোয়ার হোসেন, সোনারুদ্দি, ইসমাইল হোসেন, আবদুর রহিম, সানাউল্লাহ, আউয়াল হোসাইন, মোহাম্মদ নাসির, আবদুল হাই, গোলাম আজম, মোহাম্মদ হারুন ও মো. আলমগীর। তাঁদের বিস্তারিত পরিচয় প্রদর্শনীতে তুলে ধরা হয়নি। তবে কিছু কিছু বিবরণ ও তাঁদের অনুভূতির কথা রয়েছে। মৃত্যুদণ্ড মাথায় নিয়ে তাঁদের কেউ কেউ ৮ থেকে ১৫ বছরের বেশি সময় ফাঁসির আসামির কনডেমড সেলে কাটিয়েছেন মৃত্যুভয়, উদ্বেগ আর দুর্বিষহ যন্ত্রণার ভেতর দিয়ে। অবশেষে দীর্ঘ আইনি যুদ্ধ শেষে তাঁরা নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছেন। কারামুক্ত হয়ে কনডেমড সেল থেকে ফিরে এসেছেন পরিবারের কাছে। মোশফিকুর রহমান শতাধিক আলোকচিত্রে তাঁদের জীবনের নিদারুণ গল্প নিয়ে এলেন দর্শকদের সামনে। প্রদর্শনীর কিউরেটর আলোকচিত্রী হাদি উদ্দিন।
প্রদর্শনীতে কনডেমড সেল থেকে ফিরে আসা মানুষদের ছবিতে ফুটে উঠেছে তাঁদের যন্ত্রণা, উদ্বেগ। তাঁদের পরিবারের সদস্যদের বিভিন্ন সময়ের ছবি। মুক্তির পরে তাঁদের কেউ কেউ তাঁদের বাড়ির পাশের প্রিয় স্থানগুলোতে ঘুরে দেখছেন, তাকিয়ে আছেন মুক্ত আকাশের দিকে, কিছু ছবি আছে প্রতীকধর্মী। বন্দী অবস্থা ও মুক্তির ইঙ্গিতময়। কেউ কেউ ফিরেছেন জীবিকার কাজে। এসব ছাড়াও আছে ঢাকার নাজিরা বাজারের পুরোনো কেন্দ্রীয় কারাগারের ভেতরের কিছু দৃশ্য। ভবনের সংকীর্ণ সিঁড়ি। প্রাচীর দিয়ে ঘেরা কনডেমড সেল। তার ভেতরের অবস্থা। সেখানে একজন মানুষের কোনোরকমে শুয়ে থাকার মতো স্থান। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের ব্যবহৃত থালা, বাটি, মগ ইত্যাদি। দুটি ফাঁসির মঞ্চের বিশালকায় ছবি আছে প্রদর্শনী কক্ষের মাঝবরাবর। অনেকের প্রাণদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে সেখানে। এর চারপাশের দেয়ালজুড়ে রয়েছে ফাঁসির দড়ি থেকে ফিরে আসা মানুষদের ছবিগুলো।
আলোকচিত্র ছাড়াও প্রদর্শনীতে আছে কারাগার থেকে ফিরে আসা কারও কারও চিঠি, হাসপাতালে চিকিৎসার ব্যবস্থাপত্র, কারাগারে ব্যবহৃত বিভিন্ন নথিপত্রের মতো সংশ্লিষ্ট অনেক উপাদান। প্রদর্শনীটি ১৫ জুন পর্যন্ত চলবে। শনিবার থেকে বুধবার সকাল সাড়ে ১০টা থেকে বিকেল সাড়ে ৫টা এবং বৃহস্পতি ও শুক্রবার বেলা আড়াইটা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা পর্যন্ত সবার জন্য খোলা থাকবে। ১১ জুন বিকেল চারটায় মৃত্যুদণ্ড থেকে ফিরে আসা বেশ কয়েকজনকে নিয়ে আইনবিদ ও সুধীজনদের অংশগ্রহণে থাকবে বিশেষ আলোচনা পর্ব।
আলোকচিত্রী মোশফিকুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, দেশের বিচারব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা, মিথ্যা মামলা, পুলিশি নির্যাতনের দিকগুলো তুলে ধরা এবং এ বিষয়ে জনসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যেই এই প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে। তিনি জানান, বেসরকারি সংস্থা ‘অধিকার’–এর জরিপ অনুসারে দেশের কারাগারগুলোতে এখন ২ হাজার ৬০০-এর বেশি মানুষ মৃত্যুদণ্ডাদেশ নিয়ে কনডেমড সেলে আছেন। বিচারপ্রক্রিয়া এতই ধীরগতির যে তাঁদের মধ্যে ৫৬০ জন ১৫ বছরের বেশি সময় ধরে কনডেমড সেলে বন্দী। বিচারপ্রক্রিয়া পুরোপুরি শেষে ২০০৯ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ৪৭ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে।
‘মৃত্যুদণ্ড থেকে বেঁচে ফেরা’ নামের এই আলোকচিত্র প্রদর্শনী আয়োজিত হচ্ছে ব্লাস্ট, দ্য ডেথ পেনাল্টি প্রজেক্ট ও ডি কেজ–এর সহায়তায়।