বিদেশগামীদের ভরসা ‘মাইনাসের’ বাজার

রাজধানীর বঙ্গবাজারের পাশের এনেক্সকো টাওয়ারে শীতের পোশাক। যাঁরা শীতপ্রধান দেশে যান, তাঁরা এগুলো কিনে নিয়ে যানছবি: প্রথম আলো

নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারের বাসিন্দা শুভাষ চন্দ্র (২৮)। তিনি রাশিয়ার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স প্রোগ্রামে ভর্তি হয়েছেন। গত মাসের (জানুয়ারি) ২২ তারিখ ছিল তাঁর ফ্লাইট। রাশিয়ার সারাতোভ শহরে তাঁর মামা থাকেন। তিনি আগেই জানিয়ে দেন, শুভাষ যেহেতু এ শহরেই থাকবেন, তাই আগাম প্রস্তুতি নিতে হবে। কারণ, শহরটিতে দিনের তাপমাত্রা মাইনাস ২–৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। রাতে তা মাইনাস ১৩–১৪ ডিগ্রিতে নেমে আসে।

রাশিয়ায় যাওয়ার প্রস্তুতির অংশ হিসেবে শুভাষ গত মাসে রাজধানী ঢাকায় শীতের কাপড় কিনতে এসেছিলেন। বঙ্গবাজারের পাশের এনেক্সকো টাওয়ারে দেখা মিলেছিল তাঁর। তখন তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘এখানে আসছি মাইনাসের জ্যাকেট, হ্যান্ডগ্লাভস, জুতা, ট্রাউজার এসব কিনতে। মানে শীতে যা যা লাগে আর কি।’

শুভাষ তখন জানিয়েছিলেন, তাঁর আরও চার বন্ধু পথে আছেন। তাঁরাও আসছেন কেনাকাটা করতে। রাশিয়ার ঠান্ডাকে মাথায় রেখে তাঁরাও এখান থেকে শীতের কাপড় কিনবেন।

এনেক্সকো টাওয়ারে শীতের পোশাক কিনতে এসেছেন ক্রেতা
ছবি: প্রথম আলো

দেশ থেকে প্রতিবছর অনেক মানুষ নানা উদ্দেশ্যে বিদেশে পাড়ি জমান। তাঁদের অনেকের গন্তব্য রাশিয়া, জার্মানি, ফিনল্যান্ড, ইতালির মতো শীতপ্রধান নানা দেশ। এসব দেশের তাপমাত্রা বেশির ভাগ সময়ই থাকে হিমাঙ্কের নিচে। সেই তাপমাত্রা মাথায় রেখে বিদেশগামী যাত্রীরা দেশ থেকে কেনেন শীতের বস্ত্রসহ অন্যান্য সামগ্রী। দোকানি ও ক্রেতাদের কাছে এসব শীতের পণ্য পরিচিত ‘মাইনাসের প্রোডাক্ট’ নামে।

আগে বঙ্গবাজারে ছিল এই ‘মাইনাস’–এর বাজার। আগুনে বঙ্গবাজার পুড়ে যাওয়ার পর দোকানিরা পাশের এনেক্সকো টাওয়ারে স্থানান্তরিত হয়েছেন। এই ভবনের পঞ্চম তলায় ৪০–৪২টি দোকানে বিক্রি হয় এসব শীতের পণ্য।

এনেক্সকো টাওয়ারের কে এস উইন্টার ফ্যাশনের বিক্রেতা মো. রেদোয়ান (৩০)। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘যাঁরা শীতের দেশে যান, তাঁরাই মূলত এখানে আসেন। কানাডা, ইউএসএ আছে। তারপর রাশিয়া বা ইউরোপের দেশগুলোতে যাঁরা যান, তাঁরা সবাই কম–বেশি এখানে আসেন।…বাইরের দেশে তো এগুলোর দাম অনেক বেশি। নর্থ ফেসের একটা জ্যাকেটের দাম পড়বে বাংলাদেশি টাকায় ৭০-৮০ হাজার। আর আমাদের এখান থেকে একই রকমের জ্যাকেট কিনছে পাঁচ–ছয় হাজার টাকা দিয়ে।’

এনেক্সকো টাওয়ারের দোকানে সাজিয়ে রাখা হয়েছে শীতের পোশাক
ছবি: প্রথম আলো

খোঁজ নিয়ে জানা গেলে, এখানে বছরের বারো মাসই এসব পণ্যের বেচাবিক্রি চলে। মূলত কম দামে পাওয়ায় এখান থেকে ক্রেতারা এসব পণ্য কেনেন।

দোকানে মানভেদে জ্যাকেটের দাম ২ হাজার থেকে ১২ হাজার টাকা। থার্মাল ইনার ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা। ওয়াটারপ্রুফ (পানিরোধী) প্যান্ট ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা। শেরপা হুডি ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা।

এ ছাড়া জুতা ২ হাজার থেকে ৪ হাজার টাকা। পায়ের মোজা ১৫০ টাকা। ওয়াটারপ্রুফ (পানিরোধী) গ্লাভস ৪০০–৭০০ টাকা। টুপি ৪০০ টাকা।

বিক্রেতারা জানান, তাঁরা বিভিন্ন বায়িং হাউস থেকে এসব পণ্য আনেন।

আশরাফ গার্মেন্টসের বিক্রেতা আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘প্রোডাক্টগুলো মূলত নিয়ে আসি বায়িং হাউস থেকে। চট্টগ্রামে ফ্যাক্টরিগুলো আছে। শিপমেন্ট বাতিল হওয়া কিছু মাল থাকে, ওগুলা আনি। এগুলো ছাড়া ফ্রেশ অর্ডারের মালও থাকে।’

কেবল দেশি ক্রেতাই নন, এখানে বিদেশি ক্রেতারাও আসেন। বিক্রেতারা জানালেন, বিদেশি নাগরিক যাঁরা বাংলাদেশে ঘুরতে আসেন, তাঁদের অনেকে দেশে ফেরার সময় এখান থেকে শীতের পোশাক কিনে নিয়ে যান।

বিদেশগামী যাত্রীরা দেশ থেকে কেনেন শীতের বস্ত্রসহ অন্যান্য সামগ্রী
ছবি: প্রথম আলো

বিক্রেতা আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘কিছুদিন আগে ইরান থেকে আসা একটা পরিবার কেনাকাটা করতে আসছিল। আমাদের এখান থেকে তারা ভালোই কেনাকাটা করেছে। তারা কেনাকাটা করে খুব হ্যাপি হয়েছিল। আমাদের এখানকার দাম, আমাদের ব্যবহার—সবকিছুতে তারা অনেক সন্তুষ্ট হয়েছিল।’

সাহাদ ইশরাক (৩৮) ও তাঁর বন্ধু মাহমুদুল হাসান (৩৭) এনেক্সকো টাওয়ারে এসেছিলেন কেনাকাটা করতে। মাহমুদুল ফিনল্যান্ডে চাকরি করেন। তিনি জানান, ফেব্রুয়ারি মাসে তিনি ফিনল্যান্ডে যাবেন। সে উপলক্ষেই কেনাকাটা করতে আসা।

মাহমুদুল বলেন, ‘এখানকার পণ্যগুলো ঘরে পরার জন্য উপযোগী। এই জিনিসগুলো খুব বেশি আমাদের কাজে লাগে, এমন না। আউটডোরে (ঘরের বাইরে) খুব বেশি জিনিস পরা যায় না। আউটডোরের জন্য ওইখানে গিয়ে কেনা লাগে। কিন্তু বাসায় পরার জন্য এগুলো মোটামুটি ঠিক আছে।’

ফার্মগেটের গ্রিন রোডের দোকানে শীতের পোশাক
ছবি: প্রথম আলো

এনেক্সকো টাওয়ার ছাড়াও নিউমার্কেট, নূরজাহান মার্কেট, উত্তরা–বারিধারার বিভিন্ন আউটলেটে পাওয়া যায় এসব পণ্য। ফার্মগেটের গ্রিন রোডের রাফাহ ফ্যাশনে সারা বছর এসব পণ্যের বিক্রি চলে। সেখানে পাওয়া গেল কামরুল হাসানকে (৪৫)। তিনি রোমানিয়া যাবেন। এ কারণে কেনাকাটা করছেন। এসেছেন জ্যাকেট ও ইনার সেট কিনতে।

রাফাহ ফ্যাশনের বিক্রেতা রিয়াদ হোসেন (৩৬) বলেন, ‘আমাদের এখানে পুরো সেট পাওয়া যায়। ক্রেতার প্রয়োজন ও দেশের তাপমাত্রা অনুযায়ী আমরা এসব সেট তৈরিও করে দিতে পারি।’