২০২২–২৩ অর্থবছরে বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভের চলমান গবেষণা প্রকল্পের চলমান সেমিনারে আজ উপস্থাপন করা হয় গবেষণাপত্র ‘বাংলাদেশে নারী নির্মাতার চলচ্চিত্রে নারীর ক্ষমতায়ন: একটি পর্যালোচনা’। এটি উপস্থাপন করেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মো. তুহিনুর রহমান। গবেষণাপত্রে ১৯৭০ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত নারী নির্মাতাদের ৭৪টি চলচ্চিত্র তুলে ধরেন তিনি। সেগুলোর অন্যতম নারগিস আক্তার পরিচালিত সিনেমা ‘মেঘলা আকাশ’।

গবেষণায় মো. তুহিনুর রহমান দেখিয়েছেন, বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের নির্মাণ ইতিহাসে নারীদের অংশগ্রহণ অপ্রতুল। বিগত গবেষণাগুলোয় দেশের চলচ্চিত্রে নারীকে পণ্য ও বাণিজ্যিকভাবে উপস্থাপনের প্রমাণ পেয়েছেন তিনি। অন্যদিকে চলচ্চিত্রে অভিনেত্রী হিসেবে নারীর উপস্থিতি কতটা নারী, আর কতটা মানুষ হিসেবে, সেটিকেই নতুন গবেষণায় প্রাসঙ্গিক বিষয় হিসেবে তুলে ধরেছেন তিনি।

নারগিস আক্তারের ‘মেঘলা আকাশ’ সিনেমায় নারীর ক্ষমতায়ন প্রসঙ্গে গবেষক বলেছেন, নারী নির্মাতার হাতে নির্মিত এ সিনেমায় নারীর ক্ষমতায়নের চিত্র নেই।

পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীর ক্ষমতাহীন রূপ উপর্যুক্ত সংলাপে যেমন স্পষ্ট হয়, তেমনি প্রতীয়মান হয় পুরুষের আধিপত্য। নারীর ক্ষমতায়নের ছবি তুলে ধরার বদলে নির্মাতা সেখানে বাস্তব সমাজের চিত্রই তুলে ধরেছেন। ‘মেঘলা আকাশ’ ছবিতে সংলাপ বলেছেন এ রকম নারী চরিত্র ২৮টি। এগুলোর মধ্যে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা দেখানো হয়েছে কেবল যৌনকর্মীদের নেত্রীর। মো. তুহিনুর রহমান প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন, পুরুষতন্ত্রের কারণে কি নারী নির্মাতা সার্বভৌমত্ব অর্জন করতে পারেননি?

এ প্রসঙ্গে নারগিস আক্তার বলেন, ‘২২ বছর আগের অনেক কিছুই আজ আর আগের মতো নেই, এমনকি আমার মানসিকতাও বদলেছে অনেক। তবে আমি যখন শুটিং ফ্লোরে দাঁড়াতাম, তখন ভিড় লেগে যেত। কেবল দেখার জন্য, নারী কি পরিচালনা করতে পারেন? আমি লাইট, অ্যাকশন, কাট—এগুলো বলছি, নাকি আমার পক্ষে অন্য কেউ কাজটি করে দিচ্ছেন!’

চলচ্চিত্র নির্মাণসংক্রান্ত প্রায় প্রতিটি কাজে নারগিস আক্তার ছিলেন সিদ্ধহস্ত। সে প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ক্যামেরা, সম্পাদনা, অভিনয়, কোরিওগ্রাফি থেকে প্রায় সব কাজের দক্ষতা আমার ছিল। ফলে আমাকে কোনো সহকারী পরিচালকের ওপর নির্ভরশীল থাকতে হয়নি। আমি ক্রেনের ওপরে উঠলে সেটে অনেকে চিৎকার করে বলত, “পরে যাবেন, উঠলেন কেন!” ভাবতেও পারত না যে কোনো ভুল হলে সেটা আমি সংশোধন করে নতুন শট নিতে পারব। নির্মাতা হিসেবে আমি নিজের ক্ষমতায়নের জায়গাটিতে সচেতন ছিলাম। পরিচালক হিসেবে সব সিদ্ধান্ত নিজেই নিয়েছি। কখনো সহযোগিতা আবার কখনো কর্তৃত্বের মাধ্যমে কাজ বের করে নিয়েছি।’

নারীর ক্ষমতায়ন ও নিজের দাপুটে ক্যারিয়ার সম্পর্কে ধারণা দিতে নারগিস আক্তার বলেন, ‘আমি গাড়ি থেকে নামলে অনেকে বলত, “ওই যে আসছে।” আমার বন্ধু অভিনেত্রী মৌসুমী বলত, “তোমার এই জায়গাটি ধরে রেখো। সবাই যেন সব সময় এই কথাটি বলে যে “ওই যে আসছে।”’

বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভের মহাপরিচালক মো. নিজামূল কবীরের সভাপতিত্বে সেমিনারে আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন এই গবেষণাপত্রের তত্ত্বাবধায়ক নির্মাতা শামীম আখতার। স্বাগত বক্তব্য দেন বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভের পরিচালক মো. মোফাখখারুল ইকবাল।

বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভের চলমান গবেষণা প্রকল্পের সেমিনারে রোববার সকাল ১০টায় রয়েছে ‘স্বাধীনতা–উত্তর বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে দেশাত্মবোধক গানের বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ’, মঙ্গলবার ‘হুমায়ূন আহমেদের চলচ্চিত্রের শিল্পরূপ’, বৃহস্পতিবার ‘বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে লোক–উৎসব: নান্দনিক পরিসর ও তাত্ত্বিক পর্যালোচনা’। এ ছাড়া নভেম্বর মাসের ৭ ও ৯ তারিখ রয়েছে যথাক্রমে ‘সত্তরের দশকে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র: শিল্পরূপ ও সাংস্কৃতিক প্রভাব’ ও ‘ওটিটি প্ল্যাটফর্মে বাংলাদেশি চলচ্চিত্র’।