মীনা দিবস আজ
বাধা পেরিয়ে এগোচ্ছে মেয়েরা
বাল্যবিবাহ, দারিদ্র্যসহ নানা কারণে পড়ালেখা বন্ধ হয়ে যায় মেয়েদের।
২০২৫ সালে ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীদের ৪৭ শতাংশের বিয়ে হয়েছে ১৮ বছরের আগে।
১৩ শতাংশ নারীর বিয়ে হয়েছে ১৫ বছরের আগে।
সুমাইয়া (১৬) আর সোমা (১৪) দুই বন্ধু। কমলাপুর স্টেশনে থাকে। সুমাইয়ার বাড়ি কিশোরগঞ্জের ভৈরবে। কত বছর আগে স্টেশনে এসেছে, মনে করতে পারে না। সুমাইয়া বলল, ‘আমি আর আমার বোন লুকাইয়া আইয়া পড়ছিলাম। বাড়িতে সৎ মায়ে মারে।’ সুমাইয়ার বড় বোন আবার ভৈরবে ফিরে গেছে। বোনের সঙ্গে স্কুলে যাওয়ার স্মৃতি মনে করে সুমাইয়া বলল, ‘আমার বড় বইনে টু পর্যন্ত পড়ছে। আমি ওয়ানে পড়ছি। পরীক্ষা দেই নাই দেইখা আমার নাম কাইটা দিছে।’
সোমার গল্পও প্রায় একই রকম। সোমার বাড়ি হবিগঞ্জে। এক বছর ধরে কমলাপুর স্টেশনে আছে। দ্বিতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার পর আর স্কুলে যাওয়া হয়নি। স্টেশনে আসার পর কিছুদিন ‘মজার ইশকুল’–এ গিয়েছিল। কথায় কথায় সোমা জানাল, সে মুঠোফোনে মীনা কার্টুন দেখেছে। মীনা আর রাজু—দুজনকেই তার পছন্দ।
সুমাইয়া জানতে চায়, ‘মীনা কী?’। সুমাইয়ার উত্তর, ‘আরে মীনা কার্টুন। মীনা থাকে, রাজু থাকে। হ্যারা স্কুলে যায়। কালকে সেন্টারে (পথশিশুদের নিয়ে কাজ করা সংগঠন) গিয়া তোরে দেহামু।’
আজ মীনা দিবস। জাতিসংঘ শিশু তহবিল (ইউনিসেফ) দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মেয়েদের শিক্ষাসহ সব ধরনের বৈষম্যের বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরিতে গত শতকের নব্বই দশকে ‘মীনা’ নামের ধারাবাহিক কার্টুন চলচ্চিত্র তৈরি করে। মীনা এর কেন্দ্রীয় চরিত্র, বয়স ৯। মেয়েটি শিক্ষার অধিকার চায়, সব ধরনের প্রতিবন্ধকতার বিরুদ্ধে লড়াই করে। মীনার জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা বিবেচনায় ১৯৯৮ সালে ২৪ সেপ্টেম্বরকে ‘মীনা দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
মেয়েদের স্কুলে পাঠানোকে উৎসাহিত করতে ১৯৯৩ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনে ‘মুরগিগুলো গুনে রাখো’ শিরোনামে মীনা কার্টুনের প্রথম পর্ব প্রচারিত হয়। টেলিভিশনের পাশাপাশি রেডিও অনুষ্ঠান এবং কমিক বইয়েও এসেছে মীনা। বাংলাদেশের বাইরে ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, নেপাল ও ভুটানের শিশুরাও মীনার পর্বগুলো দেখেছে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে লিঙ্গ, শিশু অধিকার, শিক্ষা, সুরক্ষা ও উন্নয়নসংক্রান্ত বার্তা মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছে মীনা।
আজ মীনা দিবস। জাতিসংঘ শিশু তহবিল (ইউনিসেফ) দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মেয়েদের শিক্ষাসহ সব ধরনের বৈষম্যের বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরিতে গত শতকের নব্বই দশকে ‘মীনা’ নামের ধারাবাহিক কার্টুন চলচ্চিত্র তৈরি করে। মীনা এর কেন্দ্রীয় চরিত্র, বয়স ৯। মেয়েটি শিক্ষার অধিকার চায়, সব ধরনের প্রতিবন্ধকতার বিরুদ্ধে লড়াই করে। মীনার জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা বিবেচনায় ১৯৯৮ সালে ২৪ সেপ্টেম্বরকে ‘মীনা দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
মেয়েরা এগিয়েছে
আনিকা (২৬), আতিকা (২০) ও নাফিসা (১৫) তিন বোন। আনিকা বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসে (বিইউপি) স্নাতকোত্তরে পড়ছেন। পড়াশোনার পাশাপাশি একটি বেসরকারি সংস্থায় কাজ করছেন। মেজ বোন আতিকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। সবার ছোট নাফিসা পড়ছে দশম শ্রেণিতে। মাধ্যমিক পাসের পর উচ্চমাধ্যমিক বিদেশে পড়তে চায়।
শিক্ষায় মেয়েদের অংশগ্রহণ ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) ‘বাংলাদেশ শিক্ষা পরিসংখ্যান প্রতিবেদন ২০২৪’–এ বলছে, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরে ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের অংশগ্রহণ বেশি। ২০২৪ সালে মাধ্যমিকে মেয়েদের নিট ভর্তির হার (এনইআর) ছিল ৭৮ দশমিক ১৭ শতাংশ। ছেলেদের ক্ষেত্রে এ হার ৬২ দশমিক ৪৩ শতাংশ। উচ্চমাধ্যমিক স্তরেও এগিয়ে আছে মেয়েরা। এ স্তরে মেয়েদের ভর্তির হার ৪৯ দশমিক ৮৭ শতাংশ, আর ছেলেদের ৪৫ দশমিক ৪৫ শতাংশ।
তবে কারিগরি ও উচ্চশিক্ষায় চিত্রটি উল্টো। ভোকেশনাল, ডিপ্লোমা ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ছেলেদের অংশগ্রহণ বেশি। ২০২৪ সালে উচ্চশিক্ষায় ছেলেদের গ্রস এনরোলমেন্ট রেট (জিইআর) ছিল ২৪ দশমিক ৪৮ শতাংশ। মেয়েদের ক্ষেত্রে এই হার ১৬ দশমিক ৪৮ শতাংশ।
বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) ‘বাংলাদেশ শিক্ষা পরিসংখ্যান প্রতিবেদন ২০২৪’–এ বলছে, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরে ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের অংশগ্রহণ বেশি। ২০২৪ সালে মাধ্যমিকে মেয়েদের নিট ভর্তির হার (এনইআর) ছিল ৭৮ দশমিক ১৭ শতাংশ। ছেলেদের ক্ষেত্রে এ হার ৬২ দশমিক ৪৩ শতাংশ। উচ্চমাধ্যমিক স্তরেও এগিয়ে আছে মেয়েরা। এ স্তরে মেয়েদের ভর্তির হার ৪৯ দশমিক ৮৭ শতাংশ, আর ছেলেদের ৪৫ দশমিক ৪৫ শতাংশ।
‘যদি আবার লেখাপড়া শুরু করা যায়’
বাল্যবিবাহ, দারিদ্র্যসহ নানা কারণে পড়ালেখা বন্ধ হচ্ছে মেয়েদের। ইউনিসেফ ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর যৌথভাবে প্রকাশিত ‘মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে ২০২৫’–এর প্রাথমিক ফলাফল অনুযায়ী, ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে ৪৭ শতাংশের বিয়ে হয়েছে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে। ১৩ শতাংশের বিয়ে হয়েছে ১৫ বছরের আগে। ২০১৯ সালের তুলনায় এই হার কিছুটা কমেছে। কিন্তু প্রায় প্রতি দুই নারীর একজনের ১৮ বছর হওয়ার আগেই বিয়ে হয়েছে।
কমলাপুর রেলস্টেশনে থাকে লতা আক্তার ফারিহা (১৬)। গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহে। পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার পর বাবা মারা গেলে বন্ধ হয়ে যায় পড়ালেখা। ১৪ বছরে বিয়ে হয়। লতার স্বামীর প্রথম স্ত্রীর ছয় বছরের ছেলের দায়িত্ব এসে পড়ে লতার ওপর। লতা বলল, ‘শাশুড়ি মারত, স্বামী জুয়া খেলে মারত। তাই মায়ের সাথে ঢাকা চলে আসছি। স্কুলে যাইতে মন চায়, কিন্তু সৎ বাপে দিতে চায় না।’ মীনা কার্টুন দেখতে ভালো লাগত লতার। বড় হয়ে ডাক্তার হওয়ার ইচ্ছা ছিল। লতা বলল, ‘দেহি, আব্বাকে বলে যদি আবার লেখাপড়া শুরু করা যায়।’