হাতির চলাচলে সীমান্তের বেড়া খুলতে ভারতকে অনুরোধ করবে সরকার
শেরপুর সীমান্তে ভারতের দেওয়া কাঁটাতারের বেড়ায় বাংলাদেশ অংশে আটকে পড়া হাতিগুলোকে অবাধ চলাচলের সুযোগ করে দিতে বেড়ার কয়েকটি পয়েন্ট খুলে দেওয়ার অনুরোধ জানাবে সরকার। আজ শনিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে হাতির সুরক্ষা নিয়ে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এ কথা জানান পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু।
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা), প্রকৃতি সংরক্ষণের আন্তর্জাতিক জোট (আইইউসিএন) বাংলাদেশ, ক্রিয়েটিভ কনজারভেশন অ্যালায়েন্স এবং ডিপ ইকোলজি অ্যান্ড স্নেক কনজারভেশন ফাউন্ডেশন যৌথভাবে ‘হাতির সুরক্ষা: বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ ও করণীয়’ শীর্ষক এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেন, ‘পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও বন্যপ্রাণী এগুলো নিয়ে আমার চিন্তার শেষ নাই। পৃথিবী থেকে বহু প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে গেছে। আজকের বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে প্রশ্ন হচ্ছে আমরা আর কত প্রজাতি বিলুপ্ত হতে দিতে পারি। মানুষ প্রকৃতির একটি অংশ হিসেবে বসবাস করতে চাইলে আমরা বন্যপ্রাণীর বিলুপ্তি হতে দিতে পারি না।’
২০০৭ সালে শেরপুর সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ায় বাংলাদেশ অংশে গারো পাহাড়ে প্রায় ১০০টির মতো হাতি আটকা পড়ে আছে উল্লেখ করে মন্ত্রী আরও বলেন, ‘ভারতের সঙ্গে হাতি নিয়ে আমাদের সমঝোতা স্মারক আছে। আমরা চেষ্টা করব শেরপুর সীমান্তে হাতির করিডোরে ভারতের দেওয়া ৫৪ কিলোমিটারে যে কাঁটাতারের বেড়া, সেখানে ৫ থেকে ৬টি পয়েন্ট যেন খুলে দেওয়া হয়; যাতে হাতি অবাধে চলাচল করতে পারে।’ এ বিষয়ে ভারতের সঙ্গে পরবর্তী সভায় প্রস্তাব তোলা হবে বলেও তিনি আশ্বস্ত করেন।
অনুষ্ঠানে বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ রেজা খান বলেন, শুধু গাছপালা লাগিয়ে হাতির আবাসস্থল টিকিয়ে রাখা যাবে না; বনের কার্যকর প্রতিবেশব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি উদ্ধার হওয়া হাতিদের বনে ফেরানোর (রি–ওয়াইল্ডিং) ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
প্রকৃতি সংরক্ষণের আন্তর্জাতিক জোট (আইইউসিএন), বাংলাদেশের প্রোগ্রাম ম্যানেজার সারোয়ার আলম বলেন, বনভূমি দখলের কারণে হাতির খন্ডিত হয়ে যাওয়া করিডোর (হাতি চলাচলের পথ) পুনরুদ্ধার শুরু করতে হবে। কিছু করিডোরের দূরত্ব মাত্র ২ থেকে ৭ কিলোমিটার। উদ্যোগ নিলে এগুলো পুনরুদ্ধার করা সম্ভব।
দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের তাগিদ
সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় বিষয়ক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান হাতি রক্ষায় দৃষ্টিভঙ্গি ও দর্শন পরিবর্তনের ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, বনে ইকোট্যুরিজমের নামে মানুষের অবাধ যাতায়াত আত্মঘাতী। হাতির প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ, সার্কাসে ব্যবহার এবং চাঁদাবাজি পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে, যা ইতিমধ্যে নেপাল ও থাইল্যান্ড করেছে। বন বিভাগকে সামান্য রাজনৈতিক সমর্থন দেওয়া গেলে তারা হাতি সুরক্ষায় সফল হবে বলেও মনে করেন তিনি।
বন্যপ্রাণী পুনর্বাসন সংস্থা ‘অভয়ারণ্য’–এর প্রতিষ্ঠাতা রুবাইয়া আহমেদ সাফারি পার্কে হাতির রক্ষণাবেক্ষণ পদ্ধতির সমালোচনা করে বলেন, উদ্ধারের পরও পুনর্বাসনের নামে হাতির ওপর নির্যাতনমূলক পদ্ধতি এখনো বহাল আছে। তিনি সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) মাধ্যমে হাতির নিরাপদ পুনর্বাসনের প্রস্তাব দেন।
অনুষ্ঠানে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ থেকে অনলাইনে যুক্ত হয়ে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণকর্মী সুপর্ণা গাঙ্গুলী শেরপুরের হাতি সুরক্ষায় সহযোগিতার প্রস্তাব দেন। এ ছাড়া শেরপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য ফাহিম চৌধুরী বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য গড়ে তোলার পাশাপাশি স্থানীয়দের বিকল্প কর্মসংস্থানের প্রস্তাব দেন।
হাতি সংরক্ষণে শেরপুরের মাঠপর্যায়ের স্বেচ্ছাসেবী কাঞ্চন মারাক হাতির দুর্দশার চিত্র তুলে ধরেন। এ ছাড়া, বন অধিদপ্তরের বন সংরক্ষক (প্রশাসন) আর এস এম মুনিরুল ইসলাম আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে হাতির পুনর্বাসন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠায় পর্যাপ্ত বরাদ্দের দাবি জানান।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব শামীমা বেগম, বন অধিদপ্তরের কেন্দ্রীয় অঞ্চলের বন সংরক্ষক এ এস এম জহির উদ্দিন আকন্দ, ক্রিয়েটিভ কনজারভেশন অ্যালায়েন্সের গভর্ন্যান্স স্পেশালিস্ট আবরার আহমদ।