জ্বালানি তেলের জন্য অপেক্ষার লাইন ছোট হয়েছে, কমেছে ভোগান্তি
গুলশানের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ব্যক্তিগত গাড়ি চালান মো. আনিসুর রহমান। ১০ দিন আগে গাড়ির জন্য জ্বালানি তেল নিয়েছিলেন তিনি। তখন তাঁকে তেল নিতে রাজধানীর তেজগাঁওয়ের একটি পাম্পে লাইনে দাঁড়াতে হয়েছে ১০ ঘণ্টার মতো। আজ সোমবার বিকেলে তিনি তেল নিতে এসেছেন রাজধানীর নিকুঞ্জে নিকুঞ্জ মডেল সার্ভিস সেন্টার পাম্পে। তাঁর এবারের তেল নেওয়ার অভিজ্ঞতা ভিন্ন।
আনিসুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘এর আগে তেল নিতে ১০ ঘণ্টার মতো সময় লেগেছিল। আমার লাইফে (জীবন) কখনো এত সময় তেলের জন্য অপেক্ষা করতে হয়নি। আজকে ভিড় কমেছে। আধা ঘণ্টার মতো হবে এসেছি, যেহেতু লাইন ছোট, ভিড় কম, মনে হচ্ছে, এখনই তেল পেয়ে যাব।’
আনিসুর রহমানের বক্তব্যের সত্যতা মিলল পাম্পটিতে তেলের জন্য অপেক্ষায় থাকা গাড়ির সারি দেখে। বেলা তিনটায় সেখানে তেলের অপেক্ষায় ছিল ৩৭টি ব্যক্তিগত গাড়ি, ৮৯টি মোটরসাইকেল, ১১টি ছোট পিকআপ ও তিনটি বাস। গত সপ্তাহে প্রায় প্রতিদিনই পাম্পে তেল নিতে আসা গাড়ির সারি পৌঁছেছিল কুড়িলে ইউলুপের প্রবেশমুখ পর্যন্ত।
রাজধানীর খিলক্ষেত এলাকা থেকে এই পাম্পে তেল নিতে এসেছেন রাইডার তরিকুল ইসলাম। পাঁচ দিন আগেও তেল নিতে তাঁকে তিন ঘণ্টার মতো অপেক্ষা করতে হয়েছিল। আজ আধা ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েই তিনি পাম্পের কাছাকাছি পৌঁছান। তরিকুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আগের তুলনায় দুর্ভোগ কিছুটা কমেছে। এখন লাইন স্বাভাবিক বলা যায়। এমন অবস্থা থাকলে আমাদের কষ্ট কিছুটা কমবে।’
প্রায় একই রকম অভিজ্ঞতার কথা জানান তেল নিতে আসা শামীম আল মাহমুদ। পেশায় চিকিৎসক এই ব্যক্তি তেল নিতে এসেছেন রাজধানীর কাওলা এলাকা থেকে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘এখন মোটামুটি স্বাভাবিক। ১৫ দিন আগে তেল নিয়েছিলাম। তখন দীর্ঘ লাইন ছিল।’
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরুর পর বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের সংকট শুরু হয়। এর প্রভাব পড়ে বাংলাদেশেও। বাংলাদেশের ফিলিং স্টেশনগুলোয় তেলের জন্য মোটরসাইকেল ও প্রাইভেট কারের লম্বা লাইন শুরু হয়। শুরু হয় ভোগান্তি। এমন পরিস্থিতিতে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম কয়েক দফায় বাড়লেও বাংলাদেশে তেলের দাম বাড়ায়নি সরকার। তবে দেড় মাস পর ১৮ এপ্রিল সরকার সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায়।
কয়েক দিন ধরে পেট্রলপাম্পগুলোয় জ্বালানি তেল নেওয়ার লাইন অনেকটা ছোট হয়ে এসেছে। এরই মধ্যে সরকার ব্যক্তিমালিকানাধীন গাড়িকে ফুয়েল পাস নিবন্ধনব্যবস্থার আওতায় এনেছে। প্রাথমিক পর্যায়ে ‘ক’, ‘খ’ ও ‘গ’ সিরিজের গাড়িকে ফুয়েল পাসে নিবন্ধনের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে। অন্যান্য সিরিজের ব্যক্তিগত গাড়িগুলোকেও পর্যায়ক্রমে নিবন্ধনপ্রক্রিয়ার আওতায় আনা হবে। এর আগে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় ঢাকা, চাঁদপুর, চট্টগ্রাম, বরিশাল, খুলনা, রাজশাহী ও ময়মনসিংহে মোটরসাইকেলের জন্য ‘ফুয়েল পাস বিডি’ অ্যাপের পাইলটিং কার্যক্রম নেয়। পাশাপাশি রাজধানীতে মোট ১৮টি পাম্পে এর ব্যবহার শুরু হয়েছে। আজ পাম্পগুলোতে তেল নিতে আসা বেশির ভাগ গ্রাহকই অ্যাপের মাধ্যমে তেল নিয়েছেন।
রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় একটি ছোট বেসরকারি অফিসে কাজ করেন নাহিদ হাসান। দেশে জ্বালানিসংকট শুরুর আগে অফিস শেষ করে ভাড়ায় যাত্রী পরিবহন করতেন তিনি। তবে জ্বালানি তেল নিয়ে ভোগান্তি শুরুর পর সেটি বন্ধ হয়ে যায়। এখন আবারও সেটি শুরু করতে চান তিনি।
তেল নেওয়ার জন্য অপেক্ষায় থাকা লাইনে দাঁড়িয়ে নাহিদ হাসান প্রথম আলোকে বলেন, ‘তেলের জন্য দীর্ঘ সময় থাকলে তো অফিস করা যায় না। এখন তো মনে হচ্ছে, পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে, এখন আবার রাইড শেয়ার করব।’
নিকুঞ্জ মডেল সার্ভিস সেন্টারের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, এখন পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। তেলের জন্য লাইন কমেছে। ‘ফুয়েল পাস’ দেখেই তেল পরিমাণমতো সরবরাহ করা হচ্ছে।
ভিড় কমেছে ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনেও
এক সপ্তাহ আগেও রাজধানীর তেজগাঁওয়ের ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনে বেশ কয়েক দিন জ্বালানি তেলের জন্য গাড়ির সারি পৌঁছেছিল জাহাঙ্গীর গেট পেরিয়ে শাহীন স্কুল অ্যান্ড কলেজের গেট পর্যন্ত। আজ দেখা যায়, লাইন কমে এসেছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় পেরিয়ে বিমানবাহিনীর মেস পর্যন্ত।
ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনে আজ বিকেল চারটার দিকে ৮৭টি ব্যক্তিগত গাড়ি, ১১৩টি মোটরসাইকেল, ৬টি ছোট পিকআপ, ৩টি বাস ও একটি অ্যাম্বুলেন্সকে জ্বালানি তেলের জন্য অপেক্ষায় থাকতে দেখা গেছে।
রাজধানীর রামপুরা এলাকা থেকে ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনে স্কুটির জন্য তেল নিতে এসেছেন রাকিবুল ইসলাম। তেলের জন্য এক ঘণ্টার মতো অপেক্ষা করতে হয়েছে জানিয়ে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘এর আগে তেল নিতে তিন ঘণ্টার মতো লেগেছিল। আজ লাইন কিছুটা কম।’
এই পাম্প থেকে বাইকের তেল নিয়ে বের হচ্ছিলেন রাকিব হাসান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, দেড় ঘণ্টার মতো লাইনে থেকে তেল পেয়েছেন। লাইট আগের তুলনায় ছোট হওয়ায় গত কয়েক দিনের তুলনায় আজ তাড়াতাড়িই তেল পেয়েছেন।
রাজধানীর ধানমন্ডি এলাকা থেকে প্রাইভেটকারের জন্য তেল নিতে এসেছেন চালক মো. জাহিদ। আজ এক ঘণ্টার মতো লাইনে দাঁড়িয়ে তেল পেয়েছেন তিনি। জাহিদ প্রথম আলোকে বলেন, এখন লাইন কমেছে। কম সময়েই তেল পাওয়া যাচ্ছে। তবে তেলের সরবরাহ বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন তিনি।