ইতিহাস সংরক্ষণ না হলে একসময় গণ–অভ্যুত্থানের গুরুত্বও খাটো হয়ে যায়

জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তিতে শহীদদের স্মরণে ‘জুলাই গণ–অভ্যুত্থান: সংগ্রামের নতুন যাত্রা’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় বক্তব্য দেন নিউ এজ সম্পাদক নূরুল কবীর। জাতীয় জাদুঘর, ঢাকা; ২২ আগস্ট ২০২৬ছবি: প্রথম আলো

ইতিহাস সংরক্ষণ করা না হলে একসময় গণ–অভ্যুত্থানের গুরুত্বও খাটো হয়ে যায়। ১৯৬৯, ১৯৯০ ও ২০২৪ সালের গণ–আন্দোলনে গান, কবিতা ও স্লোগান মানুষকে অনুপ্রাণিত করেছিল। এগুলো মানুষের আবেগ ও কণ্ঠকে শক্তিশালী করেছিল। একই সঙ্গে সমাজের বিভিন্ন অংশকেও আন্দোলনে যুক্ত করেছে। তাই জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের গান, কবিতা ও স্লোগান যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা জরুরি।

জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তিতে শহীদদের স্মরণে ‘জুলাই গণ–অভ্যুত্থান: সংগ্রামের নতুন যাত্রা’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় এসব কথা বলেন বক্তারা। আজ শনিবার বিকেলে রাজধানীর শাহবাগ জাতীয় জাদুঘরের সুফিয়া কামাল মিলনায়তনে এই আলোচনার আয়োজন করে সমগীত সংস্কৃতি প্রাঙ্গণ।

আলোচনা সভায় নিউ এজ সম্পাদক নূরুল কবীর বলেন, গণ–অভ্যুত্থানের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস শুধু রাজনৈতিক দল ও নেতাদের ভূমিকা দিয়ে লেখা যায় না। গান, কবিতা ও স্লোগানও আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ দলিল। এগুলো মানুষের আবেগ ও কণ্ঠকে শক্তিশালী করে এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে আন্দোলনে যুক্ত করে। ১৯৬৯, ১৯৯০ ও ২০২৪ সালের আন্দোলনেও এর প্রমাণ মিলেছে।

১৯৯০ সালের আন্দোলনের অনেক গান, কবিতা ও স্লোগান সংরক্ষিত হয়নি উল্লেখ করে নূরুল কবীর বলেন, ফলে পরবর্তী প্রজন্ম সেই আন্দোলনের ব্যাপকতা ও আত্মত্যাগের সঠিক ধারণা পায়নি। তাই জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের সাংস্কৃতিক ইতিহাস সংরক্ষণ জরুরি। একই সঙ্গে ভবিষ্যতের আন্দোলনের জন্য সংগঠন ও নতুন রাজনৈতিক চিন্তার ভিত্তি তৈরি করতে হবে।

জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের দুই বছর পরে এখন অস্বীকৃতির রাজনীতি চলছে বলে মন্তব্য করেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সারা হোসেন। তিনি বলেন, যাঁরা আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন, তাঁদের নিয়ে নানা ধরনের অপপ্রচার ও নেতিবাচক প্রচারণা চলছে।

আলোচনা সভায় ‘জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের গান’ শিরোনামে একটি বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করা হয়। বইটিতে জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে আলোচনায় থাকা বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠনের ২৩০টি গান সংকলন করা হয়। জাতীয় জাদুঘর, ঢাকা; ২২ আগস্ট ২০২৬
ছবি: প্রথম আলো

এ সময় যাঁরা অতীতে কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর ওপর অন্যায়-অবিচার হলে প্রতিবাদ করেছেন, সেই একই অন্যায় যখন তাঁদের অপছন্দের ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ওপর হচ্ছে, তখন তাঁদের কেউ কেউ আর প্রতিবাদ করছেন না বলে অভিযোগ করেন সারা হোসেন। তিনি বলেন, অন্যায় কার ওপর হচ্ছে, সেটি না দেখে অন্যায়কে অন্যায় হিসেবে চিহ্নিত করা জরুরি।

সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ এই আইনজীবী বলেন, জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা ছিল পরিবর্তন, ন্যায়বিচার ও অধিকারের। সেই আকাঙ্ক্ষা ধরে রাখতে ইতিহাস সংরক্ষণ ও চর্চা জরুরি। এ কারণেই জুলাইয়ের গান, কবিতা, ছবি, পোস্টারসহ সাংস্কৃতিক দলিল সংরক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আন্দোলনের প্রকৃত আকাঙ্ক্ষা বুঝতে সাহায্য করবে।

বাংলাদেশ গার্মেন্ট শ্রমিক সংহতির সভাপতি তাসলিমা আখতার বলেন, ‘নব্বইয়ের গণ–অভ্যুত্থানে যে গান ও কবিতার ভাষা ছিল, সেটা চব্বিশের গণ–অভ্যুত্থানে এসে অনেক পরিবর্তন হয়েছে। এই পরিবর্তন নিয়ে এখন কাজ করতে হবে। নতুন প্রজন্মের গানের ভাষা, মনন ও পছন্দ কেমন, সেটা আমাদের ভাবতে হবে।’

কবি ও শিল্পী কফিল আহমেদ বলেন, গান শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়, সময়ের বেদনা ও মানুষের প্রতিবাদ থেকেই এর জন্ম। অভ্যুত্থানের গানকে সংরক্ষণ করতে হবে। তিনি বলেন, শহীদদের যথার্থ স্মরণ ও সম্মান জানাতে হলে রাষ্ট্র ও সমাজের প্রতিটি স্তরে থাকা শোষণ ও দাসত্ব দূর করতে হবে।

আলোচনা সভায় ‘জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের গান’ শিরোনামে একটি বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করা হয়। বইটিতে জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে আলোচনায় থাকা বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠনের ২৩০টি গান সংকলন করা হয়। সংকলন করেন বীথি ঘোষ।

সমগীতের সভাপ্রধান রেবেকা নীলা আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন। এতে আরও বক্তব্য দেন গণসংগীতশিল্পী অমল আকাশ। আলোচনার পাশাপাশি জাতীয় জাদুঘরে সমগীত সংস্কৃতি প্রাঙ্গণ ‘জুলাইয়ের ডাক’ শীর্ষক একটি চিত্রপ্রদর্শনীর আয়োজন করে। এতে ৩০ শিল্পীর চিত্রকর্ম স্থান পেয়েছে।