গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী আবদুল্লাহ মোহাম্মদ জোবায়ের প্রথম আলোকে বলেন, ‘খালি জায়গায় পার্ক বানাতে ১০০ কোটি টাকা ব্যয়ে আমরা একটি প্রকল্প তৈরি করেছি। পার্কে ওয়াকওয়ে থাকবে। ছোট-বড় সবার জন্য খেলার ব্যবস্থা থাকবে। থাকবে জলাধার। প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য আমরা পরিকল্পনা কমিশনে পাঠাব।’

গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, বর্তমান সরকার ২০০৯ সালে প্রথম মেয়াদে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে বেশ কয়েকবার শেরেবাংলা নগরে সচিবালয় স্থানান্তরের উদ্যোগ নেয়। এ জন্য দুই হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল। চার লাখ ডলার খরচ করে বিশ্বখ্যাত মার্কিন স্থপতি লুই আই কানের জাতীয় সংসদ ভবনসহ পুরো শেরেবাংলা নগরের মূল নকশা দেশে আনা হয়েছিল। নকশা অনুযায়ী, শেরেবাংলা নগরে ১৪ তলার ভিতের ওপর ৯ তলাবিশিষ্ট চারটি মূল ভবন করার কথা ছিল। এ ছাড়া প্রকল্প এলাকায় মিলনায়তন, সম্মেলন কেন্দ্র, মসজিদ, ব্যাংক, ডাকঘর, এক হাজার গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। কিন্তু এসব পরিকল্পনা থেকে সরে আসছে সরকার।

কেন সরছে না সচিবালয়

শেরেবাংলা নগরে সচিবালয় স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত থেকে সরকারের সরে আসার কারণ জানতে কথা হয় গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে। তাঁরা বলছেন, সচিবালয়ে এখন মোট ১১টি ভবন আছে। নতুন করে ভেতরে ৪২০ কোটি টাকা ব্যয়ে দুটি বহুতল ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। যার একটি ২০ তলা, অন্যটি ১৫ তলা। আগামী বছরের মধ্যে ভবন দুটির নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার কথা।

এ ছাড়া সচিবালয়ের ভেতরে অর্থ মন্ত্রণালয়ের জন্য একটি বহুতল ভবন ইতিমধ্যে চালু হয়েছে। অন্যদিকে সচিবালয়ের ৪ নম্বর ভবনের পাশে ১৬ তলাবিশিষ্ট অত্যাধুনিক প্রযুক্তির স্বয়ংক্রিয় (মেকানিক্যাল) কার পার্কিং নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব প্রকল্পের কাজ শেষ হলে সচিবালয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের স্থান সংকুলানের সমস্যা কেটে যাবে। একই সঙ্গে গাড়ি পার্কিংয়ের বর্তমান চাপও কমবে।

গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, শেরেবাংলা নগরে সচিবালয় স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার আরেকটি কারণ—নিরাপত্তা। শেরেবাংলা নগরের যে জায়গাটিতে সচিবালয় নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছিল, সেখান থেকে গণভবন কাছাকাছি দূরত্বে অবস্থিত। নিরাপত্তার বিষয়টি মাথায় রেখে গোয়েন্দা সংস্থা থেকে এ ব্যাপারে আপত্তি জানানো হয়েছে।

তা ছাড়া শেরেবাংলা নগর এলাকার পরিবেশ আর আগের মতো নেই। অর্থাৎ শেরেবাংলা নগর এলাকার বর্তমান অবস্থাকে সচিবালয় স্থানান্তরের উপযোগী বলে বিবেচনা করা হচ্ছে না।

গত এক দশকে সরকারের বেশ কয়েকটি দপ্তর শেরেবাংলা নগর ও আগারগাঁও এলাকায় স্থানান্তর করা হয়েছে। তবে এসব দপ্তরে রাখা হয়নি গাড়ি পার্কিংয়ের সুবিধা। সেখানে অপরিকল্পিতভাবে ভবন নির্মাণের কারণে গাড়ির চাপ বেড়েছে। রাস্তার ওপর গাড়ি পার্কিং করা হচ্ছে।

অন্যদিকে আগামী মাসে উত্তরার দিয়াবাড়ি থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত মেট্রোরেল চালুর কথা রয়েছে। তখন মানুষের যাতায়াত আরও বাড়বে। ফলে তখন মানুষ ও গাড়ির চাপ সামাল দিতে হিমশিম খেতে হতে পারে।

আরেকটি কারণ হলো, সচিবালয় স্থানান্তর করতে গেলে শেরেবাংলা নগর এলাকা থেকে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের কবর সরানোর প্রয়োজন হতে পারে। সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময় জিয়াউর রহমানের কবর সরানো নিয়ে কথা এসেছে। তবে কবর সরাতে গিয়ে বিতর্ক তৈরি হতে পারে, এই বিষয়ও নীতিনির্ধারকদের মাথায় আছে। সব মিলিয়ে তাঁরা মনে করছেন, শেরেবাংলা নগরে সচিবালয় স্থানান্তর না করাই ভালো। বরং ভবিষ্যতে পূর্বাচলে সচিবালয় স্থানান্তর করা যেতে পারে।

পার্ক নির্মাণে খরচের যত প্রস্তাব

শেরেবাংলা নগরে পার্ক নির্মাণসংক্রান্ত প্রকল্প নিয়ে ১৬ নভেম্বর সচিবালয়ে এক আন্তমন্ত্রণালয় সভা অনুষ্ঠিত হয়। গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব কাজী ওয়াছি উদ্দিনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সভায় বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

প্রকল্পের নথি বলছে, শেরেবাংলা নগরে পার্ক নির্মাণে ৯৯ কোটি ৭৭ লাখ টাকা খরচের প্রস্তাব করা হয়েছে। পুরো টাকাই দেবে সরকার। পার্কের আওতায় ওয়াকওয়ে বানাতে ২২ কোটি টাকা খরচের প্রস্তাব করা হয়েছে।

লেক বানাতে ৮ কোটি টাকা, পার্কিং এরিয়া বানাতে ৩ কোটি ৫৩ লাখ টাকা, প্লে গ্রাউন্ড বানাতে সাড়ে ৪ কোটি টাকা খরচের প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ছাড়া এলইডি লাইট, স্পট লাইট, সোডিয়াম লাইট, কেব্‌ল কন্ট্রোল, লাইট ফিটিংসে খরচের প্রস্তাব করা হয়েছে ১০ কোটি ৫৭ লাখ টাকা।

সীমানাপ্রাচীর বানাতে ৭ কোটি ৩২ লাখ টাকা, ব্যায়াম ও বাচ্চাদের খেলার সরঞ্জামাদি কিনতে ১ কোটি ৬৫ লাখ টাকা খরচের প্রস্তাব করা হয়েছে। পার্কে আরও থাকবে বসার স্থান, শৌচাগার সুবিধা, শিশুদের বিনোদন এলাকা।

নথি বলছে, গণপূর্ত অধিদপ্তর প্রথমে এই প্রকল্পের ব্যয় ধরেছিল ২০৮ কোটি টাকা। পরে ব্যয় যৌক্তিকরণে গৃহায়ণ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব হামিদুর রহমান খানকে প্রধান করে গত ৭ আগস্ট একটি কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটি প্রকল্পের ব্যয় কমিয়ে ১০০ কোটি টাকায় নামিয়ে আনে।

গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী আবদুল্লাহ মোহাম্মদ জোবায়ের বলেন, প্রকল্প প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে পাঠালে সেখানে ব্যয় কাটছাঁট হতে পারে। তখন প্রকল্পের ব্যয় আরও কমতে পারে।