‘১০০ টাকায়’ গরুর মাংস–ভাতের দোকানটি উচ্ছেদ, সেখানে কেন ভিড় হতো

রাজধানীর আগারগাঁওয়ের তালতলা এলাকার এই ফুটপাতেই মিজানুর রহমানের খাবারের দোকান ছিল। গতকাল সোমবারছবি: প্রথম আলো

রাজধানীর আগারগাঁওয়ের তালতলা এলাকার ফুটপাতের একটি খাবারের দোকানে ‘১০০ টাকায়’ গরুর মাংস ও ভাত বিক্রি হতো। দোকানটিতে ভিড় লেগেই থাকত।

মিজানুর রহমান নামের এক ব্যক্তি দোকানটি চালাতেন। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) গত রোববার এই ফুটপাতে থাকা অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে অভিযান চালায়। মিজানুরের দোকানটিও উচ্ছেদ করা হয়। অন্যদিকে মিজানুর এখন ১৫ দিনের জন্য কারাগারে আছেন।

এখন প্রশ্ন হলো, মিজানুরের ফুটপাতের দোকানটিতে কেন এত ভিড় হতো।

আরও পড়ুন
মিজানুর রহমান
ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া

রাজধানীর শেওড়াপাড়া বাসস্ট্যান্ড থেকে তালতলা এলে হাতের বাঁ দিকের ফুটপাতে ছিল মিজানুরের দোকানটি। পুরাতন বিমানবন্দরের দেয়ালঘেঁষা এই ফুটপাতে আরও কয়েকটি দোকান ছিল। সেগুলো ছিল খাবার, চা ও রিকশা মেরামতের দোকান।

ফুটপাতে মিজানুর কবে দোকানটি বসিয়েছিলেন, তা জানা যায়নি। তবে বছরখানেক আগে তিনি ‘ভাইরাল’ হন। তাঁর ১০০ টাকায় গরুর মাংস ও ভাত বিক্রির ভিডিও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। তাঁর দোকানে ভিড় বেড়ে যায়। তিনি স্থানীয়দের কাছে ‘ভাইরাল মিজান’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠেন।

ডিএনসিসির উচ্ছেদ অভিযানের আগে আরেক ঘটনায় ৯ আগস্ট মিজানুরকে গ্রেপ্তার করে কাফরুল থানা-পুলিশ। তাঁর বিরুদ্ধে সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়। পরে ভ্রাম্যমাণ আদালত মিজানুরকে ১৫ দিনের কারাদণ্ড দেন।

এই ঘটনার বিষয়ে কাফরুল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ফুটপাতের দোকানপাটসহ বিভিন্ন স্থাপনায় অবৈধ বিদ্যুৎ-সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে বিদ্যুৎ বিভাগ অভিযান পরিচালনা করছিল। তালতলা এলাকার ফুটপাতে থাকা মিজানুরের দোকানটির অবৈধ বিদ্যুৎ-সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে ঘটনাস্থলে গিয়েছিলেন বিদ্যুৎ বিভাগের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তখন তাঁদের ওপর চড়াও হয়েছিলেন মিজানুর।

উচ্ছেদের পর ফুটপাতে পড়ে আছে দোকানপাটের খুঁটি, কাঠের অংশ। গতকাল সোমবার আগারগাঁওয়ের তালতলায়
ছবি: প্রথম আলো

উচ্ছেদ অভিযান

সরেজমিনে গতকাল সোমবার দেখা যায়, তালতলার ফুটপাতে কোনো দোকান নেই। অভিযান চালিয়ে ফুটপাতের সব অবৈধ দোকান উচ্ছেদ করেছে ডিএনসিসি। ফুটপাতজুড়ে দোকানপাটের ভাঙা কাঠামো, বাঁশ, লাঠি পড়ে আছে। কোথাও পড়ে আছে দোকানের টিন, কাঠের ভাঙা অংশ। খাবারের হাঁড়িপাতিল, চেয়ারটেবিল কিংবা দোকানের অন্য সরঞ্জাম নেই। যে জায়গায় মানুষ বসে খেত, তা এখন ফাঁকা।

গত রোববারের এই উচ্ছেদ অভিযানে নেতৃত্ব দেন ডিএনসিসির নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মারুফা বেগম নেলী। তিনি মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ডিএনসিসির নিয়মিত কার্যক্রমের অংশ হিসেবে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালিত হয়। প্রতিদিন কোথাও না কোথাও এমন উচ্ছেদ অভিযান হচ্ছে। কাজেই বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তোলার কোনো সুযোগ নেই।

অবশ্য মিরপুর ১০ নম্বরসহ ডিএনসিসির অন্য এলাকার ফুটপাত দখল করে অবৈধ স্থাপনা গড়ে লোকজনকে ব্যবসা করতে দেখা গেছে। সরেজমিনে দেখা যায়, তুলনামূলকভাবে এসব ফুটপাত বেশি ব্যস্ত। অন্যদিকে, তালতলার যে ফুটপাতে মিজানুর দোকান বসিয়েছিলেন, সেখানে পথচারীদের চলাচল ততটা বেশি নয়।

আবার মিরপুর ১০ নম্বর থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত বেগম রোকেয়া সরণির বিভিন্ন অংশের সংস্কারকাজ চলছে। এই সংস্কারকাজে যুক্ত শ্রমিকদের তালতলা ফুটপাতে উচ্ছেদ হওয়া দোকানগুলোর পাশেই টিনের চালা দিয়ে তৈরি অস্থায়ী স্থাপনায় থাকতে দেখা গেছে।

অন্যদিকে তালতলার খুব কাছে আগারগাঁওয়ের ফুটপাতে খাবারের দোকান ঠিকই চলছে। এসব বিষয় সামনে এনে তালতলার ফুটপাত থেকে উচ্ছেদ হওয়া দোকানিরা প্রশ্ন তুলছেন, অভিযান শুধু এখানে কেন?

আরও পড়ুন

দোকানটিতে কেন ভিড় হতো

গরুর মাংসের দাম অনেক আগেই নিম্ন আয়ের মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। এই যখন বাজার পরিস্থিতি, তখন ফুটপাতের খাবারের দোকানি মিজানুর মাত্র ১০০ টাকায় গরুর মাংস ও ভাত বিক্রি করতেন। ফলে নিম্ন আয়ের মানুষেরা অল্প খরচে তাঁর দোকান থেকে গরুর মাংস-ভাত খেতে পারতেন।

ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) তথ্যমতে, ২০১৪ সালে ঢাকার বাজারে প্রতি কেজি গরুর মাংসের গড় দাম ছিল ৩০০ টাকা। এর পর থেকে তা বাড়ছে।

অন্যদিকে সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ঢাকার বাজারে প্রতি কেজি গরুর মাংসের দাম ৭৮০ থেকে ৮৫০ টাকা।

এই টাকা একজন রিকশাচালকের পুরো দিনের আয়ের সমান। আবার কখনো কখনো তাঁরা এই পরিমাণ টাকা দিনে আয় করতে পারেনও না। অন্যদিকে, একজন পোশাকশ্রমিকের এক দিনের ন্যূনতম মজুরি এই টাকার চেয়ে অনেক কম।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মিজানুর সকালে গরুর মাংসসহ রান্নার অন্যান্য উপকরণ নিয়ে দোকানে আসতেন। ফুটপাতেই তিনি রান্না করতেন। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর দোকানে ক্রেতার ভিড় বাড়ত। কেউ কেউ মোটরসাইকেল নিয়েও তাঁর দোকানে খেতে আসতেন।

ফুটপাতের অবৈধ দোকান উচ্ছেদ করা হয়েছে। ফুটপাতে পড়ে আছে চেয়ারসহ বিভিন্ন জিনিস। গতকাল সোমবার আগারগাঁওয়ের তালতলায়
ছবি: প্রথম আলো

এলাকাটিতে নির্মাণশ্রমিক হিসেবে কাজ করেন রাসেল হোসেন। তাঁকে গতকাল পাওয়া গেল মিজানুরের উচ্ছেদ হওয়া দোকানের কাছে।

রাসেল বললেন, তিনি নিয়মিত মিজানুরের দোকানে খেতেন। দোকানটিতে যাঁরা খেতে আসতেন, তাঁদের বেশির ভাগই নিম্ন আয়ের মানুষ। এক কেজি গরুর মাংস কেনার সামর্থ্য সবার নেই। তাই এমন অনেক মানুষ মিজানুরের দোকানে আসতেন কম দামে গরুর মাংস-ভাত খেতে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেল, আগারগাঁও ও তালতলায় কয়েকটি মধ্যমানের রেস্তোরাঁ আছে। এসব রেস্তোরাঁয় এক বাটি গরুর মাংসের দাম পড়ে ১৮০ থেকে ২২০ টাকা। বাটিতে ছোট ছোট কয়েক টুকরা মাংস থাকে। ভাতসহ গরুর মাংস খেতে খরচ পড়ে কমপক্ষে ২২০ থেকে ২৫০ টাকা।

স্থানীয় কয়েক ব্যক্তির ভাষ্য, মূলত ১০০ টাকায় গরুর মাংস-ভাত বিক্রির কারণেই মিজানুরের দোকানটি নিম্ন-স্বল্প আয়ের মানুষের মধ্যে জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। দোকানটির খবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল। এ কারণেই তাঁর দোকানে ভিড় হতো।

ফুটপাতের অবৈধ দোকানটি উচ্ছেদ হয়েছে। কিন্তু গরুর মাংসের দাম কমানোর কোনো কার্যকর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।

আরও পড়ুন