বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সহসভাপতি নগর–পরিকল্পনাবিদ আরিফুল ইসলাম বলেন, ফ্ল্যাটের দামের সঙ্গে ভবনের উচ্চতার সম্পর্ক খুবই সামান্য। আর ভবনের উচ্চতার সঙ্গে বাড়িভাড়ারও সম্পর্ক নেই।

রাজধানীতে ২০০৮ সালের পর সুউচ্চ আবাসিক ভবন নির্মাণ শুরু হয়। ওই বছর রাজউকের আওতাধীন এলাকায় ঢাকা মহানগর ইমারত নির্মাণ বিধিমালায় প্রথমবারের মতো ফ্লোর এরিয়া রেশিও (এফএআর) যুক্ত করা হয়। এফএআর হচ্ছে একটি প্লটে কত আয়তন বা উচ্চতার ভবন নির্মাণ করা যাবে তা নির্ধারণ করার সূচক। এফএআরের মান কমবেশির সঙ্গে ভবনের আয়তন বা উচ্চতা কমে বা বাড়ে। সাধারণত একটি এলাকার পরিবহন সক্ষমতা, অবকাঠামো ও নাগরিক সুবিধা বিশ্লেষণ করে এফএআরের মান নির্ধারণ করা হয়।

২০০৮ সালের বিধিমালায় এফএআরের মান বেশি দেওয়ায় ধানমন্ডি এলাকায় ১৪ তলা পর্যন্ত আবাসিক ভবন নির্মাণের সুযোগ তৈরি হয় (আগে যা ছিল সর্বোচ্চ ৬ তলা)। এরপরও এই এলাকায় ফ্ল্যাট ও জমির দাম কোনোটিই কমেনি।

একটি আবাসন প্রতিষ্ঠানের সমীক্ষা অনুযায়ী, ধানমন্ডিতে ২০০৫ সালে প্রতি বর্গফুট ফ্ল্যাটের দাম ছিল ৩ হাজার ৩০০ টাকা। এখন ওই এলাকায় প্রতি বর্গফুট ফ্ল্যাটের দাম ১৮ হাজার টাকা। ২০১০ সালে ধানমন্ডিতে প্রতি কাঠা জমির দাম ছিল ২ কোটি টাকা, এখন তা বেড়ে হয়েছে ৫ থেকে সাড়ে ৫ কোটি টাকা।

কোনো এলাকায় এফএআরের মান কম হয়েছে বলে রাজউকে কেউ যৌক্তিক আবেদন করলে বিবেচনা করা হবে।
আশরাফুল ইসলাম, প্রকল্প পরিচালক, ড্যাপ

এ প্রসঙ্গে আবাসন ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিহ্যাবের সভাপতি আলমগীর শামসুল আলামিন বলেন, নির্মাণ খরচ, ডলারের মূল্যবৃদ্ধিসহ নানা কারণে ফ্ল্যাটের দাম বেড়েছে। নতুন ড্যাপে দেওয়া এফএআরের কারণে ভবনের আয়তন কমবে, এতে জোগানও কমবে। ফলে ফ্ল্যাটের দাম ও ভাড়া আরও বাড়বে। তিনি বলেন, পূর্বাচলের মতো যেসব এলাকা এখনো গড়ে ওঠেনি, সেসব এলাকায় নতুন ড্যাপ বাস্তবায়ন করা উচিত।

পাশের দেশের ভবন

ভারতের বিভিন্ন শহরে ব্যক্তিমালিকানাধীন প্লটে (৩ থেকে ৫ কাঠা) ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে উচ্চতা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। দিল্লিতে প্লটভিত্তিক ভবনে এফএআরের মান ২ থেকে সর্বোচ্চ ৩ দশমিক ৫ দেওয়া হয়, যাতে সর্বোচ্চ ৫ তলা ভবন করা যায়। চেন্নাইয়ে ১০ কাঠার প্লটে সর্বোচ্চ ৫ তলা ভবন নির্মাণ করা যায়। বেঙ্গালুরুতে আবাসিক এলাকার এফএআরের মান ১ দশমিক ৭৫ থেকে সর্বোচ্চ ৩ দশমিক ২৫। ৩০ ফুট পর্যন্ত প্রশস্ত রাস্তার পাশে ৪ তলা পর্যন্ত ভবন করা যায়।

নগর–পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ব্যক্তিমালিকানার প্লটে উচ্চতা নিয়ন্ত্রণের ফলে ভারতের সবচেয়ে জনবহুল এলাকায়ও প্রতি একরে ১০০ মানুষ বাস করে। আর ঢাকার কেন্দ্রীয় নগর এলাকায় প্রতি একরে চার গুণ অর্থাৎ ৪০০ মানুষ বাস করে। এফএআরের মান না কমালে রাজধানী আরও জনবহুল হবে, ধীরে ধীরে এই নগরে বাসযোগ্যতা আরও কমবে। বৈশ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় না নিয়ে ২০০৮ সালে ব্যক্তিগত প্লটে সাড়ে ৬ পর্যন্ত এফএআরের মান দেওয়া হয়েছিল। যৌক্তিক কারণেই নতুন ড্যাপে এফএআরের মান সংশোধন করা হয়েছে।

কোন এলাকায় উঁচু ভবন

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মধ্যে গুলশান-বারিধারা এলাকায় সবচেয়ে উঁচু আবাসিক ভবন নির্মাণ করা যাবে। উত্তর সিটির মিরপুর–১১, বাউনিয়া, পাইকপাড়া, কল্যাণপুর, জোয়ার সাহারা, কুড়িল, খিলক্ষেত, কালাচাঁদপুর, কড়াইল, মেরুল বাড্ডা, রামপুরা, উলন, নিকেতন, নয়াটোলা, মধুবাগ প্রভৃতি এলাকায় তুলনামূলক কম উচ্চতা বা আয়তনের ভবন হবে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটির শাহবাগ, বাংলামোটর, পরীবাগ, ধানমন্ডি এলাকায় উঁচু ভবন নির্মাণ করা যাবে। গোড়ান, সিপাহীবাগ, মধ্য বাসাবো, আনসারাবাদ, সবুজবাগ, কদমতলা, দক্ষিণগাঁও, মালিবাগ, শান্তিবাগ, শুক্রাবাদ, পশ্চিম রাজাবাজার, জিগাতলা প্রভৃতি এলাকায় তুলনামূলক কম উচ্চতার ভবন হবে।

তবে ড্যাপের প্রকল্প পরিচালক আশরাফুল ইসলাম বলেন, ব্লকভিত্তিক ভবন করলে ৩০ শতাংশ এবং স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য ৪৫০ থেকে ৬০০ বর্গফুটের ৫টি ফ্ল্যাট করলে প্রণোদনা হিসেবে অতিরিক্ত আরও ২ হাজার ৫০০ বর্গফুট (৫ কাঠার প্লটে) আয়তন প্রণোদনা পাওয়া যাবে। ড্যাপে প্রতি তিন বছর পরপর এফএআরের মান সংশোধনের বিধান রাখা হয়েছে। এরপরও কোনো এলাকায় এফএআরের মান কম হয়েছে বলে রাজউকে কেউ যৌক্তিক আবেদন করলে বিবেচনা করা হবে।

যে কারণে ভবন উঁচু–নিচু

ঢাকা উত্তর সিটির আওতাধীন মোহাম্মদপুর ও শ্যামলীর (২৯ থেকে ৩৪ ওয়ার্ড) আয়তন ২ হাজার ৪৭০ একর, যাতে প্রায় তিন লাখ মানুষ থাকার কথা, আছে দ্বিগুণের বেশি। এতে স্বাভাবিকভাবেই চাপ পড়ছে নাগরিক সেবায়।

ড্যাপের ‘ওয়ার্কিং রিপোর্ট’ অনুযায়ী, জনসংখ্যার অনুপাতে এই এলাকায় ১২৩টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রয়োজন, আছে মাত্র ১০টি। খেলার মাঠ ও পার্ক থাকা উচিত ১৪৭ একর, আছে প্রায় ৩৮ একর। ফলে নাগরিক সেবার মান কম ও অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা এলাকায় এফএআরের মান কমানো হয়েছে।

ড্যাপের এই এফএআরের মানকে বৈষম্যমূলক হিসেবে দেখছেন স্থপতি ইকবাল হাবিব। তিনি বলেন, পরিকল্পিত এলাকা বলতে যা বোঝানো হচ্ছে, তা রাজউক ও জনগণের অর্থায়নে ধনী মানুষের জন্য তৈরি করা।

যেসব এলাকাকে অপরিকল্পিত বলা হচ্ছে, সেগুলোকে পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার আওতায় আনাই হচ্ছে ড্যাপের কাজ। এফএআর নির্ধারণের ক্ষেত্রে উন্নয়ন সম্ভাবনা অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ১৯টি নতুন ওয়ার্ডে সরকারের উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ চলছে। ড্যাপ প্রণয়নের সময় সেটি বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। এ জন্য সাম্যের ভিত্তিতে এফএআর নির্ধারণ করতে হবে।

তবে নগর–পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক আকতার মাহমুদ বলেন, কোনো এলাকা পরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠবে—এই সম্ভাবনা থেকে আগেই এফএআরের মান বাড়িয়ে দেওয়া ঠিক হবে না, বিদ্যমান অবস্থা বিবেচনায় নিয়েই করতে হবে। কারণ, কোনো এলাকা পরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠলে এফএআরের মান সংশোধনের সুযোগ আছে।