হামলা চালিয়ে একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশের প্রেসিডেন্ট ও তাঁর স্ত্রীকে যেভাবে যুক্তরাষ্ট্র তুলে নিয়ে গেছে, তা অকল্পনীয়। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তুলে নিয়ে গিয়ে সভ্যতা, গণতন্ত্র, মানবাধিকার, আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করেছেন। এ জন্য তাঁর বিচার হওয়া উচিত। অবিলম্বে আমাদের দেশের সরকারকে এই আগ্রাসনের নিন্দা জানাতে হবে।
এ ঘটনার প্রতিবাদে বৃহস্পতিবার বিকেলে সাংস্কৃতিক সমাবেশ ও বিক্ষোভ মিছিল করেছে গণতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক ঐক্য। রাজধানীর শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে আয়োজিত সমাবেশ থেকে ওই দাবি করা হয়।
গণতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক ঐক্যের আহ্বায়ক ও উদীচী শিল্পী গোষ্ঠীর সাধারণ সম্পাদক জামসেদ আনোয়ার তপনের সভাপতিত্বে সভায় কবি, শিল্পী, সাহিত্যিক, শিক্ষক, সাংস্কৃতিক কর্মী ও ছাত্রনেতারা বক্তব্য দেন।
সভায় গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির সদস্য অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, জাতিসংঘ এখন একটি মৃতপ্রায় প্রতিষ্ঠান। যদি জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকার কার্যকর হতো—তাহলে মাদুরো নন, ট্রাম্প আজ কারাগারে থাকতেন। আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন, যুদ্ধাপরাধ ও গণহত্যার দায়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিচার হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে তা হচ্ছে না। সবার চোখের সামনে মার্কিন প্রেসিডেন্টের ছত্রচ্ছায়ায় মাদুরোকে তাঁর দেশ থেকে অপহরণ করা হলো। একইভাবে মার্কিন সমর্থনে ইসরায়েল ফিলিস্তিনে গণহত্যা চালাচ্ছে।
আনু মুহাম্মদ বলেন, এখন মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ আর মুখোশে তাদের মুখ ঢেকে রাখছে না। তাদের প্রেসিডেন্ট কোনো রাখঢাক না করে সরাসরি বলে দিয়েছেন ভেনেজুয়েলার বিপুল তেল, সোনার খনিসহ মূল্যবান খনিজ সম্পদ তাঁরা দখল করবেন। মাদুরো তাঁদের স্বার্থে বাধা দিয়েছেন। তাঁদের প্রভাব থেকে বেরিয়ে আসতে চেয়েছেন। সে কারণেই মিথ্যা অভিযোগ তুলে তাঁকে অপহরণ করে নিয়ে গেছে যুক্তরাষ্ট্র। জাতিসংঘের সামনে এখন করণীয় হলো নিজের কার্যকারিতা প্রমাণ করা। মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে মুক্ত করে তাঁদের নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার ব্যবস্থা করা। একই সঙ্গে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের এই আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে বৈশ্বিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।
বাংলাদেশ লেখক শিবিরের সাধারণ সম্পাদক শফী রহমান বলেন, ‘দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ নানাভাবে বিশ্বের ওপর প্রভাব বিস্তার করে চলেছে। জনগণের জীবন সম্পদ সংস্কৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে তাদের আগ্রাসী ভূমিকা ক্রমেই প্রবল হয়ে উঠছে। শুল্ক আরোপ, নিষেধাজ্ঞা আরোপ এমন নানা কৌশল অবলম্বন করার পর এখন তারা সরাসরি একটি স্বাধীন দেশের প্রেসিডেন্টকে তুলে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটিয়েছে। ভেনেজুয়েলার পর তারা কিউবা ও কলম্বিয়াকে হুমকি দিয়েছে। আমাদের দেশও তাদের নীলনকশার বইরে নয়। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে জনগণের বিপুল ঐক্য গড়ে তোলা এখন জরুরি প্রয়োজন।’
জাতীয় কবিতা পরিষদের সভাপতি কবি মোহন রায়হান বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলায় যে বর্বর আগ্রাসন চালিয়ে নির্বাচিত প্রেসিডেন্টকে তুলে নিয়ে গেছে, তার চেয়ে নৈরাজ্য সভ্যসমাজে আর কী হতে পারে! বিশ্ববিবেক আজ কোথায়?’ তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশও মার্কিন আগ্রাসনের ঝুঁকিমুক্ত নয়। পাশাপাশি সম্প্রতি স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির আস্ফালন লক্ষ করা যাচ্ছে।’ তিনি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও স্বাধীনতাবিরোধী শক্তিকে রুখে দিতে গণপ্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানান।
যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক অভিনু কিবরিয়া ইলিয়াস বলেন, মার্কিন স্বার্থের প্রতিবাদ করায় মিথ্যা অভিযোগ তুলে লিবিয়ায় মুয়াম্মার গাদ্দাফি, ইরাকে সাদ্দাম হোসেনকে হত্যা করা হয়েছে। এখন আর তাদের কোনো অজুহাত তোলার প্রয়োজন হচ্ছে না। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে তুলে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা স্পষ্টই আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ কোনো আইনের তোয়াক্কা করছে না।
বিবর্তন সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক মফিজুর রহমান বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এখন সরাসরি ডাকাত, লুটেরার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। এই লুটেরাদের প্রতিরোধ করতে হবে।
সভায় আরও বক্তব্য দেন ’৬৯–এর অভ্যুত্থানের নেত্রী দীপা দত্ত, চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেন, গণতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের সমন্বয়ক অমল ত্রিপুরাসহ অনেকে।
সভাপতির বক্তব্যে জামসেদ আনোয়ার বলেন, ‘ভেনেজুয়েলায় মার্কিন আগ্রাসনের ঘটনায় আমরা তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই।’ কিন্তু এখন পর্যন্ত সরকারিভাবে কোনো প্রতিবাদ জানানো হয়নি। তিনি অবিলম্বে এ ঘটনার নিন্দা ও প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে সস্ত্রীক মুক্তির দাবি করে সরকারকে বিবৃতি প্রদানের দাবি জানান।
আলোচনার পর প্রতিবাদী সংগীত পরিবেশন করেন বিবর্তন সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের শিল্পীরা। তাঁদের গানগুলোর মধ্যে ছিল, ‘সুদূর সমুদ্দুর প্রশান্তির বুকে’, ‘মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ধ্বংস হোক, নিপাত যাক।’ এরপর একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়।