কালশী বস্তির আগুন নিয়ন্ত্রণে, বাসিন্দাদের হাহাকার
রাজধানীর পল্লবীর কালশী এলাকার বস্তির আগুন নিয়ন্ত্রণে এসেছে। ফায়ার সার্ভিসের ১৫টি ইউনিটের প্রায় দুই ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। তবে আগুনে কেউ হতাহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি।
সোমবার রাত ৯টা ৩৫ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার তথ্য জানান ফায়ার সার্ভিস মিডিয়া সেলের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তালহা বিন জসিম। এর আগে সন্ধ্যা ৭টা ২৩ মিনিটে আগুন লাগে।
আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার পর ফায়ার সার্ভিসের প্রশিক্ষণ, পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিভাগের পরিচালক লে. কর্নেল এম এ আজাদ আনোয়ার পরিস্থিতি জানিয়ে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন। তিনি বলেন, আগুনের কারণে বস্তির ঘরগুলো শুরুতেই ভেঙে পড়ে। সেখানে প্লাস্টিক ও কাগজের মতো দাহ্য বস্তু বেশি ছিল; আর বাতাসের কারণে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
ফায়ার সার্ভিসের এই কর্মকর্তা আরও বলেন, বস্তির আশপাশে পানির স্বল্পতা ছিল। ফলে মূল আগুনের কাছে পৌঁছাতে সময় কিছুটা বেশি লেগেছে। আগুন পুরোপুরি নেভাতে সময় লাগবে। তবে এখন পর্যন্ত হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। এমনকি নিখোঁজের খবরও তাঁরা পাননি।
এদিকে রাত ১০টার দিকে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, আগুন পুরোপুরি নেভাতে কাজ করছেন ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা। প্রচুর ধোঁয়া হচ্ছে। ঘর হারানো মানুষেরা বস্তির পাশেই ইসিবি চত্বর থেকে কালশীমুখী রাস্তার ওপর বসে আছেন। আগুন লাগার পর যে যতটুকু পেরেছেন ঘরের মালামাল বের করে তা নিয়ে রাস্তায় বসে রয়েছেন।
আগুন লাগার কারণ হিসেবে স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, সোমবার বিকেলে বস্তির এক দোকানির সঙ্গে স্থানীয় এক যুবকের ঝগড়া হয়। একপর্যায়ে ওই যুবক বস্তিতে আগুন লাগিয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিল। এ ঘটনার দেড় থেকে দুই ঘণ্টা পরেই বস্তিতে আগুন লাগে। আগুন লাগার পর বাসিন্দারা ওই যুবককে মারধর করে পুলিশের কাছে সোপর্দ করে।
পল্লবী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাসান বাসির প্রথম আলোকে বলেন, জিজ্ঞাসাবাদের জন্য এক যুবককে আটক করা হয়েছে। উত্তেজিত জনতার মারধরে তিনি কিছুটা অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাঁর প্রাথমিক চিকিৎসা চলছে। এরপর তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।
রাত ১০টার দিকে ঘটনাস্থলে আসেন ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক। সেখানে তিনি ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সঙ্গে কথা বলেন এবং ঘটনায় কেউ জড়িত থাকলে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন।
নাশকতার আশঙ্কা আছে কি না, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে আমিনুল হক বলেন, সন্দেহ অমূলক নয়। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ইতিমধ্যে তিনি বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেছেন।
ফায়ার সার্ভিসের তথ্যমতে, বস্তিতে প্রায় ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ ঘর ও দোকান ছিল। আনুমানিক সাড়ে তিন হাজার লোক এই বস্তিতে বাস করতেন। আগুনে সব কটি ঘর পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। বেশির ভাগ দোকানেই ভাঙারির মালামাল ছিল।
তেমনই এক ভাঙারির দোকানি লাল মিয়া রাস্তার পাশে বসে কান্নাকাটি করছিলেন। তাঁকে ঘিরে ধরে দুজন ব্যক্তি সান্ত্বনা দিচ্ছেন। কাছে গিয়ে কারণ জিজ্ঞাসা করতেই তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন।
কিছুক্ষণ কান্নাকাটির পর নিজেকে সামলে নিয়ে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার সব শেষ। দোকানে প্রায় ৫০ লাখ টাকার মাল ছিল। আগামীকাল মাল বিক্রির কথা ছিল, তার আগেই আগুনে সব পুড়ে গেছে। এখন আমি কী করব বুঝতে পারছি না।’
রাস্তার ওপর বসে আহাজারি করছিলেন বস্তির বাসিন্দা আমির উদ্দিন। তিনিও ভাঙারির ব্যবসা করেন। বস্তিতে দুটি ঘরে পরিবার নিয়ে থাকতেন। তিনি বলেন, ‘ঘরের মালামাল কিছুই বের করতে পারিনি। কোনো রকম বউ–বাচ্চাকে নিয়ে বের হয়ে এসেছি। আমার ঘরে ব্যবসার ৩৭ হাজার নগদ টাকা ছিল। ঈদের দিন বিকেলে মহাজনকে এই টাকা দেওয়ার কথা; কিন্তু টাকা সব পুড়ে গেছে।’