জয় গোস্বামীর আনন্দপাঠে হৃদি ভেসে গেল দর্শকের
ঢাকা লিট ফেস্টের দ্বিতীয় দিন আজ শুক্রবার বাংলা একাডেমির নজরুল মঞ্চে শীতের সন্ধ্যা তখন জমে উঠেছে। এর মধ্যে মঞ্চে কলকাতার জনপ্রিয় কবি জয় গোস্বামী যখন ‘হাঁস’ নামের কবিতা থেকে ‘এই জন্মে তুমি শীতের দেশের হাঁস’ চরণটি উচ্চারণ করলেন, দর্শক-শ্রোতাদের মনে শীত যেন আরও খানেকটা জেঁকে বসল। জয়ের কবিতা আর কথার আবেশে তাঁরা তো বুঁদ হয়ে ছিলেন আগেই, সন্ধ্যা লাগোয়া ক্ষণে সাড়ে পাঁচটায় ‘মুখোমুখি’ শিরোনামে এই কবির কবিতা সন্ধ্যা যখন শুরু হলো, সেই সময় থেকেই।
বাংলাদেশের কবি শামীম রেজার সঞ্চালনায় এই একক কবিতা পড়ার আসরের শুরুতেই প্রায় ৭০ বছর বয়সী কবি প্রণাম জানালেন বাংলাদেশের অভিনয়শিল্পী মোশাররফ করিমের উদ্দেশ্যে, ‘আামি তাঁর অভিনয়ের খুব ভক্ত, তাঁকে আমার প্রণাম।’
এরপর তিনি শুরু করলেন কবিতাপাঠ। আসর শুরু হলো তাঁর অতি বিখ্যাত ‘হৃদি ভেসে যায় অলকানন্দা জলে’ দিয়ে। কবিতাটি পড়া শেষে এই কবিতা লেখার পেছনের গল্পও পাঠকের সামনে উন্মোচন করলেন কবি, ‘কবিতাটি লিখেছিলাম আলোকানন্দা নামের এক মেয়েকে উদ্দেশ্য করে। কিন্তু মার্ক্সবাদে দীক্ষিত মেয়েটি এই কবিতা তখন পছন্দ করেনি।’
কবির এমন সরল স্বীকারোক্তির পর দর্শক-শ্রোতার করতালিতে যে সময় নজরুল মঞ্চের সামনের উন্মুক্ত স্থানটি মুখর হয়ে উঠেছে, সে সময় তিনি আবার কবি বুদ্ধদেব বসুর একটি লেখার সূত্র ধরে বললেন, ‘কবিরা ভাগ্যবান। কারণ, তারা অজানার উদ্দেশ্যে বলতে পারে। অলোকানন্দা নামের মেয়েটি সেদিন এই কবিতা পছন্দ করেনি। তবে আপনারা আজ কবিতাটি শুনে করতালি দিচ্ছেন। এ জন্য আমি নিজেকে ভাগ্যবান মনে করছি।’
কবিতা পড়ার ফাঁকে ফাঁকে এমন করেই নিজের জীবনের নানা ঘটনা উজাড় করে দিচ্ছিলেন জয় গোস্বামী। যেমন তাঁর বহুশ্রুত কবিতা ‘পাগলি, তোমার সঙ্গে’ পড়া শেষে জানালেন এই কবিতা রচনার প্রেক্ষাপটও, ‘এ কবিতা লিখেছিলাম বুবুনকে সঙ্গে নিয়ে কাবেরী (কবির স্ত্রী) যখন আমার সংসারে এসেছিল, তখন। বিবাহবহির্ভূতভাবে আমরা তিন বছর একত্রে বাস করেছি। তারপর বিয়ে করেছি। এই কবিতায় সেই সময় ধরা আছে।’
‘আপনার কবিতায় কেউ কেউ নিষিদ্ধ বা নীতিবিরুদ্ধ সম্পর্কের উদ্ভাস দেখেন, এ সম্পর্কে কী বলবেন?’ ‘পাগলি, তোমার সঙ্গে’ কবিতা ও কবিতার পেছনের গল্পটি খোলাসা করার পর স্বাভাবিকভাবেই সঞ্চালক কবির দিকে ছুড়ে দিলেন প্রশ্নটি।
এ প্রশ্নে কবির সরল উত্তর ছিল, ‘কবিতাগুলো আমি যখন লিখেছি, তখনকার আমি আর এখনকার আমি পুরোপুরি ভিন্ন।’
হ্যাঁ, ‘ক্রিসমাস ও শীতের সনেটগুচ্চ’, ‘আলেয়া হৃদ’ বা ‘ভূতুমভগবান’-এর যে জয় গোস্বামী, এখন তিনি অনেকটাই বদলে গেছেন। এটি বোঝা গেল সাম্প্রতিককালে লেখা তাঁর কবিতা শুনেও। জয় গোস্বামীর এই সময়ে রচিত ‘ব্যাঁ ব্যাঁ কবিতা’, ‘অডিটোরিয়াম’, ‘শাহেনশাহ ও বিনকার’ প্রভৃতি শুনতে শুনতে সবারই মনে হলো, এখন এ কবির কবিতায় বড় হয়ে দেখা দিয়েছে এক দমবন্ধ সময়ের হাঁসফাঁস। আর কবিতাগুলো এত নাটকীয় ভঙ্গিতে তিনি পড়লেন যে বারবার দর্শকের উচ্ছ্বাস ও করতালিতে হেসে উঠছিল সন্ধ্যার নজরুল মঞ্চ।
কথায় কথায় সঞ্চালক শামীম রেজা তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন বাংলাদেশের কবি ও কবিতা নিয়ে।
সেই সূত্রে জয় এবার মুখস্থ পড়তে শুরু করলেন বাংলাদেশের দুই অগ্রজ কবি শহীদ কাদরী ও নির্মলেন্দু গুণের কবিতা। সঙ্গে সঙ্গে তিনি বললেন, ‘কবিতা পড়ার সময় আমি দুই বাংলাকে আলাদা করে দেখি না।’
অনুষ্ঠানের একপর্যায়ে তিনি সঞ্চালক শামীম রেজাকে তাঁর নিজের কবিতা পড়তে বললে শামীম দুটি কবিতা পড়ে শোনান। জয় গোস্বামীর একক কবিতাপাঠের অনুষ্ঠানটি শেষমেস জয় ও শামীমের যুগলবন্দীতে, এপার আর ওপার বাংলার মেলবন্ধনে বর্ণিল হয়ে ওঠে।
কবিতাপাঠের শুরুতে ‘হৃদি ভেসে যায় অলোকানন্দা জলে’ কবিতা পড়তে গিয়ে জয় গোস্বামী উচ্চারণ করলেন এ কবিতার চিরচেনা সেই পঙ্ক্তি, ‘... করো আয়োজন, আনন্দ করে পড়ো।’
নাটকীয় ঢঙে কবির কবিতা ও কথা শুনতে শুনতে দর্শক-শ্রোতাও যেন ঘণ্টা দুয়েক ধরে অবগাহন করলেন কাব্যরসের এক অনিন্দ্যধারায়।