৭৬৫ নম্বর বাড়িটি ছিল অনেক ইতিহাসের সাক্ষী
রাজধানীর ধানমন্ডিতে ওই বাড়ির নম্বর ৭৬৫। বাড়িটিতে শনিবার ছিল মানুষের আনাগোনার শেষ দিন। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় বাড়িটি ছিল অনেকের কাছে গোপন আস্তানা, নিরাপদ আশ্রয়। ইতিহাসের সাক্ষী এই বাড়ি ভেঙে ফেলার সঙ্গে একটি অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটবে। পারিবারিক সিদ্ধান্তে বাড়িটি ভেঙে ফেলা হচ্ছে।
পাকিস্তান আমলের বৈরী সময় ও স্বাধীনতার পরও দেশের শিক্ষা-সংস্কৃতির বিকাশ ও রাজনৈতিক ক্রান্তিলগ্ন উত্তরণের পথে অগ্রগণ্য ভূমিকা রেখেছিলেন অধ্যাপক খান সারওয়ার মুরশিদ। তাঁর স্ত্রী নূরজাহান মুরশিদ ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, নারীনেত্রী এবং স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম স্বাস্থ্য ও সমাজকল্যাণমন্ত্রী। ধানমন্ডির ওই বাড়ি এই দম্পতির।
ষাটের দশকে বাড়িটির নকশা করেছিলেন আধুনিক স্থাপত্যের জনক স্থপতি মাজহারুল ইসলাম। সময়ের প্রয়োজনে হয়তো বাড়িটি সংরক্ষণের উপায় নেই, কিন্তু এই বাড়ির সঙ্গে যে বিখ্যাত মানুষেরা জড়িত ছিলেন, তাঁদের স্মরণ করা যেন থেমে না যায়, তা–ই চাইছেন বাড়িটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
তাই বাড়িটির স্মৃতিকে ধরে রাখতে, বাড়িটির সঙ্গে জড়িত মানুষগুলোর কাজকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে ‘উত্তরসূরি’ এবং স্থপতিদের অধ্যয়নকেন্দ্র ‘মঙ্গলবারের সভা’ বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতার আয়োজন করে শনিবার।
আগের প্রজন্মের আলোকিত ব্যক্তিদের স্বদেশ, সমাজ, ইতিহাস, সংস্কৃতি ও মানবিক মূল্যবোধ নিয়ে ভাবনাগুলোকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে এই বাড়িতেই ‘উত্তরসূরি’ নামের সংগঠনটির আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল ২০২১ সালে।
খান সারওয়ার মুরশিদ-নূরজাহান মুরশিদ দম্পতি যেভাবে বাড়িটিকে সাজিয়েছিলেন, শনিবার অনেকটা সেই আদলে বাড়িটিকে সাজানো হয়েছিল। পরিবারটির বন্ধুস্বজন ও স্থাপত্যবিদ্যায় পড়াশোনা করা শিক্ষার্থীরা যাতে বাড়িটি ঘুরে দেখতে পারেন, তাই প্রদর্শনীর আয়োজন ছিল শনিবার সকাল থেকে। সন্ধ্যায় অনেকটা ঘরোয়া পরিবেশেই বাড়িটির নকশার নানা দিক নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি খান সারওয়ার মুরশিদ-নূরজাহান মুরশিদের কন্যা শারমিন মুরশিদ, শারমিন মুরশিদের কন্যা সায়কা চৌধুরীসহ অন্যরা স্মৃতিচারণা করেন।
এসব নানা আয়োজনে সহযোগিতা করে মুরশিদ ট্রাস্টের পরিচালিত নূরজাহান-সারওয়ার মুরশিদ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, মাজহারুল ইসলাম আর্কাইভ।
নির্বাচন পর্যবেক্ষণকারী ও ব্রতীর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শারমিন মুরশিদ স্মৃতিচারণায় ফিরে গেলেন তাঁর ছোটবেলায়। উত্তরসূরির প্রধান নির্বাহী হিসেবে দায়িত্ব পালন করা শারমিন মুরশিদের বিয়ের আনুষ্ঠানিকতারও সাক্ষী শ্রেয়সী নামের বাড়িটি। ভাষা আন্দোলন, স্বাধীনতাসংগ্রাম, রবীন্দ্রজন্মশতবর্ষ উদ্যাপন, বাঙালির সাংস্কৃতিক জাগরণ, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন, স্বৈরশাসনবিরোধী আন্দোলনে গোপন আলোচনার জন্য সবাই বাড়িটিকে নিরাপদ আশ্রয় বলে মনে করতেন।
বাড়িটির নকশা প্রসঙ্গে শারমিন মুরশিদ বলেন, ধানমন্ডির মতো জায়গায় এই বাড়িতে একটি উঠান ছিল। উঠান থেকে সরাসরি আকাশ দেখা যেত। উঠান থেকে বাড়িটির ভেতরে বিভিন্ন দিক থেকে ঢোকার ব্যবস্থা ছিল। গ্রামীণ আবহে আধুনিক বাড়ি ছিল এটি। চার ভাইবোনের পারিবারিক সিদ্ধান্তে বাড়িটি ভেঙে ফেলা হচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে একটি সময়ের ইতি ঘটবে।
সায়কা চৌধুরী জানালেন, তিনি এ বাড়ির উঠানেই সাইকেল চালানো শিখেছিলেন। ছোটবেলায় বাড়িটিকে তেমন বিশেষ মনে না হলেও এখন টের পাচ্ছেন, বাড়িটি কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
স্থপতি নাহাস খলিল বলেন, স্থপতি মাজহারুল ইসলাম ছিলেন প্রথম দেশীয় স্থপতি, যিনি বিদেশে দীক্ষা নিয়ে দেশে এসে কাজ শুরু করেছিলেন। তিনিই তাঁর উত্তরসূরিদের জন্য পথটা মসৃণ করে দিয়ে গেছেন। তাঁর জন্যই অন্যদের ভুল পথে হাঁটতে হয়নি। তিনি পঞ্চাশের দশকে যে কাজ শুরু করেছিলেন, আশির দশকে ওই কাজগুলোকেই বিশ্ব স্বীকৃতি দেয়। তিনি যেকোনো স্থাপনায় প্রকৃতিকে প্রাধান্য দিতেন, বাহুল্য বাদ দিতেন। প্রতিবেশীদের আর্থিক অবস্থা কেমন, তা–ও জানার চেষ্টা করতেন। মাজহারুল ইসলামের কাজগুলো হারিয়ে যাচ্ছে, তা ধরে রাখার উদ্যোগ নিতে হবে।
সেন্ট্রাল উইমেন্স ইউনিভার্সিটির উপাচার্য পারভীন হাসান, বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক লুভা নাহিদ চৌধুরী, মাজহারুল ইসলাম আর্কাইভের ইনচার্জ মুহতাদিন ইকবাল, মঙ্গলবারের সভার প্রতিনিধি নুসরাত সুমাইয়া প্রমুখ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।