ঝিলমিল থেকে বাদ পড়ছে মালয়েশিয়ার কোম্পানি

বাস্তবায়িত হলে ঝিলমিল রেসিডেন্সিয়াল পার্ক হবে এমনছবি: প্রকল্পের ত্রিমাত্রিক চিত্র

ঢাকার পাশে কেরানীগঞ্জের ঝিলমিলে ১৪ হাজার ফ্ল্যাট নির্মাণ প্রকল্পের কাজ হারাচ্ছে মালয়েশিয়ার কোম্পানি। কোম্পানিটির নানা অনিয়ম, অসংগতি ও আর্থিক সক্ষমতা না থাকায় সরকার তাদের সঙ্গে ৯ বছর আগে স্বাক্ষরিত চুক্তিটি বাতিল করতে যাচ্ছে।

আজ মঙ্গলবার অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির যে সভা হবে, সেখানে চুক্তি বাতিলের প্রস্তাবটি উত্থাপন করা হবে বলে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে।

সরকারি–বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) মাধ্যমে ফ্ল্যাট নির্মাণ প্রকল্পটি বাস্তবায়নে মালয়েশিয়ার কোম্পানি বিএনজি গ্লোবাল হোল্ডিংস অ্যান্ড কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে ২০১৭ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে চুক্তি করেছিল রাজউক।

আরও পড়ুন

চুক্তি অনুযায়ী, ঝিলমিল আবাসিক এলাকায় ১৬০ একর জমিতে মধ্য আয়ের মানুষদের জন্য ১৪ হাজার ফ্ল্যাট নির্মাণের কথা বিএনজি গ্লোবালের। মোট ৮৫টি ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়। ভবনগুলোর মধ্যে ৬০টি হওয়ার কথা ২০ তলা (সেমি বেজমেন্টসহ) ও ২৫টি ২৫ তলার (বেজমেন্টসহ)। মোট তিনটি শ্রেণিতে ফ্ল্যাট হওয়ার কথা ১৩ হাজার ৭২০টি। ‘এ’ শ্রেণির ১ হাজার ৫৫০ বর্গফুট আয়তনের ফ্ল্যাট ৯ হাজার ১২০টি, ‘বি’ শ্রেণির ১ হাজার ৭৫০ বর্গফুটের ২ হাজার ৫৭৬টি এবং ‘সি’ শ্রেণির ২ হাজার ৪০০ বর্গফুটের ফ্ল্যাট ২ হাজার ২৪টি।

ঝিলমিল আবাসিক এলাকায় ১৬০ একর জমিতে মোট ৮৫টি ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়। ভবনগুলোর মধ্যে ৬০টি হওয়ার কথা ২০ তলা (সেমি বেজমেন্টসহ) ও ২৫টি ২৫ তলার (বেজমেন্টসহ)। মোট তিনটি শ্রেণিতে ফ্ল্যাট হওয়ার কথা ১৩ হাজার ৭২০টি। ‘এ’ শ্রেণির ১ হাজার ৫৫০ বর্গফুট আয়তনের ফ্ল্যাট ৯ হাজার ১২০টি, ‘বি’ শ্রেণির ১ হাজার ৭৫০ বর্গফুটের ২ হাজার ৫৭৬টি এবং ‘সি’ শ্রেণির ২ হাজার ৪০০ বর্গফুটের ফ্ল্যাট ২ হাজার ২৪টি।

বুড়িগঙ্গা নদীর ওপর চীন-বাংলাদেশ মৈত্রী সেতু থেকে দুই কিলোমিটার পশ্চিমে ঝিলমিল আবাসিক প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছিল ৯ হাজার ৯৭৯ কোটি টাকা। পুরো টাকা বিনিয়োগ করার কথা ছিল বিএনজি গ্লোবালের। তবে তারা এক টাকাও বিনিয়োগ করেনি। গত ৯ বছরে ফ্ল্যাট নির্মাণের কাজও হয়নি। তাই কোম্পানিটির সঙ্গে চুক্তি বাতিল করতে যাচ্ছে বর্তমান সরকার।

অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সভায় উত্থাপনের জন্য তৈরি করা নথিতে দেখা যায়, চুক্তি অনুযায়ী, রাজউক ও বেসরকারি অংশীদারি প্রতিষ্ঠান বিএনজি গ্লোবালের মোট ১২ শর্ত প্রতিপালনের কথা। এর মধ্যে রাজউকের জন্য চারটি এবং বিএনজির জন্য আটটি শর্ত পালনীয় ছিল। রাজউক তিনটি শর্ত পূরণ করলেও বিএনজি গ্লোবাল একটি শর্তও পূরণ করেনি।

নিয়ম অনুযায়ী, পিপিপি চুক্তি সইয়ের ১৮০ দিনের মধ্যে শর্ত পূরণের বাধ্যবাধকতা ছিল। ২০২৪ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি বিএনজি গ্লোবালকে তাদের শর্ত পূরণের জন্য চিঠি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তারা তা পূরণ করেনি।

নথিতে আরও দেখা যায়, বিএনজি গ্লোবালের দেওয়া তথ্য সঠিক আছে কি না, তা জানতে ২০২৩ সালের অক্টোবরে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়ে অনুরোধ জানায় গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়।

পিপিপি চুক্তি সইয়ের পর শর্ত পালনে বিএনজি গ্লোবালকে তাগিদ দিলেও তারা তা পূরণ করেনি। মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ হাইকমিশন থেকে তথ্য নিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মূল্যায়নে বলা হয়, বিএনজি গ্লোবাল হোল্ডিংসের আর্থিক সক্ষমতা ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য তথ্যে অসংগতি রয়েছে। প্রকল্পের অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান বোলভার্ড ক্যাপিটাল পার্টনার লিমিটেডের বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়, প্রতিষ্ঠানটির দেওয়ার ঠিকানা অনুযায়ী সেখানে গিয়ে তাদের অফিস পাওয়া যায়নি।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ হাইকমিশনকে দিয়ে বিএনজি গ্লোবাল হোল্ডিংসের বিষয়ে তথ্যানুসন্ধান চালায়। এরপর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মূল্যায়ন প্রতিবেদনে কোম্পানিটির আর্থিক ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য তথ্যে অসংগতি থাকার কথা বলা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারির হিসাব অনুযায়ী, কোম্পানির নিট মুনাফা মাত্র ৬৯৬ ডলার। ফলে এই প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে ঝিলমিল রেসিডেন্সিয়াল পার্ক প্রকল্প বাস্তবায়ন সমীচীন হবে না।

ঝিলমিল আবাসিক প্রকল্পে কোনো কাজই এগোয়নি
ফাইল ছবি: প্রথম আলো

এ ছাড়া এ প্রকল্পের অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান বোলভার্ড ক্যাপিটাল পার্টনার লিমিটেডের বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়, প্রতিষ্ঠানটির দেওয়ার ঠিকানা অনুযায়ী সেখানে গিয়ে তাদের অফিস পাওয়া যায়নি।

একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ক্রেডিট রেটিং সংস্থার এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, বোলভার্ড ক্যাপিটাল একটি একক ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান। এই কোম্পানির পরিশোধিত মূলধন ১০ হাজার হংকং ডলার। বাংলাদেশের মুদ্রায় যার পরিমাণ ১ লাখ ৪১ হাজার টাকা। অর্থাৎ এই প্রকল্পে অর্থায়ন করার মতো সক্ষমতা তাদের নেই।

নথি পর্যালোচনা করে আরও জানা যায়, মালয়েশিয়ার কোম্পানি বিএনজি গ্লোবালের বিরুদ্ধে চীনের কোম্পানি জিআনজি কনস্ট্রাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি লিমিটেড ঢাকায় চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে একটি অভিযোগ দায়ের করে। তাতে বলা হয়, বিএনজি গ্লোবাল হোল্ডিংস লিমিটেড এবং এসভিসি ঝিলমিল রেসিডেন্সিয়াল লিমিটেড নামের দুটি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে যৌথ উদ্যোগে ২৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ সংগ্রহ করে প্রতারণার মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ করেছে। অভিযোগটি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) তদন্ত করছে।

এসব দিক বিবেচনায় নিয়ে বিএনজি গ্লোবালের সঙ্গে চুক্তিটি বাতিলের পক্ষে মতামত দিয়েছে রাজউক ও গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়।