এক দুপুর গড়িয়ে আরেক দুপুর, ২২ ঘণ্টা পরও তেল পেলেন না ৬৩ বছরের শঙ্কর

২২ ঘণ্টা ধরে জ্বালানি তেলের জন্য অপেক্ষা করছেন গাড়িচালক শঙ্কর চন্দ্র দাস। আজ শুক্রবার দুপুর ১২টার দিকে আসাদ গেটের মেসার্স তালুকদার ফিলিং স্টেশনের সামনেছবি: নোমান ছিদ্দিক

দুপুর গড়িয়ে বিকেল। বিকেল পেরিয়ে সন্ধ্যা, রাত, সকাল। এল আরেক দুপুর। এই ২২ ঘণ্টা রাজধানীর আসাদ গেটের মেসার্স তালুকদার ফিলিং স্টেশনের সামনে তেলের অপেক্ষায় রয়েছেন ৬৩ বছরের শঙ্কর চন্দ্র দাস। তিনি গাড়িচালকের চাকরি করেন।

আজ শুক্রবার দুপুর ১২টার দিকে রাজধানীর আসাদগেটে শঙ্কর চন্দ্র দাসের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। গতকাল বৃহস্পতিবার বেলা ২টার দিকে তিনি তেলের জন্য লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন বলে জানান। তখন তাঁর সামনে অন্তত ৫০০ গাড়ি ছিল। লাইনে দাঁড়িয়ে সামনে এগোতে এগোতে যখন পাম্পের কাছাকাছি যান, তখন রাত সাড়ে ৩টা বাজে। তখন ফিলিং স্টেশনের পক্ষ থেকে জানানো হয় তেল শেষ। তেল কখন আসবে, সেটি সুনির্দিষ্টভাবে জানাতে পারেননি ফিলিং স্টেশনের কর্মচারীরা।

আসাদ গেটের ফিলিং স্টেশন থেকে তেল নেওয়ার জন্য অপেক্ষায় থাকা মোটরসাইকেলের সারি গিয়েছে মোহাম্মদপুরের ইকবাল রোডে। আজ শুক্রবার দুপুরের চিত্র
ছবি: নোমান ছিদ্দিক

ততক্ষণে তেলের জন্য ফিলিং স্টেশনের খুব কাছাকাছি চলে এসেছেন শঙ্কর। তাই পাম্পে তেল আসার অপেক্ষা করতে থাকেন। বাসায় না ফিরে গাড়িতেই রাত কাটান। তাঁর আশা, তেল এলে তিনি তিন থেকে চারজনের পরই পাবেন।

শঙ্কর চন্দ্র দাস বলেন, এ পর্যন্ত লাইনে থাকতে থাকতে খাবারের পেছনে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা খরচ হয়েছে। নিয়োগকর্তা কয়েকবার ফোন করেছেন। আক্ষেপ নিয়ে বলেন, ‘হেরা তো (মালিক) বড়লোক মানুষ। যে যার মতো চইলা যায়গা গাড়িত থেকে নেমে। গরিবানা চাকরি করি। তেল নিতেই হবে।’

মের্সাস তালুকদার ফিলিং স্টেশনের ক্যাশিয়ার মো. এরশাদ জানান, তাঁদের পাম্পে প্রতিদিন সাড়ে ১৩ হাজার লিটার অকটেন আসে। গতকালও বিকেল ৫টার সময় তেল এসেছিল। সে তেল রাত সাড়ে ৩টা পর্যন্ত বিক্রির পর শেষ হয়ে গেছে। আজকেও বিকেল ৫টার পর তেল আসবে।

তালুকদার ফিলিং স্টেশনে আরও বেশ কয়েকজন চালকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, তাঁরা গতকাল বিকেলে তেলের জন্য গাড়ি নিয়ে লাইনে দাঁড়িয়েছেন। আজ দুপুর পর্যন্ত অপেক্ষার পরেও তেল নিতে পারেননি। এই পাম্পে দুপুর ১২টার দিকে ২৬৫টি প্রাইভেট কার ও ১০৫টি মোটরসাইকেল দেখা গেছে। এসব যানবাহনের চালকেরা তেলের জন্য অপেক্ষায় আছেন। প্রাইভেট কারের লাইন আসাদগেট থেকে ঘুরে সংসদ ভবনের পেছন হয়ে বিজয় সরণি পর্যন্ত পৌঁছে গেছে।

বেলা একটার দিকে আসাদগেটের সোনার বাংলা ফিলিং স্টেশনে প্রাইভেট কারের চেয়ে মোটরসাইকেলের সারি বেশি দীর্ঘ দেখা গেছে। এই পাম্পে তেলের অপেক্ষায় ৪১০টি মোটরসাইকেল লাইনে দাঁড়ানো দেখা গেছে। আসাদগেট হয়ে মোহাম্মদপুর সড়ক হয়ে ইকবাল রোড়ের মাঝামাঝি চলে গেছে মোটরসাইকেলের সারি।

প্রাইভেট কার ও মোটরসাইকেলের লাইন। আজ শুক্রবার দুপুর ১২টার দিকে আসাদ গেটের মেসার্স তালুকদার ফিলিং স্টেশনের সামনে
ছবি: নোমান ছিদ্দিক

এই ফিলিং স্টেশনে ৪০৫ নম্বর সিরিয়ালে তেলের জন্য দাঁড়িয়েছেন সায়েম আহমেদ। তিনি প্রথম আলোকে জানান, গতকাল রাত সাড়ে ১০টার সময় তেলের জন্য এই সোনার বাংলা ফিলিং স্টেশনের লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন। রাত দেড়টার সময় শুনতে পান পাম্পে তেল শেষ। বাধ্য হয়ে তখন মোটরসাইকেলটি নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে মোহাম্মদপুরের বেড়িবাঁধে বাসায় ফিরে যান। আজ দুপুরে আবার বাসা থেকে মোটরসাইকেলটিকে একটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার সাহায্য পাম্পের সিরিয়াল পর্যন্ত এনেছেন।

সায়েম আহমদ বলেন, ‘গতকালকেও তেলের জন্য ৩ ঘণ্টা অপেক্ষা করে গেছি এই পাম্পে। রাত দেড়টার দিকে ঘোষণা এল তেল শেষ। পরে ভেবেছি অকটেন না পেলে পেট্রল নিব। বলেছে, অকটেনও নাই। আজকে আবার আসলাম।’

তীব্র রোদের কারণে সড়কের একপাশে মোটরবাইক রেখে ফুটপাতে, বিভিন্ন স্থানে অপেক্ষা করতে দেখা যায় চালকদের। চোখে-মুখে ক্লান্তি, হতাশা নিয়ে তেলের অপেক্ষায় আছেন তাঁরা।