‘দস্যু বনহুর’খ্যাত রোমেনা আফাজের সাহিত্যকর্মকে গবেষণার আওতায় আনার আহ্বান

সেমিনারে বক্তব্য দিচ্ছেন কথাসাহিত্যিক তানজিনা হোসেন। রাজধানীর বাংলামোটরে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র মিলনায়তনে, ১৮ জুলাইছবি: মানসুরা হোসাইন

‘দস্যু বনহুরখ্যাত রোমেনা আফাজ’–এভাবেই গড়ে উঠেছিল পরিচিতি। ১৯৬৫ সালে প্রথম প্রকাশ হয় ‘দস্যু বনহুর’ সিরিজের প্রথম খণ্ড। ১৯৮৫ সালে সিরিজের ১৩৮তম খণ্ড দিয়ে লেখক জীবনের ইতি টানেন রোমেনা আফাজ। বাংলাদেশের মানুষকে বইমুখী করতে এই নারী সাহিত্যিকের ভূমিকা থাকলেও তাঁর যথাযথ মূল্যায়ন হয়নি বলে অনেকে মনে করেন।

রোমেনা আফাজের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এক সেমিনারে সে কথাই তুলে ধরলেন প্রাবন্ধিক ও গবেষক মোহাম্মদ আজম। তিনি বলেন, বিশ্ব সাহিত্যের জনপ্রিয় এবং কাল্পনিক চরিত্র শার্লক হোমসকে নিয়ে বিশ্বব্যাপী পিএইচডি হচ্ছে। রোমেনা আফাজ লেখায় ভাষার ব্যবহারে আনাড়ি বা অসচেতন ছিলেন। লেখার ফর্মের ক্ষেত্রে দুর্বলতা ছিল। কিন্তু এসব সমালোচনার পরও তিনি জনপ্রিয় লেখক ছিলেন। পাঠাভ্যাস গড়ে তুলেছিলেন। তাই নিজেদের প্রয়োজনেই রোমেনা আফাজের লেখা নিয়ে গবেষণা করা প্রয়োজন।

আজ শনিবার রাজধানীর বাংলামোটরে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র মিলনায়তনে এই আয়োজন করেছিল ইসলামী পাঠাগার ও সমাজকল্যাণ পরিষদ। এতে সভাপতিত্ব করেন পরিষদের সভাপতি আনিছুল হক এবং সঞ্চালনা করেন সাধারণ সম্পাদক আহাদুল ইসলাম।

সেমিনারে জানানো হয়েছে, রোমেনা আফাজের সিরিজ, উপন্যাস, ছোটগল্প, কাব্যগ্রন্থসহ বিভিন্ন ধরনের ২৫০টি বই প্রকাশ হয়েছে। এর মধ্যে ১৩৮টি দস্যু বনহুর সিরিজ এবং ১২টি দস্যুরাণী সিরিজ। রোমেনা আফাজের ছয়টি বই থেকে ‘কাগজের নৌকা’ ‘মোমের আলো’, ‘মায়ার সংসার, ‘মধুমিতা’, ‘মাটির মানুষ’ ও ‘দস্যু বনহুর’ নামে ছয়টি চলচ্চিত্র নির্মাণ হয়েছে।

বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক মোহাম্মদ আজম বলেন, ষাট, সত্তর ও আশির দশকে রোমেনা আফাজ যে পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলেছিলেন, তার ধারাবাহিকতা রক্ষা হয়নি। তবে তাঁকে এবং তাঁর সৃষ্টিকে গবেষণার আওতায় আনার সুযোগ আছে এখনো। এ ছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক এবং রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় রোমেনা আফাজের নির্বাচিত সংকলন বের করা প্রয়োজন।

সেমিনারে প্রাবন্ধিক ও কথাসাহিত্যিক আকিমুন রহমানের ‘জন্ম শতবর্ষে, রোমেনা আফাজকে, এমত প্রণতি’ শিরোনামের প্রবন্ধটি উপস্থাপন করার কথা ছিল। তবে অসুস্থতার জন্য আকিমুন রহমান সেমিনারে উপস্থিত ছিলেন না। তাঁর প্রবন্ধ থেকে পড়ে শোনান মোস্তফা মুশফিক। এ ছাড়া লেখক মফিদুল হকের ‘রোমেনা আফাজ: উপেক্ষার একশত বছর’ শিরোনামের প্রবন্ধটি পড়ে শোনান আশরাফুল আলম। রোমেনা আফাজের দস্যু বনহুর সিরিজ থেকে পড়ে শোনান রেবেকা সুলতানা। সেমিনারে রোমেনা আফাজের জীবনী নিয়ে একটি তথ্যচিত্র দেখানো হয়।

রোমেনা খাতুন খুকীর বিয়ের পর নাম হয় রোমেনা আফাজ। ১৯২৬ সালের ২৭ ডিসেম্বর বগুড়া জেলার শেরপুরে জন্ম। ৯ বছর বয়সে প্রথম লেখা ‘বাংলার চাষী’ নামক ছড়া প্রকাশ হয় কলকাতার ‘মোহাম্মদী’ পত্রিকায়। মাত্র ১৩ বছর বয়সে তাঁর বিয়ে হয় বগুড়া জেলার সদর থানার ফুলকোট গ্রামের চিকিৎসক মো. আফাজ উল্লাহ সরকারের সঙ্গে। সাত ছেলে ও দুই মেয়ের জননী ছিলেন রোমেনা আফাজ। ১৯৫৯ সালে তাঁর প্রথম প্রকাশিত বই হচ্ছে ‘রক্তে আঁকা ম্যাপ’। ২০০৩ সালের ১২ জুন (৭৭ বছর) তিনি মারা যান। তাঁর বাবা কাজেম উদ্দীন আহম্মদ ছিলেন পুলিশ পরিদর্শক (দারোগা)।

সেমিনারে আলোচনায় কথাসাহিত্যিক তানজিনা হোসেন বলেন, ৬০ থেকে ৮০–এর দশকে তাঁর বই পড়েননি এমন মানুষ পাওয়া দুষ্কর। পাঠাভ্যাস গড়ে তোলার ক্ষেত্রে রোমেনা আফাজ গুরুত্বপূর্ণ। তবে গোয়েন্দা গল্প ও রহস্য কাহিনি রচয়িতা রোমেনা আফাজ মূলধারার লেখক হিসেবে স্বীকৃতি পাননি। এমন ঝুঁকি আছে তা জেনেই তিনি লিখেছেন।

সেমিনারে উপস্থিত ছিলেন বগুড়ায় বসবাসকারী রোমেনা আফাজের ছেলে মন্তেজুর রহমান। তিনি—‘জীবনকালে যে পেলোনা মালা- চিনিলো না যারে করি অবহেলা। দিলো না যার প্রতিভার দাম- মৃত্যুর পর কি হবে তার এ সুনাম। কি হবে আর তাঁহারে স্বরি- কি হবে স্মৃতিসৌধ গড়ি। প্রদীপ যদি নিভে যায়- কি হবে তাতে তৈল ভরি হায়’—তাঁর মায়ের লেখাটি পড়ে শোনান।

মন্তেজুর রহমান আক্ষেপ করে বলেন, ‘মা জীবিত থাকা অবস্থায় রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পাননি। মারা গেলেন ২০০৩ সালে। আর ২০১০ সালে মরণোত্তর স্বাধীনতা পুরস্কার পান। এ পদকটি দেখে যেতে পারলে মা অনেক খুশি হতেন।’ রাষ্ট্রীয় এ পদকের বাইরে ২৭টি পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন রোমেনা আফাজ। যুক্ত ছিলেন ৩৫টি সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডে।

মন্তেজুর রহমান জানান, বগুড়ায় রোমেনা আফাজ স্মৃতি পরিষদের মাধ্যমে রোমেনা আফাজ স্মৃতিঘর পরিচালিত হচ্ছে। এতে রোমেনা আফাজের পাণ্ডুলিপি, প্রকাশিত বই, তাঁর ব্যবহারের জিনিসপত্র, আলোকচিত্র, ভক্তদের লেখা চিঠি সবই সংরক্ষণ করা হচ্ছে। এই স্মৃতিঘরটি সবার জন্য উন্মুক্ত।