ঈদুল আজহার ছুটিতে ঢাকায় আটটি অস্বাভাবিক মৃত্যু
ঈদুল আজহার ছুটি চলার সময়ে ঢাকা মহানগরে আটজনের অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে। ২৫ মে থেকে ২৯ মে পর্যন্ত অর্থাৎ পাঁচ দিনে এসব মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। এই সময়ের মধ্যে দারুসসালাম থানার হরিরামপুরে এক দম্পতির, কামরাঙ্গীরচর ও ভাটারায় দুই যুবকের লাশ উদ্ধার করা হয়। এ ছাড়া নগরীর বসুন্ধরা সিটি শপিং কমপ্লেক্স থেকে পড়ে একজন, ডেমরায় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে একজন ও আজিমপুরে পানিতে ডুবে একজন মারা গেছেন।
এদিকে তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলের প্রধান সড়ক থেকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করা এক যুবক শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। এসব ঘটনায় সংশ্লিষ্ট থানাগুলোতে আটটি অপমৃত্যুর মামলা হয়েছে।
দারুসসালাম থানা সূত্র জানায়, ঈদুল আজহার আগের দিন গত বুধবার দুপুরে জাতীয় জরুরি সেবা ‘৯৯৯’ নম্বরে খবর পেয়ে দারুসসালাম থানার পুলিশ হরিরামপুর এলাকার টিনের ছাপড়া ঘরের মেঝে থেকে নূর মোহাম্মদ ওরফে হৃদয় (২৫) এবং তাঁর স্ত্রী ঝুমা আক্তারের (১৮) লাশ উদ্ধার করে। পরে মরদেহগুলো ময়নাতদন্তের জন্য শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠানো হয়। নূর মোহাম্মদের সঙ্গে স্ত্রী ঝুমা আক্তারের দু-তিন বছর আগে বিয়ে হয়েছিল। ঝুমা আক্তার অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন।
শনিবার সন্ধ্যায় যোগাযোগ করা হলে দারুসসালাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. দুলাল হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ঝুমার মাসহ স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানতে পেরেছেন, বাসার ভেতর থেকে ছিটকিনি লাগানো ছিল। প্রতিবেশীদের সন্দেহ হলে তাঁরা ঝুমার স্বজনদের খবর দেন। পরে স্বজনেরা দরজা ভেঙে ঘরের বাঁশের আড়ার সঙ্গে গলায় দড়ি প্যাঁচানো অবস্থায় থাকা নূর মোহাম্মদ ও ঝুমার মরদেহ নামিয়ে আনেন।
পুলিশ কর্মকর্তা দুলাল হোসেন বলেন, প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে ঘটনাটি আত্মহত্যা হতে পারে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়া গেলে মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে।
দুটি ঝুলন্ত লাশ
গত শুক্রবার রাতে পুলিশ রাজধানীর ভাটারার ছোলমাইদ এলাকার একটি বাসা থেকে মনির গাজী (২৪) নামের এক যুবকের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করে। তিনি একটি প্রতিষ্ঠানের হয়ে গ্রাহকদের বাসাবাড়িতে খাবার পৌঁছানোর কাজ করতেন।
শনিবার ভাটারা থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. জাহিদুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯- এ খবর পেয়ে পুলিশ ভাটারার ছোলমাইদ এলাকার একটি বাড়ির তৃতীয় তলার একটি কক্ষের দরজা ভেঙে মনিরের মরদেহ উদ্ধার করে। তাঁর মরদেহটি লোহার অ্যাঙ্গেলের সঙ্গে গলায় দড়ি প্যাঁচানো অবস্থায় ছিল। পরে মরদেহটি ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠানো হয়।
পুলিশ কর্মকর্তা জাহিদুল বলেন, বাড়ির মালিক মনির গাজীর বাসায় কোরবানির মাংস দিতে গেলে ভেতর থেকে দরজা লাগানো দেখতে পান। তিনি কোনো সাড়াশব্দ পাননি এবং ওই কক্ষ থেকে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছিল। ধারণা করা হচ্ছে, মনির গাজী গলায় ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। তাঁর বাড়ি বরগুনার আমতলী হরিদ্রা বাড়িয়ায়। তাঁর বাবা মৃত আনোয়ার গাজী।
শুক্রবার রাতে জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ খবর পেয়ে পুলিশ রাজধানীর কামরাঙ্গীরচরের আশরাফাবাদ এলাকার একটি বাসার দরজা ভেঙে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে গলায় ফিতা প্যাঁচানো অবস্থায় রিকশাচালক মো. এনাজুল ওরফে সুমনের (২৫) ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করে। পরে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজের মর্গে পাঠায় পুলিশ। তাঁর বাড়ি নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ থানার হিংসা বাগবাড়িতে।
পুকুরে ডুবে মৃত্যু
গত সোমবার বিকেলে রাজধানীর আজিমপুর সরকারি কলোনির একটি পুকুরে ডুবে মুহতাসিম হক জাহিন (১৫) নামের এক কিশোরের মৃত্যু হয়। সে বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ স্কুল অ্যান্ড কলেজের অষ্টম শ্রেণির ছাত্র ছিল।
হাসপাতালে নিয়ে আসা উদ্ধারকারী আবদুল কুদ্দুস জানান, সোমবার বেলা পৌনে ৩টার দিকে খবর পান বন্ধুদের সঙ্গে পুকুরে নামার পর এক কিশোর তলিয়ে গেছে। পরে তিনি পুকুরে নেমে কয়েক মিনিট খোঁজাখুঁজির পর জাহিনকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করেন। এরপর তাকে বিকেল পৌনে ৪টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
জাহিনের বন্ধু মাহির আবরারের ভাষ্য, দুপুরে জাহিন তাকে বাসা থেকে ডেকে নিয়ে যায়। পরে তারা পুকুরপাড়ে যায়। জাহিন পানিতে নামতে চাইলে সে বারবার নিষেধ করে। কারণ জাহিন সাঁতার জানত না। এরপরও জাহিন পানিতে নামে। একপর্যায়ে জাহিন পানিতে তলিয়ে যেতে থাকলে তাকে টেনে তোলার চেষ্টা করে। এ সময় জাহিন তাকে ধরে ফেললে দুজনই পানিতে ডুবে যায়। তবে সে সাঁতরে উঠতে পারলেও জাহিন আর উঠতে পারেনি। পরে স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হয়।
খবর পেয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ছুটে আসেন জাহিনের বাবা সফিউল হক। তিনি বলেন, দুপুরে ছেলে গরু দেখার কথা বলে বাসা থেকে বের হয়েছিল। পরে খবর পান, সে পানিতে ডুবে গেছে। হাসপাতালে এসে ছেলেকে মৃত অবস্থায় দেখতে পান।
বসুন্ধরা সিটি থেকে পড়ে মৃত্যু
গত বুধবার বিকেলে নগরীর বসুন্ধরা সিটি শপিং কমপ্লেক্সের সাততলা থেকে নিচে পড়ে মো. সৌরভ (২৭) নামের একজন শিক্ষার্থী মারা গেছেন। তিনি রাজধানীর উত্তরার একটি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করতেন।
তেজগাঁও থানার ওসি ক্যশৈনু মারমা প্রথম আলোকে বলেন, বুধবার বিকেল পৌনে ৫টার দিকে বসুন্ধরা সিটি শপিং কমপ্লেক্সের ভেতরে সাততলা থেকে সৌরভ একেবারে নিচে পড়ে যান। ঢাকা মেডিকেলে নেওয়ার পর চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। সিসিটিভি ফুটেজ পর্যবেক্ষণ করে প্রাথমিকভাবে এটিকে আত্মহত্যা বলে মনে করা হচ্ছে।
পুলিশের এই কর্মকর্তা আরও বলেন, পড়ে যাওয়ার পর সৌরভের ব্যবহৃত মুঠোফোনটি ভেঙে যায়। পরে তাঁর সিমটি অন্য একটি মুঠোফোনে ভরে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়।
সৌরভকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলেন বসুন্ধরা সিটি শপিং কমপ্লেক্সের দুজন নিরাপত্তাকর্মী। তাঁদের একজন তন্ময় দাস বলেন, শপিং কমপ্লেক্সের ভেতরে মাঝখানের অংশে ওপর থেকে পড়ে গিয়েছিলেন সৌরভ। তাঁর বাড়ি বগুড়া সদর উপজেলায়।
বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মৃত্যু
গত মঙ্গলবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে জুরাইনে শ্যালকের বাসায় কোরবানির পশু পৌঁছে দিতে গিয়েছিলেন বই ব্যবসায়ী আনোয়ার হোসেন। সেখান থেকে হেঁটে ফেরার পথে জুরাইনের ঋষিপাড়া সড়কের পাশে জমে থাকা বৃষ্টির পানিতে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হন তিনি। সেখানে পাশের একটি বৈদ্যুতিক খুঁটি থেকে তার ছিঁড়ে পানিতে পড়ে ছিল।
অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করে আনোয়ারকে স্থানীয় একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়। অবস্থার অবনতি হলে বেলা পৌনে ২টার দিকে তাঁকে ঢাকা মেডিকেলের জরুরি বিভাগে নেওয়ার পর চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
আনোয়ার হোসেন সপরিবার যাত্রাবাড়ীতে বইয়ের ব্যবসা করতেন এবং একই এলাকার শহীদ ফারুক সরণির একটি বাসায় পরিবার নিয়ে থাকতেন।
চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু
তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানার ওসি মুহম্মদ মাহবুবুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ঈদুল আজহার দিন গত বৃহস্পতিবার দুপুরে তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানার কাছে এক যুবক অচেতন অবস্থায় পড়ে ছিলেন। তাঁর বয়স ৩৫ বছর হতে পরে। সংজ্ঞাহীন অবস্থায় তাঁকে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শুক্রবার বিকেলে মারা যান তিনি। মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের মর্গে নেওয়া হয়।