অভিবাসন ব্যয় কমাতে পারেন বৈধ মধ্যস্বত্বভোগী

বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে অভিবাসন ও সোনার মানুষ সম্মিলনের আয়োজন করা হয়। ঢাকা, ২৮ এপ্রিল। ছবি: সাজিদ হোসেন
বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে অভিবাসন ও সোনার মানুষ সম্মিলনের আয়োজন করা হয়। ঢাকা, ২৮ এপ্রিল। ছবি: সাজিদ হোসেন

ব্যক্তি খাতেই দেশ থেকে বিভিন্ন কাজে অভিবাসনে যান অধিকাংশ কর্মী। বাকিরা যান বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। তবে অভিবাসনের পুরো প্রক্রিয়ায় ধাপে ধাপে কাজ করেন মধ্যস্বত্বভোগীরা (দালাল)। মধ্যস্বত্বভোগীর সহায়তা ছাড়া এগোতে পারেন না বিদেশ গমনেচ্ছু ব্যক্তিরা। এতে করে বেড়ে যায় অভিবাসন ব্যয়। তাই মধ্যস্বত্বভোগীদের আইনি কাঠামোর মধ্যে এনে বৈধ করা গেলে অভিবাসন ব্যয় কমতে পারে।

রোববার রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে দিনভর অনুষ্ঠিত অভিবাসন ও সোনার মানুষ সম্মিলন ২০১৯-এ এসব কথা বলেন বক্তারা। রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিট (রামরু) আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে সরকারি-বেসরকারি বিশিষ্ট ব্যক্তিদের পাশাপাশি সফল প্রবাসী ও তাঁদের পরিবারের সদস্যরা অংশ নেন। ২০২০ থেকে ২০২৯ পর্যন্ত সময়কে অভিবাসন দশক ঘোষণার দাবি ওঠে অনুষ্ঠানে।

প্রবাসীদের অধিকার সুরক্ষায় এই সম্মিলনের প্রস্তাব লিখিত আকারে তাঁর কাছে দেওয়া হলে তিনি প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরবেন বলে জানান পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান। শেষ অধিবেশনে তিনি বলেন, সরকারের অব্যাহত উন্নয়নের প্রতিটি খাতে অভিবাসীদের অবদান আছে। মধ্যপ্রাচ্যে বিশেষ করে নারী অভিবাসীরা যে বঞ্চনার শিকার হচ্ছেন, তা গ্রহণযোগ্য নয়। নারী অভিবাসন নিরাপদ করতে সরকার গভীরভাবে চিন্তা করছে।

জাতীয় অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান বলেন, অভিবাসন খাতের বিষয়গুলোকে একটা পদ্ধতির মধ্যে আনা দরকার, যাতে সবার জবাবদিহি নিশ্চিত হয়।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ইসরাফিল আলম বলেন, সব ধরনের প্রতিবন্ধকতা দূর করতে হবে, কিন্তু কোনোভাবেই নারীর অভিবাসন বন্ধ করা যাবে না। রেমিট্যান্সের জন্য এটা জরুরি।

ব্রিটিশ কাউন্সিলের প্রকাশ প্রকল্পের টিম লিডার জেরি ফক্স বলেন, টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (এসডিজি) অর্জন করতে হলে অভিবাসনপ্রক্রিয়া যথাযথ প্রক্রিয়ার মধ্যে এনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

এর আগে সকালের অধিবেশনে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, ফিরে আসা দক্ষ অভিবাসীদের কাজে লাগাতে একটি পরিকল্পনা নেওয়া যেতে পারে। এ ছাড়া নতুন নতুন শ্রমবাজার সন্ধানে গুরুত্ব দিতে হবে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, যাঁরা বিদেশে যান তাঁদের শতভাগকে দালালির ওপর নির্ভর করে যেতে হয়। তাই অন্য দেশের নাগরিকদের তুলনায় বাংলাদেশিদের চার থেকে পাঁচগুণ অর্থ খরচ করতে হয় বিদেশে যেতে। এ ছাড়া ব্যক্তি খাতে বিদেশ যাওয়ার কারণে বছরে ১৭ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়ে যায় বলে উল্লেখ করেন তিনি।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানিত ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, যথাযথ অভিবাসন প্রক্রিয়া নিশ্চিত হলে এসডিজি অর্জনে ১৭টি অভীষ্টের মধ্যে ১১টি অভীষ্ট অর্জন সহজ হবে। অভিবাসন ব্যয় ও রেমিট্যান্স ব্যয় কমাতে গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) মহাপরিচালক সেলিম রেজা বলেন, প্রতিটি জেলায় কার্যক্রম ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এখন আর বিদেশ যাওয়ার জন্য ঢাকায় আসতে হয় না। প্রতিদিন ১০ হাজার লোকের ঢাকায় আসা কমিয়ে ভোগান্তি দূর করার পাশাপাশি বছরে ৫৩৬ কোটি টাকার যাতায়াত ব্যয় কমানো হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের যুগ্ম পরিচালক কামরুল কবির ভূইয়া বলেন, রেমিট্যান্সের গ্লোবাল ব্যয় ৭ শতাংশ কিন্তু বাংলাদেশে এখন এটি ৩.৬৯ শতাংশ। এটি আরও কমাতে চেষ্টা করা হচ্ছে।

অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন রামরুর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান তাসনিম সিদ্দিকী। বিভিন্ন অধিবেশনে আরও অংশ নেন জলবায়ু বিশেষজ্ঞ আতিক রহমান, কবি আশরাফ সিদ্দিকী, রামরুর পরিচালক সি আর আবরার প্রমুখ।

সোনার মানুষ হিসেবে সফল দুই অভিবাসী টাঙ্গাইলের মো. জাফর ইকবাল ও কক্সবাজারের সুরত আলমকে সম্মাননা দেওয়া হয় অনুষ্ঠানে। তাঁরা দুজন দেশে ফিরে কৃষি খাতের উদ্যোক্তা হিসেবে অনেক মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছেন। এ ছাড়া সেবা খাতে বিভিন্ন জেলায় কর্মরত সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে নয়জন ও প্রবাসী পরিবারে বেড়ে ওঠা পাঁচজন শিশুকে শিক্ষায় ভালো ফল করার জন্য পুরস্কৃত করা হয়। অনুষ্ঠানে নৃত্য পরিবেশন করে নৃত্যশিল্পী তামান্না রহমানের কয়েকটি দল।