অলিগলিতে নারী হোস্টেল, নিয়মনীতির বালাই নেই
রাজধানীর অলিগলিতে গড়ে উঠেছে মহিলা হোস্টেল। ব্যক্তিমালিকানাধীন এসব হোস্টেল পরিচালিত হচ্ছে কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে। ছাত্রী ও কর্মজীবী নারীরা টাকা খরচ করে হোস্টেলে থাকলেও তাঁদের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত থাকতে হয় সারাক্ষণ। হোস্টেল মালিকও এ ধরনের বিষয়ে উদাসীন।
‘নিবেদিকা ছাত্রী হোস্টেল’-এর একজন কর্মী প্রথম আলোকে বললেন, রাজধানীতে নিবেদিকা হোস্টেলেরই ৫০টি শাখা আছে। এর মালিক মুস্তাফিজুর রহমানের মোহনা, আপনঘরসহ বিভিন্ন নামেও ছাত্রী হোস্টেল আছে।
গত সোমবার রাতে মোহাম্মদপুরের জাকির হোসেন রোডে সাতটি বাড়ি নিয়ে গড়ে তোলা মুস্তাফিজুর রহমানের ‘মোহনা ভিআইপি ছাত্রী হোস্টেলে’ বখাটেরা হামলা চালায়। প্রথম আলোয় প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতিবেদকের সামনেই হোস্টেলটির দায়িত্বে থাকা তত্ত্বাবধায়ক রাবেয়া সুলতানা এক ছাত্রীকে বলেন, ‘হামলা তো হবে, তোমরা শার্ট-প্যান্ট পরো কেন?’ অর্থাৎ সব দোষ মেয়েদের।
আরেকটি হোস্টেলের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মী বলেন, ‘বুঝেনই তো, মেয়েরা এক জায়গায় থাকলে হইচই করে। মেয়েরা থাকলে এলাকার ছেলেপুলে একটা কিছু করবেই।’
পশ্চিম তেজতুরী বাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় দেখা গেল, একই ভবনে ছাত্র ও ছাত্রীদের হোস্টেল। ‘মাদার হাউস’ নামের হোস্টেলের ব্যবস্থাপক মোস্তফা জানালেন, ভবনের দোতলা ও চারতলায় ছাত্রী এবং ছাদে দুটি ঘরে ছাত্রদের ভাড়া দেওয়া হয়েছে। এখানকার ভাড়া পাঁচ থেকে ছয় হাজার টাকা।
শিক্ষায় মেয়ে ও নারীদের অংশগ্রহণ বেড়েছে। শহরে ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির জন্য কোচিং, ভর্তির পর আবাসন এবং চাকরি পাওয়ার পর নারীরা বাধ্য হচ্ছেন কোনো না কোনো হোস্টেলে আশ্রয় নিতে। গ্রাম থেকে প্রথম রাজধানীতে আসা একটি মেয়ের জন্য হোস্টেলে থিতু হতেই লেগে যায় কয়েক মাস। তারপর নানা ঝামেলা তো আছেই। ছাত্রীদের হোস্টেলে সিট দিতে চাইলেও বেশির ভাগ হোস্টেল কর্মজীবী নারীদের রাখতে চায় না। কারণ, তাঁদের অনেকেই অফিসের কাজ শেষে রাতে ফেরেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ রাজধানীর বেশির ভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই ছাত্রীদের আবাসনের যে ব্যবস্থা, তা খুবই অপ্রতুল। ফলে বাধ্য হয়েই বিশালসংখ্যক ছাত্রীকে হোস্টেল খুঁজতে হচ্ছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা কোচিংয়ের কাছে হোস্টেল পেতে হলে গুনতে হয় দ্বিগুণ ভাড়া।
এ বিষয়ে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব তারিক-উল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা মন্ত্রণালয় থেকে কর্মজীবী নারী ও পোশাকশিল্পের নারীদের জন্য আবাসনের ব্যবস্থা করছি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রীদের আবাসনের বিষয়টি দেখবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।’ ব্যক্তিমালিকানাধীন ছাত্রী হোস্টেলের জন্য নীতিমালা করা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বেসরকারি খাতে সরকার কোনো হস্তক্ষেপ করতে চায় না।
মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের মাধ্যমে সারা দেশে মোট সাতটি (ঢাকায় তিনটি) কর্মজীবী মহিলা হোস্টেল পরিচালিত হচ্ছে। সব কটিতে মোট সিট সংখ্যা (অতিথি সিটসহ) মাত্র এক হাজার ৪০৮। ঢাকার বাইরে পোশাকশিল্পের নারী শ্রমিকদের জন্য আবাসনের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এ ছাড়া জাতীয় মহিলা সংস্থা রাজধানীতে কর্মজীবী নারীদের জন্য একটি হোস্টেল পরিচালনা করছে।
একটি হোস্টেলের কিছু চিত্র: রাজধানীর লালমাটিয়ায় একটি মহিলা হোস্টেলের এক ছাত্রী বলেন, ‘হোস্টেল থেকে বের হওয়া এবং বাইরে থেকে ফিরে একটি টেবিলে রাখা খাতায় সই করতে হয়। টেবিলটি বেশ নিচু। তাই সামনের দিকে খানিকটা ঝুঁকে সই করতে হয়। সমস্যা হলো, সেই টেবিলের সামনে মাঝবয়সী বাড়িওয়ালা বসে মেয়েদের দিকে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে থাকেন। এতে সব মেয়েরই অস্বস্তি হয়। সবাই বিরক্ত হই। কিন্তু কিছু বলতে পারি না। যদি হোস্টেলের সিট ছেড়ে দিতে বলেন, তখন আবার হোস্টেল খুঁজে বের করতে হবে। আর কথাটি বলতেও লজ্জা লাগে।’ ছাত্রীদের যাতে অসুবিধা না হয়, সে জন্য হোস্টেলের নাম এবং ছাত্রীদের পরিচয় প্রকাশ করা হলো না।
লালমাটিয়ার এ হোস্টেলটি ছয়তলা। ভবনের দুটি ফ্ল্যাটে শুধু বাড়িওয়ালা থাকেন। অন্য সব ফ্ল্যাট বিভিন্ন কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী এবং কর্মজীবী নারীদের কাছে ভাড়া দেওয়া হয়েছে। ভবনের সামনেই ময়লা-আবর্জনা ফেলা হয়। একতলার বাসিন্দাদের সমস্যা সবচেয়ে বেশি। ভেতরটা দিনের বেলাতেও অন্ধকার, স্যাঁতসেঁতে। ভাড়া কিন্তু কম নয়।
এ হোস্টেলের আরেকজন বাসিন্দা বলেন, ‘এক রুমে থাকতে হয় পাঁচজনকে। কোনোরকমে পাঁচটি চৌকি রাখা গেছে। বইপত্র রাখার জন্য কাঠের একটি টেবিল রাখতেও রীতিমতো হিমশিম খেতে হয়। তিন বেলা খাবারসহ একেকজনকে দিতে হয় চার হাজার টাকা। তার মানে, বাড়িওয়ালা একটি রুমের ভাড়া ও খাওয়া বাবদ পাচ্ছেন ২০ হাজার টাকা। মাসে এক দিনও যদি কেউ হোস্টেলে না খায়, তবু চার হাজার টাকাই দিতে হবে। ব্যালকনিতে হার্ডবোর্ড দিয়ে ছোট ছোট রুম বানিয়ে তা-ও ভাড়া দেওয়া হয়।’
তিন বেলা খাবারের তালিকা জানতে চাইলে জানা গেল, সকালে ছোট বাটিতে ভাত, আলুভাজি অথবা আলু ভর্তা। দুপুরে মাছ, মাংস অথবা ডিমের সঙ্গে যেকোনো সবজির একটি টুকরাসহ ঝোল, রাতে শুধু ভাত, সবজি আর ডাল। হোস্টেলের লোক এসে খাবার দিয়ে যায়। তবে খাবারের মান খারাপ এবং পরিমাণ কম হওয়ায় তা দিয়ে চলে না। বিস্কুট, মুড়ি খেয়ে দিন পার করতে হয়।
হোস্টেলের নীতিমালা ও ছাত্রীদের নিরাপত্তা প্রসঙ্গে এক ছাত্রী ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, ‘সব নিয়মকানুন ছাত্রীদের জন্য। মালিকদের জন্য কোনো নিয়মনীতি লাগে না। আর নিয়ম বলতে কবে ভাড়া দিতে হবে, কত দিনের মধ্যে দিতে হবে, বাইরে গেলে খাতায় লিখে যেতে হবে, এই যা। এর বাইরে আমরা মরলাম, না বাঁচলাম, তা দেখার কেউ নেই।’
গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধূরী প্রথম আলোকে বলেন, মেয়েদের বিনা মূল্যে বই বা উপবৃত্তি দেওয়াই যথেষ্ট নয়। সরকারকে তাদের আবাসন ও নিরাপত্তার ব্যবস্থাও করতে হবে। আর বেসরকারি উদ্যোক্তাদের ছাত্রী হোস্টেলের বিষয়ে উৎসাহিত করার পাশাপাশি কোনো না কোনো নিয়মনীতির আওতায় আনতে হবে।