‘ছেলে কোল থেকে ছিটকে পড়ার ভিডিওটি দেখলে এখনো গায়ের লোম খাড়া হয়ে যায়’
‘হুট করেই পেছন থেকে রিকশায় প্রচণ্ড ধাক্কা। শুধু মনে আছে ছয় মাস বয়সী ছেলে কোল থেকে প্রায় দুই হাত দূরে গিয়ে পড়ল। এরপর আর কিছু মনে নেই। ওই দিনের ঘটনা কেউ একজন ভিডিও করেছিলেন। ছোট একটি ভিডিও, কিন্তু ছেলে কোল থেকে ছিটকে পড়ার ভিডিওটি দেখলে এখনো গায়ের লোম খাড়া হয়ে যায়। শুধু ভাবি, আমি আর আমার ছেলে সেদিন কীভাবে বেঁচে ছিলাম। আমরা হয়তো বেঁচে ফিরে এসেছি, অথচ সড়ক দুর্ঘটনায় কত মানুষ যে ফিরতে পারছে না, গত দুই সপ্তাহেই কতগুলো বীভৎস ঘটনা ঘটে গেল। অপরাধীদের বিচার না হলে এ ধরনের ঘটনা ঘটতেই থাকবে।’
কথাগুলো বললেন ফকরুল হাসান (৩৭)। গত ১৯ নভেম্বর বিকেলে রিকশায় ফকরুল হাসানের কোলেই ছিল ছেলে ইব্রাহীম মোহাম্মদ বিন হাসান। শুক্রবার ছুটির দিন, ছেলেও বাসায় কান্নাকাটি করছিল। তাই ছেলেকে নিয়ে রমনা পার্কে যাচ্ছিলেন এই বাবা। রমনা থানাধীন বেইলি রোডের ফরেন সার্ভিস একাডেমির সামনে ঘটে দুর্ঘটনা। এরপর থেকেই পাল্টে গেছে পুরো পরিবারের চিত্র। এখন ছেলের কান্না আর থামেই না। ছেলের ডান পায়ের ঊরুর হাড় ভেঙে গেছে। এই বাবার ভেঙেছে ডান হাত। দুজনই শরীরের বিভিন্ন জায়গায় ব্যথা পেয়েছেন। ছেলের মাথা ও কানের আঘাতও ছিল গুরুতর।
এই বাবা জানালেন, ঘটনার দিন যে গাড়ি তাঁদের রিকশাকে ধাক্কা দিয়েছিল, সেটি চালাচ্ছিল এক কিশোর। গাড়ির রিকশাকে ধাক্কা দেওয়া এবং সবার ছিটকে পড়ার ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়।
ফকরুল হাসান জানালেন, তাঁর ছয় মাস বয়সী ছেলের ঊরু থেকে ডান পা পর্যন্ত প্লাস্টার করা, এভাবে থাকতে হবে তিন মাস। এরপর ফিজিওথেরাপিসহ অন্যান্য চিকিৎসায় নিশ্চিত হওয়া যাবে ছেলের ভাঙা পা কতটুকু ঠিক হবে। এই বাবা আক্ষেপ করে বললেন, ‘আমার ছেলেটা পুরো সুস্থ স্বাভাবিক ছিল। সারাক্ষণ খেলাধুলা করত। আর সেই ছেলেকে এখন বিছানায় শুইয়ে রাখতে হয়, নাহয় কোলে নিতে হয়।
প্লাস্টারের জন্য কোলে নিলেও কান্নাকাটি করে। আর তার কতটুকু কষ্ট হচ্ছে, তা–ও সে বুঝিয়ে বলতে পারে না। আমার ডান হাত প্লাস্টার করা, আমি বুঝতে পারছি এর যে কী কষ্ট! আর সেই দিন তো বাবুর ওপর দিয়ে গাড়ি যেতে যেতেও যায়নি, যদি...ওহ কল্পনাও করতে পারি না।’
এই বাবার আক্ষেপ শেষ হয় না। তিনি বললেন, ‘ছেলে ছোট, তাই হয়তো পা একসময় ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু কোনো কারণ ছাড়া ছেলের পায়ের হাড় ভেঙে গেল। এর চেয়ে কত বড় বিপদ হতে পারত, তা তো ভাবতেই পারি না।’
ফকরুল হাসানের পরিবার রাজধানীর সিদ্ধেশ্বরীতে থাকে। ফকরুল হাসান নরসিংদীর মাধবদী শাখার শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের ডেপুটি ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত। তাঁর স্ত্রী রোকাইয়া আক্তার পেশায় চিকিৎসক।
ঘটনার বর্ণনা দিয়ে ফকরুল হাসান জানালেন, গাড়ির কিশোর চালক রমনা পার্কের দিকে পালিয়ে যায়। উপস্থিত জনগণের সহায়তায় রমনা মডেল থানায় খবর দিলে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে রিকশাচালককে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান চিকিৎসার জন্য। আর একজন পথচারী তাঁকে নিয়ে যান মগবাজারের সিরাজুল ইসলাম মেডিকেল কলেজে হাসপাতালে, ফখরুল হাসানের স্ত্রী এ হাসপাতালের ইন্টার্ন চিকিৎসক। অন্যদিকে ছেলেকে প্রথমে জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেন। সেখানে ভর্তির পরও অবস্থার উন্নতি না হলে গ্রিন রোডের হেলথ অ্যান্ড হোপ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে গাড়ির সামনের নম্বরপ্লেট সংযুক্ত বাম্পারসহ অন্যান্য আলামত জব্দ করে।
২০ নভেম্বর ফকরুল হাসান সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮–এর ৯৮/১০৫ ধারায় বেপরোয়াভাবে বা নিয়ন্ত্রণহীনভাবে দ্রুতগতিতে গাড়ি চালিয়ে গুরুতর রক্তাক্ত জখম করার অভিযোগে রমনা থানায় মামলা করেছেন। কিশোর চালককে চুয়াডাঙ্গা থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশি হেফাজতে নেওয়া হয়। এরপর তাকে টঙ্গীর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানো হয়। ১৫ ডিসেম্বর এই কিশোরের জামিনের বিষয়ে শুনানি হবে।
ফকরুল হাসান বললেন, ‘ছেলে ও আমার সঙ্গে যে ঘটনা ঘটেছে তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই। এমন শাস্তি, যা দেখে সবাই ভয় পায় ও সচেতন হয়। যেন ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি না হয়। কিশোর ছেলের হাতে কেন গাড়ি থাকবে? আর এলাকাবাসী বলেছেন, এই ছেলে আগেও এভাবে গাড়ি চালিয়েছে। লাইসেন্স ছাড়া ছেলে গাড়ি নিয়ে বের হয়ে গেল, মা–বাবারও শাস্তি হওয়া উচিত। তাঁরা যদি ছেলেকে সঠিক শিক্ষা দিতেন, শাসন করতেন, এতটুকু বয়সে গাড়ি চালাতে না দিতেন, তাহলে আমি আর আমার ছেলে এত কষ্ট পেতাম না। কিশোর চালকের গাড়িচাপায় পড়ে মানুষকে মরতে হতো না। তাই বাংলাদেশের আইনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে আকুল আবেদন জানাচ্ছি, দয়া করে সড়ক দুর্ঘটনার আইন আরও কঠোর হওয়া উচিত। আইনের সঠিক প্রয়োগ হওয়া উচিত। যেন দেশের নাগরিকেরা নিরাপদে সড়কে চলাচল করতে পারে।’
সেদিনের দুর্ঘটনা ঘটানো কিশোর চালক দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী। তার বাবা সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী (কিশোরের পরিচয় গোপন রাখার জন্য বাবার নাম প্রকাশ করা হয়নি)। এই বাবা মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘দুর্ঘটনা ঘটে গেছে। আমার ছেলে মানসিকভাবে অসুস্থ। ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময় থেকে চিকিৎসা চলছে। করোনার সময় পরিবারকে গ্রামে পাঠিয়ে দিই। তখন ছেলেকে গ্রামের একটি স্কুলেও ভর্তি করা হয়। পরে আবার ঢাকায় ফিরেছে। বাড়িতেই মামাদের কাছে গাড়ি চালানো শেখে। ঘটনার দিন গাড়ি নিয়ে কখন বের হয়ে যায় বুঝতে পারিনি। আর এখন তো ছেলে আছে টঙ্গীতে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে।’
দুর্ঘটনার শিকার বাবা ও ছেলে প্রসঙ্গে এই আইনজীবী বাবা বলেন, ‘আমরা সব সময় পরিবারটির খোঁজখবর রাখছি। যে কষ্ট বা আঘাত তাঁরা পেয়েছেন, তা তো দূর করতে পারব না, তবে তাঁরা যদি কিছু মনে না করেন আমরা চিকিৎসার খরচ দিতে চেয়েছি। আমি চাই, সব বাচ্চা ভালো থাকুক। আর অভিভাবকদেরও উচিত বাচ্চাদের দিকে খেয়াল রাখা।’
এই বাবা জানালেন, তাঁর দুই ছেলের মধ্যে এই ছেলে ছোট। বাবা বললেন, ‘প্রথম দিনই ছেলের জামিনের জন্য আবেদন করিনি। আমি চেয়েছিলাম ও যে ঘটনা ঘটিয়েছে, এ কারণে যাতে অনুতপ্ত হয়, তার মধ্যে যাতে আত্মোপলব্ধি আসে।’
তবে ফকরুল হাসান প্রথম আলোকে বলেন, ‘দুর্ঘটনার পর থেকেই কিশোর গাড়িচালকের আইনজীবী বাবা বিভিন্নভাবে আপস করার চেষ্টা করছেন। ছেলেও পুলিশের কাছে তার দোষ স্বীকার করেছে। ঘটনাটি ঘটেছে আমার ছেলের জীবনে। তাই কোনোভাবেই আপস করব না। আমরা বাবা–ছেলে তবু তো বেঁচে আসতে পেরেছি, কতজন তো তা–ও পারছে না। এ কয়েক দিনে আমার ও ছেলের চিকিৎসায় লাখখানেক টাকা খরচ হয়ে গেছে। এরপরও আপস নয়।’