পুলিশ হেফাজতে নির্যাতনে হত্যার প্রথম রায় ৯ সেপ্টেম্বর

গাড়িচালক ইশতিয়াক হোসেন
ছবিঃ সংগৃহীত
ব্লাস্টের আইনজীবী মোহাম্মদ আবু তৈয়ব প্রথম আলোকে বলেন, ‘গাড়িচালক ইশতিয়াক হোসেনকে থানায় নিয়ে অমানবিক নির্যাতন করে হত্যা করেন এই মামলার অভিযুক্ত তিন পুলিশ কর্মকর্তা। আমরা আশা করি, এই মামলায় এই আসামিদের সর্বোচ্চ সাজা হবে।’

ঢাকার পল্লবীতে গাড়িচালক ইশতিয়াক হোসেন (৩৩) হত্যা মামলার রায় ঘোষণার জন্য আগামী ৯ সেপ্টেম্বর দিন ঠিক করেছেন আদালত। আজ সোমবার ঢাকার মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিচারক কে এম ইমরুল কায়েস এই আদেশ দেন। নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইনে এই প্রথম কোনো মামলার রায় হচ্ছে।

আইনটি সাত বছর আগে (২০১৩ সালে) পাস হয়। এই মামলার পাঁচ আসামির মধ্যে তিনজন পুলিশ কর্মকর্তা। তাঁরা হলেন পল্লবী থানার তৎকালীন উপপরিদর্শক (এসআই) জাহিদুর রহমান, সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) রাশেদুল ইসলাম ও এএসআই কামরুজ্জামান। আরও দুই আসামি হলেন পুলিশের কথিত সোর্স সুমন ও রাসেল।

তাঁদের মধ্যে এএসআই কামরুজ্জামান এবং সোর্স রাসেল পলাতক। আর কারাগারে আছেন এসআই জাহিদুর রহমান এবং সুমন। জামিনে আছেন এএসআই রাশেদুল ইসলাম।

রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক শুনানি শেষে ঢাকার মহানগর দায়রা জজ আগামী ৯ সেপ্টেম্বর এই মামলার রায় ঘোষণার দিন ঠিক করেন। রাষ্ট্রপক্ষের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) তাপস কুমার পাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন হওয়ার পর এই প্রথম কোনো মামলার রায় ঘোষণার দিন ঠিক করলেন আদালত। রাষ্ট্রপক্ষ থেকে এই মামলায় আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি আদালতের কাছে চাওয়া হয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষ আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে। আমরা আশা করি, আদালত আসামিদের সর্বোচ্চ সাজা দেবেন। এই আইনের সর্বোচ্চ সাজা হচ্ছে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। এই মামলায় রাষ্ট্রপক্ষকে সহযোগিতা করছেন বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট)।’

ব্লাস্টের আইনজীবী মোহাম্মদ আবু তৈয়ব প্রথম আলোকে বলেন, ‘গাড়িচালক ইশতিয়াক হোসেনকে থানায় নিয়ে অমানুষিক নির্যাতন করে হত্যা করেন এই মামলার অভিযুক্ত তিন পুলিশ কর্মকর্তা। আশা করি, এই মামলায় এই আসামিদের সর্বোচ্চ সাজা হবে।’

অবশ্য আসামিপক্ষের আইনজীবী ফারুক আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, এই আইনের প্রথম কোনো মামলার রায় হতে যাচ্ছে। তাঁরা আদালতের কাছে দাবি করেছেন, রাষ্ট্রপক্ষ এই মামলা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়নি। তাঁরা আশা করেন, এই মামলায় তাঁর মক্কেল বেকসুর খালাস পাবেন।

(বাম থেকে) পুলিশ কর্মকর্তা জাহিদুর রহমান, কামরুজ্জামান, রাশেদুল ইসলাম, পুলিশের কথিত সোর্স সুমন ও রাসেল
ছবিঃ সংগৃহীত

নিহত গাড়িচালক ইশতিয়াক হোসেনের ছোট ভাই ইমতিয়াজ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ছয় বছর ধরে আদালতের বারান্দায় বারান্দায় ঘুরছিলেন ন্যায়বিচার পাওয়ার আশায়। অবশেষে তাঁর ভাইয়ের হত্যা মামলাটি রায়ের জন্য দিন ঘোষণা করা হয়েছে। তিনি আশা করেন, এই মামলার আসামিদের সর্বোচ্চ সাজা হবে। তিনি বলেন, তাঁর ভাইকে থানায় নিয়ে অমানুষিক নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করেন এই মামলার অভিযুক্ত তিন পুলিশ কর্মকর্তা জাহিদুর রহমান, কামরুজ্জামান ও রাশেদুল ইসলাম।

মামলার বিবরণে জানা যায়, ২০১৪ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় সেকশন-১১, ব্লক-বি ইরানি ক্যাম্পের বাসিন্দা মো. সাদেকের ছেলে মো. বিল্লালের গায়েহলুদের অনুষ্ঠান ছিল। অনুষ্ঠানে পুলিশের সোর্স সুমন মেয়েদের সঙ্গে অশালীন আচরণ করেন। এ সময় সেখানে থাকা ইশতিয়াক হোসেন ও তাঁর ভাই ইমতিয়াজ হোসেনকে চলে যেতে বলেন। এ নিয়ে সুমনের সঙ্গে দুই ভাইয়ের বাগ্‌বিতণ্ডা হয়। পরে সুমনের ফোন পেয়ে পুলিশ এসে দুই ভাইকে থানায় নিয়ে যায়। থানায় নিয়ে দুই ভাইকে নির্যাতন করা হয়। এ সময় ইশতিয়াকের অবস্থা খারাপ হলে তাঁকে ন্যাশনাল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অবস্থার অবনতি হলে ঢাকা মেডিকেল কলেজে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

ওই ঘটনায় ২০১৪ সালের ৭ আগস্ট ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতে নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইনে ইশতিয়াকের ভাই ইমতিয়াজ পল্লবী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জিয়াউর রহমানসহ আটজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। মামলায় আসামি করা হয় তৎকালীন পল্লবী থানার এসআই জাহিদুর রহমান, আবদুল বাতেন, রাশেদ, শোভন কুমার সাহা ও কনস্টেবল নজরুল, সোর্স সুমন ও রাসেলকে। আদালত বিচার বিভাগীয় তদন্তের আদেশ দেন। বিচার বিভাগীয় তদন্ত শেষে ২০১৫ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়। সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে প্রতিবেদনে পাঁচজনকে অভিযুক্ত এবং পাঁচজনকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়। তদন্তকালে এএসআই রাশেদুল ও কামরুজ্জামানকে নতুন করে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

ওই মামলায় ২০১৬ সালের ১৭ এপ্রিল ঢাকার মহানগর দায়রা জজ কামরুল হোসেন মোল্লা পাঁচ আসামি বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন।