ফুল তো আর মানুষের কথা শোনে না

কঠোর বিধিনিষেধের মধ্যে সাভার থেকে এসব ফুল এনে বেকায়দায় পড়েন বিক্রেতা স্বপন মিয়া।
ছবি: সাদিয়া মাহ্জাবীন ইমাম

করোনা নিয়ন্ত্রণে ‘কঠোরতম’ বিধিনিষেধে শুক্রবার ঢাকার সড়কগুলো ছিল অনেকটাই ফাঁকা। বিশেষ প্রয়োজনে চলেছে দু–একটা গাড়ি ও কিছু রিকশা। প্রয়োজন ছাড়া মানুষের বাইরে বেরোনো ঠেকাতে পুলিশ–আর্মির টহল ও নজরদারি ছিল চোখে পড়ার মতো। তবে এর মধ্যেও বেপরোয়া আচরণ করেছেন অসচ্ছল–অসহায় মানুষগুলো। তেমনই একটি ঘটনা দেখা গেল একজন ফুল বিক্রেতার।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ফুল শুকিয়ে যাওয়ার আতঙ্কে থাকা ওই ব্যক্তি বললেন, এ ছাড়া তাঁর আর কোনো ‘উপায় ছিল না’। বিধিনিষেধের জন্য ফুল তো আর না শুকিয়ে বসে থাকবে না।

শুক্রবার ভরদুপুরে থমথমে ঢাকা শহরের চন্দ্রিমা উদ্যানের কাছে ওই ফুল বিক্রেতার কর্মকাণ্ড ছিল কৌতূহল–জাগানিয়া। হঠাৎ গ্রিল টপকে রাস্তার পাশের ফুটপাতে আসেন এক ব্যক্তি। মাঝবয়সী ওই ব্যক্তির চোখেমুখে ক্ষিপ্রতা। এদিক–সেদিক তাকিয়ে ইতস্তত ভাব করছিলেন তিনি। বুঝতে চাইছিলেন, পুলিশ কত দূরে? কিছুক্ষণ আগেও নাকি কাছাকাছি দাঁড়িয়ে ছিল। বিধিনিষেধের মধ্যে এই বিচিত্র লাফঝাঁপের কারণ জানতে চাইলে খুবই বিরক্ত হয়ে ভ্রু কুঁচকে তিনি বলেন, বিষয়টি ব্যক্তিগত।

আবারও হাসিহাসি মুখে বললাম, ‘আজ যে কঠোর বিধিনিষেধ শুরু হয়েছে জানেন না? ধরলে তো জরিমানা হবে।’ প্রশ্নের বিপরীতে তিনি যে প্রশ্ন করেন, তাতে আর উত্তর দেওয়ার কিছু থাকে না।

কিশোরগঞ্জের স্বপন বেশ কয়েক বছর ধরেই রাজধানীতে আছেন জীবিকার তাগিদে। আগে থাকতেন আদাবরে। কিছুদিন হলো ফার্মগেটের মনিপুরী পাড়ায় মেসে উঠেছেন।

স্বপন বলেন, লকডাউন বলে তো ফুল না শুকিয়ে বসে থাকবে না।
ছবি: সাদিয়া মাহ্জাবীন ইমাম

কথা বলে সময় নষ্ট হচ্ছে, আবার আমিও পিছু ছাড়ছি না দেখে একপর্যায়ে আবার সেই গ্রিলের কাছে যান তিনি। শিস বাজিয়ে কেউ একজনকে ডাকেন। মুহূর্তের মধ্যে ওপাশ থেকে এগিয়ে আসে ছোট ছোট দুটি হাত। এপাশ থেকে এগিয়ে যান তিনি। এরপরে তাঁর হাতে উঠে আসে কয়েকটি বালতি আর গামলা। গামছা আর কাপড়ে ঢাকা। তখন স্পষ্ট হয় ব্যাপারটা।

স্বপনের একজন খুদে সহযোগী আছে। দুজন মিলে এতক্ষণ পুলিশের ভয়ে চন্দ্রিমা উদ্যানের গাছপালার ভেতর বসে ছিলেন। একপর্যায়ে তিনি বেরিয়ে আসেন। তাঁর সঙ্গে বেরিয়ে আসে তিনটি পাত্রভরা ফুল। দোলনচাঁপা প্রতি তোড়ায় ১০টি করে। এক তোড়ার দাম ১০০ টাকা। এক রঙের গোলাপ হলুদগুলোর তোড়া ২০০ টাকা। আছে ১৫ থেকে ১৮টি করে। তবে এগুলো লিচু কেনার মতো গুনে নেওয়ার সুযোগ নেই। তাতে ফুল নষ্ট হবে। ফুল ক্রেতাকে নিতে হবে বিশ্বাস করেই। গোলাপের তা–ও বেশ কিছুক্ষণ টিকে থাকার সক্ষমতা আছে, কিন্তু দেশীয় দোলনচাঁপার তা নেই। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই ওই ফুল মিইয়ে যাবে, তাই যত বেশি পাতা দিয়ে আর্দ্রতা ধরে রাখা যায়, সেই চেষ্টায়ই তাঁরা করছিলেন।

লকডাউনের এমন কড়াকড়ি পরিস্থিতির মধ্যেও স্বপন আজ আট হাজার টাকার ফুল এনেছেন। বিকেল সাড়ে চারটা পর্যন্ত একটি তোড়াও বিক্রি করতে পারেননি তিনি।

বিকেল সাড়ে চারটা পর্যন্ত ফুলের একটি তোড়াও বিক্রি হয়নি।
ছবি: সাদিয়া মাহ্জাবীন ইমাম

বিধিনিষেধের শুরুতে কাজটা কেন করলেন জানতে চাইলে তিনি বললেন, টাকা ঈদের আগেই দিয়ে বায়না করেছিলেন। ভেবেছিলেন বিধিনিষেধ আরেকটু দেরিতে শুরু হবে। ফুল সকালে সাভার থেকে আগারগাঁও এসেছে। সেখান থেকে রিকশায় করে এখানে নিয়ে এসেছেন।

নিরুপায় এই ফুল বিক্রেতা বলেন, ‘সমস্যা হইল এমন গরমে বেশিক্ষণ ভালো রাখা যাইতেছে না। বায়না করা থাকলে না নিয়া তো উপায় নাই।’

এতক্ষণে স্বপনের সেই সহযোগী আরও একটু সাহসী হয়। ওপাশের গাছপালার ভেতর থেকে ছোট ছোট চোখে তাকিয়ে ছিল আমার দিকে। জিজ্ঞেস করলাম কে হয়? আমতা আমতা করে স্বপন জানান, কেউ হয় না, হেল্পার আর থাকে খায় তাঁর সঙ্গেই। ওপাশ থেকে ছোট হাতে এগিয়ে আসে পানির বোতল। স্বপন সে বোতল নিয়ে ফুলে ছিটিয়ে দিলেন। বললাম, গরমে তো সেদ্ধ হচ্ছে। কাল ভোরে ভোরে নিয়ে বের হলেই পারতেন।

পাল্টায় স্বপন বলেন, ‘আট হাজার টাকার ফুল। আমি বললেই না শুকায়া বইসা থাকব লকডাউন বইলা? ফুল কি মানুষের কথা শোনে?’