লিজা, আসমা, তারারা এখন ১১ জন

অভুক্ত মানুষের মধ্যে বিতরণের জন্য খাবার তৈরি করছেন লিজা (বামে) ও অন্যরা। ছবি: প্রথম আলো
অভুক্ত মানুষের মধ্যে বিতরণের জন্য খাবার তৈরি করছেন লিজা (বামে) ও অন্যরা। ছবি: প্রথম আলো

লালমাটিয়া ডি ব্লকের সেই সড়কটার শেষ মাথায় 'মহল্লার ছেলে' তারাকে নিয়ে একরকম বিরক্তই ছিল পাড়াপ্রতিবেশী। এই আড্ডা দিচ্ছে, ক্রিকেট খেলছে, হৈ-হল্লা করছে- তো আবার ঝগড়া, মারামারি। কিন্তু এসব এখন অতীত। তারার রুটিন বদলে গেছে।

এই মহামারিতে তারা ব্যস্ত অভুক্ত মানুষের জন্য প্রতিদিনকার খাবার রান্নায়।

শুধু তারা নয়, থিয়েটারকর্মী লিজা, আসমা, আক্তাররা এখন ১১ জন। প্রথমে লিজা শুরু করেছিলেন হ্যান্ড স্যানিটাইজার আর মাস্ক বিতরণ দিয়ে। এরপর বিলিয়েছেন শুকনো খাবার। রোজা শুরুর পর প্রতিদিন ইফতার বানিয়ে বিতরণ করছেন, পাড়াপ্রতিবেশীরা তাঁর কাজে যুক্ত হয়েছেন। প্রথম দিনে আয়োজন ছিল একশ জনের। গতকাল 'অতিথি'র সংখ্যা ছয়শো ছড়িয়েছে।
শনিবার লালমাটিয়ার একটা দোতলা বাসায় বসে কথা হচ্ছিল লিজা আসমা আক্তারের সঙ্গে। বাইরে তখন প্রচণ্ড বৃষ্টি। লিজাসহ চারজন কোটা–বাছার কাজ করছিলেন। লিজা প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর শ্বশুর ক্যানসারে ভুগছেন। চিকিৎসার জন্য জমি বিক্রি করতে হয়েছিল। চিকিৎসা শেষে কিছু টাকা হাতে রয়ে গিয়েছিল। সাহস করে সে টাকা নিয়েই ক্ষুধার্ত বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন।

লিজার দলে কারা আছেন, কী তাঁদের কাজ? জানতে চাইলে প্রথম তাঁদের পরিচয় করিয়ে দিলেন তিনি।

এই ফাঁকে আশপাশে চোখ বুলাতেই মনে হলো মহামারিতে ছোটখাটো একটা ত্রাণ শিবিরের চেহারা নিয়েছে বাসাটা। যে ঘরে বসে কথা হচ্ছিল তার একদিকে রাখা মুড়ি, একদিকে চাল, ডাল আর ছোলার বস্তা। করিডোরে মরিচ, খাবার ঘরের কোণায় শশা রাখা, বারান্দায় পেঁয়াজ। মণ হিসেবে কিনেছেন সব, তা-ই জানালেন।

কথায় কথায় জানা গেল এই বাসাটি এক প্রবাসী বাংলাদেশীর। লিজা ছাড়াও এখানে আরও একঘর ভাড়াটিয়া আছেন। তবে বাড়ির মালিক ওখানেই স্বেচ্ছাসেবীদের থাকার অনুমতি দিয়েছেন।

ইফতার বানানোর একটা পর্বে কাল লিজার সহযোগী ছিলেন তাঁর স্বামী আহমেদ আখতার। একটি তৈরি পোশাক কারখানায় চাকরি করেন আহমেদ। মরিচ বাছছিলেন আসমা। আসমা দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী, একটি চোখ ভালো আছে। হাত নেই একটি, অন্যটিও টিকে আছে কোনোরকমে। সেই হাতেই ক্ষিপ্রতার সঙ্গে মরিচের বোঁটা ছাড়াচ্ছিলেন।

আসমা জানালেন, রান্না করার সময় জুয়াড়ি স্বামী চুলার ওপর ঠেসে ধরেছিলেন বছর তিনেক আগে। ঢাকা মেডিকেল কলেজের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসা নিয়েছিলেন। লিজা ওখানে মাঝে মাঝে স্বেচ্ছাশ্রম দেন। সেখান থেকেই পরিচয়, আত্মীয়তা। জেসমিন একসময় তুলার কারখানায় কাজ করতেন। তাঁর স্বামীও মদ্যপ, জুয়াড়ি। কোলের শিশুকে বিক্রি করে দিয়েছিলেন। পরে শিশুটিকে উদ্ধার করে সংসার ছেড়ে পালিয়েছেন। এখন লিজার সঙ্গেই থাকেন।

স্বেচ্ছাসেবকদের এই দলে আছেন, দোতলা বাসার উল্টো দিকের মুদির দোকানি মোতাহার। ইফতার বন্টন ছাড়াও সস্তায় ভাল জিনিস জোগানোর দায়িত্ব নিয়েছেন তিনি। 'এ লেটার টু গডের' পরিচালক হেমন্ত সাদিকও এ দলের স্বেচ্ছাসেবী।

আরেক স্বেচ্ছাসেবী উন্নয়নকর্মী সৈয়দ সাইফুল আলম প্রথম আলোকে বলছিলেন, তাঁদের এই কাজে ধীরে ধীরে অনেকে যুক্ত হয়েছেন। বাড়ির সামনে রাখা একটি বাইসাইকেল দেখিয়ে বলছিলেন, 'এটা একজন ডিম বিক্রেতার। দিনভর ডিম বিক্রি শেষে তিনি এসে ইফতার বন্টনে হাত দেবেন। আজ এ বাসায় গ্যাস নেই, পাশের একটি বাসায় ছোলা সেদ্ধ হচ্ছে। একটা বাসা থেকে পানি দিচ্ছে আমাদের। শরবত বানানোর জন্য অনেক পানি ফোটাতে হয়, সেই কাজ পাড়াপ্রতিবেশীদের অনেকে ভাগ করে নিয়েছেন।'

কারা আসছেন এই সহায়তা নিতে। জানা গেল, এ তালিকায় শুরুর দিকে নিরাপত্তাকর্মীদের সংখ্যা বেশি ছিল। এখন যুক্ত হয়েছেন একসময় যারা বাড়িতে বাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ করতেন তাঁরা।

লিজার ১১ জনের দল ক্লান্তিহীন কাজ করে চলেছেন। শনিবার দুপুরের পর বৃষ্টি একটু ধরে এলে 'তারা' এসে হাজির। উঠানে কড়াই বসিয়ে রান্নার আয়োজন শুরু করলেন তিনি। তারা প্রথম আলোকে বলেন, যতদিন না এই সঙ্কট কাটছে ততদিন তিনি রান্নার কাজটা করতে চান।
কিন্তু কতদিন আসলে? লিজা বললেন, তাঁরা ইঙ্গিত পাচ্ছেন অভুক্ত নিরন্ন মানুষের সংখ্যা প্রতিদিন বাড়ছে। কতটা কুলিয়ে উঠতে পারবেন কে জানে।