স্কুলে যেতে যেতে মা-ছেলে কত গল্প করতাম

>করোনাভাইরাস পাল্টে দিয়েছে আমাদের জীবনের বাস্তবতা। দেশ-বিদেশের পাঠকেরা এখানে লিখছেন তাঁদের এ সময়ের আনন্দ-বেদনাভরা দিনযাপনের মানবিক কাহিনি। আপনিও লিখুন। পাঠকের আরও লেখা দেখুন প্রথম আলো অনলাইনে। লেখা পাঠানোর ঠিকানা: [email protected]

প্রতিদিন বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে করোনার আপডেট দেখি একঝলকে। অথচ প্রথম দিকে যখন করোনা বাংলাদেশে এল, তখন খুব আগ্রহ নিয়ে করোনার আপডেট দেখতাম, প্রেস ব্রিফিং শুনতাম। কিন্তু প্রতিদিন একই জিনিস আর কষ্টের কথা কতই শুনতে ভালো লাগে; তাই এখন শুধুই জেনে নিই আপডেটটা; বাড়তি কিছু জানার আগ্রহ যেন হারিয়ে ফেলেছি এই চার মাসে। এই তো সেদিন ৮ মার্চে প্রথম যেদিন জানতে পারলাম বাংলাদেশে করোনা রোগী পাওয়া গেছে, সেদিন যেন শুধু সবার মুখে মুখে এই একই কথা চলছিল। আমরা চিন্তায় অস্থির হয়ে গিয়েছিলাম, কী হবে, কী হবে। বাংলাদেশে যদি ইতালি, ফ্রান্স, যুক্তরাষ্ট্রের মতো করোনা হয়, তবে বাংলাদেশের মানুষ বাঁচবে কী করে? আমরা চলব কী করে!

এদিকে ছেলেদের স্কুল খোলা। সারাক্ষণ ওদের নিয়ে টেনশন স্কুলে পাঠাব কি না। একবার মনে হতো কীই–বা হবে না পাঠালে। জীবনের থেকে কি পড়াশোনা আগে? আরেকবার মনে হতো, নাহ, পড়ায় পিছিয়ে থাকলে চলবে কী করে! ভবিষ্যৎ তো অন্ধকার হয়ে যাবে। এভাবে সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে ছেলেদের কোনো দিন স্কুলে পাঠাতাম, আবার কোনো দিন পাঠাতাম না। আর ভাবতাম, কেন যে স্কুল ছুটি দিচ্ছে না। দেশের এই পরিস্থিতিতে সবার আগে স্কুল-কলেজ বন্ধ ঘোষণা দরকার। ছেলেদের মাস্ক পরিয়ে, বারবার পানি খাওয়ার কথা বলে, বেশি মানুষের সঙ্গে না মিশতে বলে—এভাবে বিভিন্ন কথা বুঝিয়ে স্কুলে পাঠাতাম। আর নিজে মাস্ক পরে, গণপরিবহন এড়িয়ে সিএনজি বা উবার নিয়ে ছেলেদের স্কুলে নিয়ে যাওয়া–আসা করতাম।

অবশেষে এল ১৬ মার্চ। স্কুল থেকে মেসেজ এল ছেলেদের স্কুল হাফ হয়ে ছুটি হবে অনির্দিষ্টকাল পর্যন্ত করোনার জন্য। দুর্ভাবনা গেল, আর ভয় নিয়ে ছেলেদের স্কুলে পাঠাতে হবে না। বাড়ির ছেলে বাড়িতেই থাক, সুরক্ষিত থাক। শুরু হলো ছুটি। অনির্দিষ্টকালের ছুটি। ওদের বাবারও ছুটি হলো, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হলো। ছুটি পেয়ে ওর বাবা বারবার বলতে থাকল, এ রকম ছুটি তো আর পাওয়া যায় না। চল না কয়েক দিনের জন্য গ্রামের বাড়িতে গিয়ে ঘুরে আসি। ব্যস, চলে এলাম দেশের বাড়িতে, কিন্তু কয়েক দিন হয়ে গেল কয়েক মাস। লকডাউনে আটকে গেলাম।

ছেলেরা প্রতিদিন রোজকার রুটিন–মতো ঘুম থেকে উঠে হাত–মুখ ধুয়ে পড়তে বসে, নাশতা খায়, গোসল করে, মোবাইল–ল্যাপটপ নিয়ে ব্যস্ত থাকে। ওদের স্কুলের পড়ানো শুরু হয়ে গেল টেলিভিশনে। কিছুদিন খুব আগ্রহ নিয়ে সেই অনুষ্ঠানগুলো দেখতে থাকল৷ কিন্তু কয়েক দিন পরই হাঁপিয়ে উঠল। না, ভালো লাগছে না টিভিতে প্রোগ্রাম দেখতে। শুরু হলো স্কুলের নতুন কার্যক্রম, অনলাইনে ক্লাস নেওয়া। খুব আনন্দ নিয়েই ছেলেরা অনলাইনে ক্লাস করছে, পরীক্ষা দিচ্ছে। আমি এই লকডাউনে ওদের পড়াশোনা দেখার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছি। যেভাবে চারপাশে শুধু করোনা আর মৃত্যু, সেখানে কি আর পড়াশোনা নিয়ে ভাবতে ভালো লাগে!

এভাবেই চলতে লাগল লকডাউনের দিনগুলো। আর আমি? নিজের সাজানো–গোছানো ছিমছাম সংসার ছেড়ে, শ্বশুর-শাশুড়ি, ননদ, ননদ জামাইদের সঙ্গে নতুন পরিবেশে থাকতে শুরু করলাম। সবাই সবার কাজ ভাগ করে নিলাম, চলতে থাকল নতুন পরিবেশে। আগে অল্প করে রান্না করতাম, এখন অনেকজনের রান্না করি। প্রথম দিকে ভালোই লাগছিল, দিনগুলো তাড়াতাড়িই যাচ্ছিল। কিছুদিন পর ছেলেদের পরীক্ষা শুরু হলো। দেখলাম ছেলে বেশি ভালো করতে পারছে না। তাদের সিলেবাস প্রায় শেষ করে এসেছিলাম বাড়িতে। কিন্তু চর্চা না থাকায় যেন ভুলতে বসেছে পড়াশোনা। আবার শুরু করলাম তাদের পড়ানো। মোটামুটি ভালোই করল পরীক্ষায়। পাশাপাশি বিভিন্ন অনলাইন কুইজ, প্রতিযোগিতায় অংশ নিল ওরা, ভালোই করল।

কিন্তু এখন? লকডাউনে চার মাস...ছেলেরা বাসায় থাকতে থাকতে হাঁপিয়ে উঠেছে। খেলাধুলা বলতে গেলে তো তেমন একটা করা হয় না। বড় বারান্দায় কিছুক্ষণ ফুটবল, ক্রিকেট নিয়ে নাড়াচাড়া তারপর আবার মোবাইল–ল্যাপটপ। আগে স্বাস্থ্যকর খাবার দিতাম খুব আগ্রহ নিয়ে। কারণ, চারদিকে করোনার ছড়াছড়ি, এর মধ্যে তো স্বাস্থ্য ভালো রাখতে হবে। স্বাস্থ্যকর সবকিছু খেতে হবে। শুরু হলো রুটিন মাফিক শাকসবজি, ভিটামিন ‘সি’–যুক্ত ফলমূল, মসলা চা, লেবুপানি, মাছ-মাংস, ডিম নিয়মিত খাওয়া। ভাজাপোড়া, বাইরের খাবার একদম বাদ। কিন্তু একঘেয়েমি জীবন আর কতই বা ভালো লাগে। ছেলেরা অস্থির হয়ে গেছে এই বন্দিজীবনে। এভাবে তিন মাস ওরা একবারও বাসার বাইরে যায়নি। ওরা এই বন্দিজীবন থেকে মুক্তি চায়। মুক্ত বাতাসে, খোলা আকাশের নিচে যেতে চায় ওরা। খেতে চায় বাইরের রেস্তোরাঁয় গিয়ে পিৎজা-বার্গার, বিরিয়ানি। আগে স্কুলের কড়া রুটিনে অস্থির হয়ে ছুটি চাইত। বলত, ‘যদি কিছুদিনের জন্য ছুটি পেতাম!’ আর এখন স্কুলের সেই মাঠ, ক্লাসরুম, বন্ধু, লাইব্রেরি, স্কুলের রাস্তা—সবকিছুই মিস করে ভীষণ। এখন বলে, ‘মা, সেই স্কুলের দিনগুলোই তো মজার ছিল। ব্যস্ততা ছিল, কিন্তু বৈচিত্র্যও ছিল। স্কুলে যাওয়ার পথে আমরা মা–ছেলেরা মিলে কত গল্প করতাম, রাস্তায় কত মজার মজার খাবার খেতাম। স্কুলের পড়াশোনার গল্প, সহপাঠীদের গল্প, বিভিন্ন বই, নাটক—কত কী নিয়ে গল্প! কথা যেন শেষই হতো না।’

সেই ব্যস্ততায় ভরা দিনগুলো, আনন্দের দিনগুলো, বাইরে খেতে যাওয়া, নাটক দেখতে যাওয়া, ছেলেদের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যাওয়া খুব মিস করি। মিস করি বান্ধবীদের সঙ্গে বাইরে যাওয়া, গল্প করা, মজা করা, হাসি-ঠাট্টা করা দিনগুলো। রাতে যখন ঘুমাতে যায়, দুই ছেলে আমাকে জড়িয়ে ধরে বলে, ‘মা আর কতদিন এভাবে থাকতে হবে? কবে আমরা মুক্তি পাব, কবে আমরা বাইরে যেতে পারব, সবার সঙ্গে মিশতে পারব?’

আমার ছেলেদের প্রশ্নের উত্তর তো আমার জানা নেই। কারোরই জানা নেই, একমাত্র সৃষ্টিকর্তাই জানেন। তাই কিছু বলতে পারি না, বলি আল্লাহর ওপর ভরসা রাখতে। দুঃখের পরেই তো সুখ আসে আর কান্নার পরেই তো হাসি, তাই আমরা বিশ্বাস করি, এই কষ্টের দিনগুলো নিশ্চয়ই আমরা খুব তাড়াতাড়ি পার করে ফেলব। আসবে নতুন দিন, নতুন সুখ যেদিন সেই মৃত্যুর কথা শুনতে হবে না, যে মৃত্যুতে কোনো প্রিয়জনকে কাছে পাওয়া যায় না, প্রিয়জনের মাটি কবরে পাওয়া যায় না। আমরা আনন্দে একে অন্যকে জড়িয়ে ধরতে পারব, একসঙ্গে হাসতে পারব, একে অপরের বাসায় গিয়ে কুশল বিনিময় করতে পারব। সেদিনটির অপেক্ষাতেই আমরা আছি যেদিন, মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা প্রেস ব্রিফিংয়ে বলবেন, গত ১৫ দিনে একটাও করোনা রোগী পাওয়া যায়নি। আসবে, অবশ্যই আসবে সেই সুদিন, নতুন ভোর, নতুন সূর্য।

আর সেই নতুন দিনের প্রথম আলোয় ছেলেদের ঘুম থেকে টেনে ওঠাতে গিয়ে দেখব, ছেলেরা নিজেই সকালে উঠে পড়েছে আর বলছে, মা, আমরা আজ স্কুলে যাব। আলমারি থেকে ওদের স্কুল ড্রেস বের করে পরিয়ে দিতে গিয়ে দেখব ওদের শার্ট–প্যান্ট সাইজে ছোট হয়ে গেছে। সেই ছোট শার্ট–প্যান্ট পরেই ওরা লুটিয়ে পড়ছে আর বলছে, আমরা স্কুলে যাব, কত মজা। আর ওদের বাবা বিকেলে অফিস থেকে ফোন করে বলবে, ‘রোজি, তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নাও। আমরা রাদমানকে স্কুল থেকে নিয়ে বেইলি রোডে নাটক দেখে পুরান ঢাকার বিরিয়ানি খেয়ে বাসায় ফিরব। জলদি কর, হাতে একদমই সময় নাই।’

*গৃহিণী ও রন্ধন শিল্পী। কল্যাণপুর, ঢাকা