প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘পৃথিবীটা একটা গ্লোবাল ভিলেজ। কেউ কারও থেকে বিচ্ছিন্ন না। বিশ্বে যখন একটি অর্থনৈতিক সংকট হয়, তার ধাক্কা আমাদের ওপরেও পড়ে।’

সরকার দেশের মানুষের আর্থসামাজিক উন্নতি চায় বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। সরকার একই সঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে আবার যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতি ঘটাচ্ছে বলেছেন তিনি। উত্তরবঙ্গের মঙ্গা দূর করার কথা বলেন তিনি। রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে যে বিদ্যুৎ আসবে, তা উত্তরাঞ্চলের মানুষের উন্নয়নের কাজে লাগবে বলেন। তাদের কর্মসংস্থানের জন্য এখানকার বিদ্যুৎ দিয়ে শিল্প হবে বলেও জানান।

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, জাতির পিতা রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র করার স্বপ্ন দেখেছিলেন। ১৯৬২ সালে পূর্ব পাকিস্তানে একটি ও পশ্চিম পাকিস্তানে আরেকটি স্থাপনের সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী দুটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পশ্চিম পাকিস্তানে স্থাপন করে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র করার কাজ কিছুটা এগিয়েছিলেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা ১৯৯৬ সালে ২১ বছর পর ক্ষমতায় আসার পর বাংলাদেশ নিউক্লিয়ার পাওয়ার অ্যাকশন প্ল্যান তৈরি করি। আমরা পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য জায়গা ঠিক করেছিলাম। আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার কার্যালয় ভিয়েনায় আমরা প্রতিনিধিদল পাঠিয়েছিলাম। এ জন্য একটি কমিটিও করি। বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর এ ব্যাপারে তারা কোনো কাজের অগ্রগতি করেনি। আমরা ২০০৯ সালে আবার ক্ষমতায় আসার পর আবারও বিদ্যুৎকেন্দ্রটি করার ব্যাপারে কাজ শুরু করি। বন্ধুপ্রতিম দেশ রাশিয়ায় যাই, পুতিনের সঙ্গে এ নিয়ে আমার কথা হয়। রোসাটম আমাদের কাজে সহযোগিতায় এগিয়ে আসে।’

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের কাজ করতে গিয়ে দেশের মানুষের নিরাপত্তা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সব ধরনের নিরাপত্তাকে মাথায় রেখে এটি নির্মাণ করা হয়েছে। পাবনার জনগণ এ ব্যাপারে সহযোগিতা করেছে বলেন প্রধানমন্ত্রী।

করোনাভাইরাসের সংক্রমণের সময় সারা বিশ্বে সব কাজ বন্ধ ছিল। কিন্তু রাশিয়ার মানুষ ও বাংলাদেশের মানুষেরা পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাজ বন্ধ করেনি বলেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য ছিল, সবার জন্য বিদ্যুৎ দেব। সেটি আমরা পূরণ করতে পেরেছি।’

শেখ হাসিনা আরও বলেন, ‘আমরা দেশের গরিব মানুষদের জন্য কম মূল্যে খাবার দিচ্ছি। যারা বেশি গরিব, তাদের জন্য বিনা মূল্যে খাবার দিচ্ছি। এগুলো নিয়ে সমালোচনা হচ্ছে, এগুলোতে কান দিলে হবে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় কাজ করছি। এই বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিবেশের ক্ষতি করবে না। দুটি ইউনিট মিলিয়ে ২ হাজার ৪০০ ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে, যা আমাদের উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘বিদ্যুৎকেন্দ্রটির প্রথম ইউনিট থেকে ২০২৩ সালে এবং ২০২৪ সালে দ্বিতীয় ইউনিট থেকে বিদ্যুৎ পাব।’

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ইয়াফেস ওসমান বলেন, ‘নেত্রীর ভাষায় আমরা আবারও বলতে চাই, আমরা পারি। বাঙালিরা পরমাণু থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের দ্বারপ্রান্তে এসে পৌঁছেছে।’ এ সময় মন্ত্রী তাঁর স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে কয়েকটি ছড়া পড়ে শোনান।

বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রকল্প পরিচালক মো. শৌকত আকবর বলেন, ‘আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার অনুমতি ও তদারকির মাধ্যমে এবং সব নিয়ম মেনে এটি করা হচ্ছে।’
এ সময় রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক শক্তি করপোরেশনের (রোসাটম) মহাপরিচালক অ্যালেক্সি লিখাচেভ রুশ ভাষায় রিঅ্যাক্টর প্রেশার ভেসেল বসানোর কাজে অনুমতি এবং সহযোগিতা দেওয়ার জন্য অনুমতি দেওয়ায় প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ দেন। তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে এটি চালু করেন।

গত বছরের ১০ অক্টোবর প্রথম ইউনিটের রিঅ্যাক্টর প্রেশার ভেসেল স্থাপন কার্যক্রমের উদ্বোধন করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেখানে উপস্থিত ছিলেন বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণে সহায়তাকারী রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক শক্তি করপোরেশনের (রোসাটম) মহাপরিচালক অ্যালেক্সি লিখাচেভ ও সংস্থাটির অন্য শীর্ষ কর্মকর্তারা।

প্রকল্প পরিকল্পনা অনুযায়ী, পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিট ২০২৩ সালে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করবে এবং ২০২৪ সালে দ্বিতীয় ইউনিট থেকে একই পরিমাণ বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে। প্রকল্পটির প্রায় ৫৩ শতাংশ আর্থিক অগ্রগতি এবং ৫৫ শতাংশ ভৌত অগ্রগতি হয়েছে। তবে প্রথম ইউনিটের সার্বিক অগ্রগতি ৭০ শতাংশ।

রূপপুর প্রকল্পটি রাশিয়ার কারিগরি ও আর্থিক সহায়তায় বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন বাস্তবায়ন করছে। জনশক্তি প্রশিক্ষণসহ প্রকল্পটির নির্মাণ ব্যয় ১২ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং এর ৯০ শতাংশ রাশিয়ার অর্থায়নে করা হচ্ছে।