পবিত্র রমজান মাসে ক্যানসার রোগীদের খাদ্যাভ্যাস ও পুষ্টি ব্যবস্থাপনা যেমন হওয়া দরকার

‘বিশ্বমানের ক্যানসার চিকিৎসা এখন বাংলাদেশে’ শীর্ষক অনলাইন আলোচনা অনুষ্ঠিত হয় গত রোববারছবি: প্রথম আলো

ক্যানসার জয় করার লড়াইয়ে সঠিক পুষ্টি এবং মনোবল অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে পবিত্র রমজান মাসে যাঁরা ক্যানসারের মতো কঠিন রোগের বিরুদ্ধে লড়াই করছেন, তাঁদের জন্য রোজা রাখা যেমন আবেগের বিষয়, তেমনি এটি একটি বড় শারীরিক চ্যালেঞ্জও বটে। সঠিক নিয়ম মেনে এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ক্যানসার রোগীরাও নিরাপদে রোজা পালন করতে পারেন।

গত রোববার (২২ ফেব্রুয়ারি) এসকেএফ অনকোলজির আয়োজনে ‘বিশ্বমানের ক্যানসার চিকিৎসা এখন বাংলাদেশে’ শীর্ষক বিশেষ অনলাইন আলোচনায় এই গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলো তুলে ধরেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের মেডিকেল অনকোলজি বিভাগের অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান ডা. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন নাসিহা তাহসিন। অনুষ্ঠানটি প্রথম আলো এবং এসকেএফ অনকোলজির ফেসবুক পেজে সরাসরি প্রচারিত হয়।

রোজা রাখা কি সবার জন্য নিরাপদ

ক্যানসার আক্রান্ত সব রোগী রোজা রাখতে পারবেন কি না, তা নির্ভর করে কয়েকটি বিষয়ের ওপর। ডা. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান বলেন, ‘এটি নির্ভর করে রোগীর শারীরিক শক্তি, ক্যানসারের ধরন এবং বর্তমানে তিনি কী ধরনের চিকিৎসা পাচ্ছেন, তার ওপর। যাঁদের শারীরিক সক্ষমতা ভালো, হাঁটাচলা করতে পারেন এবং বয়স তুলনামূলক কম, তাঁরা নিয়ম মেনে রোজা রাখতে পারেন। তবে যাঁরা অত্যন্ত দুর্বল এবং শুধু সাপোর্টিভ চিকিৎসার ওপর আছেন, তাঁদের জন্য রোজা রাখা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। কারণ, এতে ডিহাইড্রেশন (পানিশূন্যতা) বা রক্তচাপ কমে গিয়ে বড় ধরনের জটিলতা তৈরির আশঙ্কা থাকে।’

চিকিৎসা ও ওষুধের সময়সূচি সমন্বয়

ক্যানসার চিকিৎসা চলাকালে রোজা পালনের বিষয়ে ডা. মামুন স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেন। তিনি জানান, যেসব কেমোথেরাপি স্যালাইনের মাধ্যমে শরীরে পুশ করা হয়, সেগুলো চলাকালীন রোজা রাখা সম্ভব নয়। তবে কেমোথেরাপির আগে বা পরে শারীরিক সামর্থ্য অনুযায়ী রোজা রাখা যায়। অন্যদিকে ওরাল কেমোথেরাপি বা হরমোন থেরাপির ওষুধগুলো সাধারণত এক বা দুই বেলা খেতে হয়, যা সাহ্‌রি ও ইফতারের সময়ের সঙ্গে সহজে সমন্বয় করা সম্ভব। এ ছাড়া রেডিওথেরাপি চলাকালীনও রোগীরা চাইলে রোজা রাখতে পারেন। তবে কেমোথেরাপির পর যদি অতিরিক্ত বমি, পাতলা পায়খানা বা জ্বর থাকে, তবে রোজা না রাখা ভালো।

রমজান মাসে ক্যানসার রোগীর খাদ্যাভ্যাস ও পুষ্টি ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা করেন অধ্যাপক ডা. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান
ছবি: প্রথম আলো

রোজায় আদর্শ খাদ্যাভ্যাস ও সতর্কতা

ক্যানসার রোগীদের ইফতার ও সাহ্‌রির খাবার নির্বাচনে সচেতন হওয়া জরুরি। আমাদের দেশে ইফতারে ভাজাপোড়া খাওয়ার প্রবণতা থাকলেও ক্যানসার রোগীদের ক্ষেত্রে ডুবো তেলে ভাজা খাবার এবং বেকারির খাবার পরিহার করার পরামর্শ দেন ডা. মামুন। ইফতারে পর্যাপ্ত পানি এবং সহজপাচ্য খাবার রাখা উচিত। সাহ্‌রিতে লাল চালের ভাত, লাল আটার রুটি বা ওটসের মতো জটিল কার্বোহাইড্রেট রাখা ভালো, যা দীর্ঘক্ষণ শরীরে শক্তি জোগাবে। মাছ, মুরগির মাংস, ডিম ও ডালজাতীয় আমিষের পরিমাণ ঠিক রাখতে হবে, যাতে পেশিক্ষয় না হয়। ফলমূল খাওয়ার ক্ষেত্রে পাতলা খোসার ফল যেমন আপেল বা আঙুর সরাসরি না খেয়ে খোসা ছাড়িয়ে খাওয়ার পরামর্শ দেন ডা. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান।

শারীরিক সক্ষমতা যাচাই ও ফলোআপ

একজন রোগী রোজা রাখার জন্য ফিট কি না, তা বোঝার জন্য কিছু মানদণ্ড (প্যারামিটার) রয়েছে। ডা. আব্দুল্লাহ আল মামুন খানের মতে, রোগীর কিডনি ও লিভার ফাংশন, রক্তে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা এবং ইলেকট্রোলাইটস যেমন পটাশিয়াম ও সোডিয়ামের ভারসাম্য ঠিক থাকতে হবে। ডায়াবেটিস বা কিডনি জটিলতা থাকলে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিয়ে ওষুধের ডোজ সেট করে নিতে হবে। রোজা শুরু করার অন্তত এক সপ্তাহ আগে ক্যানসার বিশেষজ্ঞের সঙ্গে পরামর্শ করা ভালো।

মানসিক স্বাস্থ্য ও ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি

অসুস্থতার কারণে যাঁদের পক্ষে রোজা রাখা সম্ভব হয় না, তাঁদের উদ্দেশে ডা. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান বলেন, ‘ইসলাম ধর্মে অসুস্থ ব্যক্তির জন্য শিথিলতা রয়েছে। শারীরিক অক্ষমতার কারণে রোজা রাখতে না পারলে পরবর্তী সময়ে সুস্থ হয়ে তা আদায় করার সুযোগ আছে। মানসিকভাবে শক্ত থাকা ক্যানসার যুদ্ধের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।’

অনুষ্ঠানের শেষে সঞ্চালক নাসিহা তাহসিন জানান, এসকেএফ অনকোলজি বাংলাদেশের প্রথম এবং একমাত্র ইইউ জিএমপি অনুমোদিত অনকোলজি প্ল্যান্টের মাধ্যমে বিশ্বমানের ওষুধ রোগীদের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিচ্ছে। বর্তমানে তাঁরা বাংলাদেশে বিশ্বমানের ওষুধ ও ৩৩টি পেশেন্ট ফ্যাসিলিটি সেন্টারের মাধ্যমে রোগীদের সেবা নিশ্চিত করছে।