default-image

সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ার মধ্য দিয়ে, হাজার হাজার মানুষের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে, দেশে দেশে নেতৃত্বে আসীনদের ব্যর্থতার পরিণতিতে এবং এর প্রকৃতি বিষয়ে আমাদের অজ্ঞতার কারণে করোনাভাইরাস এখন কেবল জনস্বাস্থ্যের বিষয়ে সীমিত নেই। এর প্রভাব পড়ছে আন্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায়, বৈশ্বিক রাজনীতিতে এবং সারা পৃথিবীর অর্থনীতিতে। মানুষের দৈনন্দিন জীবনাচরণ বদলে গেছে। এই ভাইরাস রাজনীতির অনেক প্রচলিত ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে দিয়েছে। ভবিষ্যতে এর প্রভাবে আমরা কোন ধরনের বিশ্বব্যবস্থা, কোন ধরনের পৃথিবীকে দেখতে পাব? আমরা এক জরুরি অবস্থার মধ্যে প্রবেশ করেছি, কিন্তু এই জরুরি অবস্থার পরিণতি কী? পরিবর্তনের কিছু ইঙ্গিত ইতিমধ্যে দৃশ্যমান হয়েছে, আর কিছু কিছু দিক যেগুলো নাগরিকদের জন্য ভয়াবহ এক অবস্থার ইঙ্গিত দেয়, সেগুলো বাস্তব হয়ে উঠবে কি না, তা নির্ভর করছে আমাদের ওপরে।

করোনাভাইরাস আমাদের কী জানান দিচ্ছে?

করোনাভাইরাস বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার চারটি দুর্বলতার দিক সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে। প্রথমত আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং নিরাপত্তাবিষয়ক আলোচনার রাষ্ট্রকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে ফেলেছে। বিশেষ করে পশ্চিমা দেশগুলোর রাষ্ট্রকেন্দ্রিক নিরাপত্তার চিন্তাভাবনা, যার ওপর ভিত্তি করে বাজেট বরাদ্দের প্রাধান্যের বিষয়টি নির্ধারিত হয়ে থাকে তা সাধারণ মানুষের জীবন রক্ষার জন্য অপ্রতুল। এটা অবশ্যই নতুন কিছু নয়, ১৯৮০-এর দশক থেকে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার পাশাপাশি মানবিক-নিরাপত্তা বা হিউম্যান সিকিউরিটির কথা বলা হচ্ছিল; তার গুরুত্ব এতটা সুস্পষ্টভাবে এবং বৈশ্বিকভাবে আগে কখনোই প্রমাণিত হয়নি। এর ফলে অর্থনীতি এবং রাজনীতি দুই–ই ওলটপালট হয়ে যাবে।

দ্বিতীয়ত বিশ্বায়নের বিরুদ্ধে যে দুই যুক্তি তার অসাড়তা প্রমাণিত হয়েছে। এক দশকের বেশি সময় ধরে আমরা বিশ্বায়নের বিরুদ্ধে দুটি যুক্তি শুনে এসেছি। এর একটি হচ্ছে বিশ্বায়নের বদলে দরকার একলা চলার নীতি, উগ্র জাতীয়তাবাদ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশে সে নতুন উগ্র জাতীয়তাবাদীদের উত্থান হয়েছে তাঁরা এই যুক্তির সবচেয়ে বড় প্রচারক। অন্যদিকে আছে এই বক্তব্য যে যেহেতু বিশ্বায়নের ফল কেবল সীমিতসংখ্যক মানুষ ভোগ করে আসছে, যারা অর্থবিত্ত-ক্ষমতার দিক থেকে লাভবান হয়েছে, সেহেতু বিশ্বায়নের ধারণাই ছুড়ে ফেলা উচিত। কিন্তু করোনাভাইরাস দেখিয়েছে আমরা স্বীকার করতে না চাইলেও আমরা পরস্পরের সঙ্গে জোরালোভাবে সম্পর্কিত এবং পরস্পরের ওপরে নির্ভরশীল। বিশ্বজুড়ে যে মহামারি তা এককভাবে কোনো দেশের পক্ষে মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। করোনাভাইরাস বিশ্বায়নের ধারণা খারিজ করে দেয় না। বরং এটা তুলে ধরেছে যে এখন যে ধরনের বিশ্বায়ন চলছে, তা আসলে মানুষের জন্য অপ্রতুল। দরকার এমন নতুন ধরনের বিশ্বায়ন, যা মানবিক নিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য, জনস্বার্থ এবং মানবাধিকারকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠবে।

তৃতীয়ত, এই মহামারি দেখাচ্ছে যে প্রবৃদ্ধি ও জিডিপিকেন্দ্রিক যে উন্নয়নের ধারণা ও মোহ দ্বারা আমরা পরিচালিত হচ্ছি এবং এর জন্য পরিবেশের ধ্বংসকে স্বাভাবিক বলে মনে করছি, তার জন্য চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে। এই মহামারির উদ্ভব হয়েছে প্রকৃতিতে, বিজ্ঞানীদের এই ধারণাকে গ্রহণ করলে আমাদের বুঝতে হবে যে এ হচ্ছে প্রকৃতির প্রতিশোধ। এটা অবশ্যম্ভাবী ছিল—বিষয়টি তা নয়, বরং এটা আমাদের স্মরণে রাখা উচিত যে এই অবস্থা আমরাই তৈরি করেছি। এই পৃথিবীতে আমরা একা নই, প্রাকৃতিক ব্যবস্থার একটি অংশ মাত্র—এই বিষয় আমরা সম্ভবত ভুলতে বসেছিলাম। বিজ্ঞান আমাদের একাধিক সতর্কবাণী দিয়েছে; কিন্তু তা আমরা অবজ্ঞা করেছি।

চতুর্থত, ভাইরাসের এই ব্যাপক বিস্তার আমাদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছে শাসনব্যবস্থার স্বচ্ছতা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। চীনের সরকার যদি স্বচ্ছ হতো এবং সারা পৃথিবীর মানুষকে এটা জানানোর ব্যবস্থা করত যে ডিসেম্বরের প্রথম দিক থেকে উহানে কী ঘটছে, তবে অবস্থা ভিন্ন হতো। তারা শুরুতে বিষয়টিকে গোপন করার চেষ্টা করে। ৩১ ডিসেম্বর ২০১৯, চীনা কর্তৃপক্ষ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বেইজিং অফিসে চিঠি দিয়ে জানায় যে উহানে ‘অজানা ধরনের অসুস্থতা দেখা দিয়েছে’। দু–তিন সপ্তাহ আগে জানলে কী হতো তা কেবল অনুমানের বিষয় নয়; ব্রিটেনের সাউথহ্যাম্পটন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শেংজি লাই গবেষণা করে দেখিয়েছেন যে চীনে যেসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে তা যদি এক সপ্তাহ, দুই সপ্তাহ বা তিন সপ্তাহ আগে নেওয়া হতো, তবে আক্রান্তের সংখ্যা যথাক্রমে ৬৬ শতাংশ, ৮৬ শতাংশ ও ৯৫ শতাংশ কম হতো এবং তার ভৌগোলিক বিস্তার নিয়ন্ত্রণ করা যেত। চীনের শাসনব্যবস্থার অস্বচ্ছতা এই ভাইরাসকে বিস্তার লাভ করতে সুযোগ করে দিয়েছে তা পরিষ্কার। দেখা যাচ্ছে, কোনো দেশের শাসনের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির অভাব শুধু সেই দেশের নাগরিকদের নয়, ওই দেশের সীমানার বাইরে আছেন, তাঁরাও এর বিরূপ প্রভাবের শিকার।

এক অন্তহীন জরুরি অবস্থার সূচনা?

ভাইরাসের বিস্তার রোধে চীন যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে, তার সাফল্য নিয়ে এখন আলোচনা হচ্ছে ব্যাপকভাবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান তেদরোস আধানোম গেব্রেয়াসুস বলেছেন যে চীনের হুবেই প্রদেশের উহান শহর বিশ্বের বাকি দেশগুলোকে আশার আলো দেখাচ্ছে। যদিও চীনের দেওয়া পরিসংখ্যান নিয়ে অনেকের সংশয় ও সন্দেহ আছে। চীনের গৃহীত পদক্ষেপের অন্যতম উপকরণ হচ্ছে প্রযুক্তি, বিশেষত চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের প্রযুক্তি, যার মধ্যে আছে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, বিগ ডেটা, রোবট ইত্যাদি। মানুষকে কার্যকরভাবে কোয়ারেন্টিনে পাঠানো, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা হচ্ছে কি না, সেটা মনিটরিং করা ইত্যাদি কাজে এসব প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে ব্যাপকভাবে। এই সাফল্যের মধ্য দিয়েই বোঝা যাচ্ছে যে চীন নজরদারির যে কত ব্যাপক এবং কতটা ইন্ট্রুসিভ বা অনধিকার প্রবেশমূলক পদ্ধতি তৈরি করেছে। স্মার্টফোন, মুখাবয়ব শনাক্তকরণ ক্যামেরা এবং মোবাইল অ্যাপ কেবল মানুষকে চিহ্নিত করা, খুঁজে বের করা এবং তাদের অনুসরণের কাজেই ব্যবহৃত হয়নি; তারা কার সঙ্গে মিশছে, কাদের কাছাকাছি যাচ্ছে, তা–ও চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে ভবিষ্যতে কি এটাই পৃথিবীর অন্যত্র স্বাভাবিক জীবন হয়ে উঠবে? একেই কি আমরা বলব ‘নিউ নরমাল’?

নাইন–ইলেভেনের পরে আমরা দেখেছি যে কী করে দেশে দেশে সরকারগুলো নজরদারির ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে, প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনি রূপ দিয়েছে এবং নাগরিকদের মৌলিক অধিকার হরণ করেছে ও প্রাইভেসিকে ক্ষুণ্ন করেছে। কেবল জরুরি জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতিই নয়, অন্যান্য সময়ে নাগরিকদের আচরণ, এমনকি তাদের রাজনৈতিক বিশ্বাস অনুধাবন করা, ট্র্যাক করার কাজে নিয়মিতভাবেই এ ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহারের অজুহাত যেন না হয়ে ওঠে করোনাভাইরাস।

এই আশঙ্কা মোটেই অমূলক নয়। কেননা প্রতিটি সংকটই রাষ্ট্রকে আরও ক্ষমতাবান করেছে। জনসাধারণকে মনিটরিং করার যে কৌশল একটি কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্র নিয়েছে, তার প্রতি বাছবিচারহীন সমর্থন যেন বিশ্বজুড়ে অন্তহীন জরুরি অবস্থা বহাল রাখার এবং নাগরিকদের জীবনের সর্বক্ষেত্রে অনধিকার প্রবেশের ক্ষমতা রাষ্ট্রের হাতে তুলে না দেয়। নাইন–ইলেভেনের পরে দেশে দেশে তথাকথিত ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’–এর নামে সেই ঘটনা ঘটেছে, কর্তৃত্ববাদী সরকারগুলো এই অজুহাতে তাদের ক্ষমতাকে সম্প্রসারিত করেছে এবং তাদের নিপীড়নমূলক ব্যবস্থাকে স্থায়ী করে তুলেছে। করোনাভাইরাসকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যে তার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। হাঙ্গেরির ভিক্টর ওরবানের সরকার এমন আইনের প্রস্তাব করেছে, যাতে করে অনির্দিষ্টকাল ধরে কেবল ডিক্রি জারি করে তিনি দেশ শাসন করতে পারেন।

এমনকি গণতান্ত্রিক দেশগুলোতেও যে ক্ষমতাসীনেরা এই ধরনের ব্যবস্থা তৈরি করছেন, তার প্রমাণ হচ্ছে ব্রিটেন। ব্রিটেনের পার্লামেন্টে পাস হওয়া করোনাভাইরাস বিল পুলিশ এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে এমন সব ক্ষমতা তুলে দিচ্ছে, যা নাগরিকদের অধিকারের জন্য হুমকি। এগুলোর কবে অবসান হবে, সে বিষয়ে ফাঁকফোকর এত যে তা নিয়ে সংশয়-সন্দেহ তৈরি করে। আমরা জানি যে সব সময় বলা হয় যে এগুলো হচ্ছে সাময়িক ব্যবস্থা, জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য; কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেগুলোই হয়ে ওঠে স্থায়ী, স্বাভাবিক। বাধাহীন ক্ষমতার সঙ্গে যখন যুক্ত হয় ইন্ট্রুসিভ বা অনধিকার প্রবেশমূলক প্রযুক্তি, তখন তা হয়ে ওঠে ভয়াবহ, স্বল্প মেয়াদে এবং ভবিষ্যতের জন্যও।

নতুন বিশ্বব্যবস্থা জন্ম নিচ্ছে?

করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই অনেক বিশ্লেষক বলছেন যে আমরা আর আগের বিশ্বব্যবস্থায় ফিরে যাব না, করোনাভাইরাসের পরের পৃথিবী হবে আগের চেয়ে ভিন্ন। তবে এই প্রক্রিয়ার সূচনা হয়েছিল আগেই। তার মধ্যে আছে ট্রাম্পের একলা চলার নীতি, দেশে দেশে উগ্র জাতীয়তাবাদী চিন্তা বিকাশ, চীনের অর্থনৈতিক উত্থানের পাশাপাশি তার রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব ক্ষীণ হয়ে পড়া, ইউরোপের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের দূরত্ব সৃষ্টি এবং রাশিয়ার বিভিন্ন ধরনের কৌশলী পদক্ষেপ। কিন্তু এসব ঘটনাপ্রবাহ করোনাভাইরাসের কারণে দ্রুততর হয়েছে।

চীন-মার্কিন সম্পর্ক নিয়ে যাঁরা গবেষণা করেন, তাঁরা সেই অবস্থান থেকে বলছেন যে এই সংকটকালে চীন এমন এক ন্যারেটিভ তৈরি করছে, যার লক্ষ্য হচ্ছে নিজেকে বৈশ্বিক নেতৃত্বে স্থাপন। ইতিমধ্যেই চীন এবং রাশিয়া যে এক বিকল্প ব্যবস্থার জন্য অগ্রসর হচ্ছে তার একটি প্রমাণ হচ্ছে ডলারের বাইরে গিয়ে বাণিজ্য স্থানীয় মুদ্রায় করার সিদ্ধান্ত। গত কয়েক বছরের চেষ্টা আরও জোরদার করেছে এই দুই মাসে। অতীতে বিশ্বের সংকটকালে ২০০৮ সালের অর্থনৈতিক সংকট কিংবা ইবোলা ভাইরাসের সংক্রমণ রোধে যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্ব দিয়েছে। কিন্তু এখন এই সংকটে নিজের ঘর সামলাতেই ব্যস্ত যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বমঞ্চের কোথাও নেই।

এক শক্তিকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থা যেমন বিপজ্জনক, তেমনি বিপজ্জনক হচ্ছে নেতৃত্বহীন বিশ্বব্যবস্থা। কিন্তু এই পরিবর্তন কী নতুন ব্যবস্থা বা ‘গ্লোবাল অর্ডার’ তৈরি করবে, নাকি বিশৃঙ্খলা তৈরি করবে, তা আমরা জানি না। এই নতুন বিশ্বব্যবস্থার জন্য একটি প্রস্তাব রেখেছেন সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী গর্ডন ব্রাউন। তিনি প্রস্তাব করেছেন যে করোনাভাইরাস মোকাবিলায় বৈশ্বিকভাবে একটি কাঠামো—গ্লোবাল গভর্ন্যান্স গড়ে তোলার জন্য। তাঁর পরামর্শ হচ্ছে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য এবং জি-২০ সদস্যদের সমন্বয়ে একটি টাস্কফোর্স গড়ে তোলা, যাদের হাতে নির্বাহী ক্ষমতা থাকবে। এই ধরনের কাঠামো যে জবাবদিহিহীন অগণতান্ত্রিক হবে, তা বলাই বাহুল্য। কিন্তু বিশ্বের শক্তিশালী দেশগুলো সেই পথেই অগ্রসর হবে কি না এবং সেখানে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর ভূমিকা কী হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

অর্থনীতির পুনরুদ্ধার: কার জন্য?

করোনাভাইরাসের অর্থনৈতিক প্রতিক্রিয়া যে আগের যেকোনো ধরনের অর্থনৈতিক সংকটের চেয়ে বেশি হবে, সে বিষয়ে কারও মনেই সংশয় নেই। অর্থনৈতিক ধাক্কা মোকাবিলার জন্য প্রতিটি দেশই তাদের নিজেদের মতো করে প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করছে। কোনো কোনো হিসাবে এ জন্য দরকার হবে ১০ ট্রিলিয়ন ডলার। এই সংকটের মাত্রা অভূতপূর্ব; কিন্তু তা সত্ত্বেও এটা নিশ্চিত যে একসময় অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে, কেননা মানুষ থাকবে, এই পৃথিবী ভেঙে পড়বে না।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে এসব প্রণোদনা প্যাকেজ কি এই সংকটে যঁারা সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন, তাঁদের কাজে লাগবে নাকি ২০০৮ সালের সংকটে এলিট করপোরেশনগুলো যেভাবে লাভবান হয়েছিল, তাই ঘটবে? সমাজের সবচেয়ে বঞ্চিত মানুষের জন্য যদি কিছুই করা না হয়, যদি অর্থনীতির সেই পুরোনো প্রক্রিয়াই অব্যাহত থাকে, তবে সংকট কাটানোর চেষ্টা হবে অন্তঃসারশূন্য এবং এর রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়াও হবে ব্যাপক। গত এক দশকে দেশে দেশে রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ওপরে মানুষের আস্থা হ্রাস পেয়েছে, গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে রাজনীতিবিদ এবং রাজনৈতিক প্রক্রিয়া বিষয়ে মানুষের মনে সংশয় তৈরি হয়েছে, সম্পদের কেন্দ্রীকরণ মানুষকে ক্ষুব্ধ করে তুলেছে। সেই পটভূমিকায় যদি অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় কোনো সংস্কার না করা হয়, তবে বিভিন্ন দেশেই অভ্যন্তরীণ সংঘাত বাড়বে, অগণতান্ত্রিক শক্তি এবং ব্যবস্থা জোরদার হবে।

শেষ কথা নয়

করোনাভাইরাস আমাদের চারপাশের পৃথিবীকে কীভাবে বদলে দেবে, সে বিষয়ে শেষ কথা বলার সময় আসতে অনেক বাকি। কিন্তু এ কথাগুলো বলার সময় এখনই যে পৃথিবী বদলে যাওয়ার, বিশ্বব্যবস্থা বদলে যাওয়ার মতো এক ক্রান্তিকালের মধ্য দিয়ে আমরা যাচ্ছি। এই পরিবর্তন ইতিবাচক হবে কি না, তা অধিকাংশ মানুষের বাসযোগ্য পৃথিবী তৈরি করবে কি না, মানবিক নিরাপত্তাকে গুরুত্বপূর্ণ বলে নীতিনির্ধারকদের সামনে নিয়ে আসবে কি না, নাকি তা সবার অধিকারকে সংকুচিত করবে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য আরও দুঃসময় ডেকে আনবে, সেটা নিয়ে আলোচনার সময় এটা। কেননা, এর কোনো পথই পূর্বনির্ধারিত নয়, কোনো কিছুই অবশ্যম্ভাবী নয়।

আলী রীয়াজ: যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর এবং আটলান্টিক কাউন্সিলের অনাবাসিক সিনিয়র ফেলো

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0