মতিঝিলে সোনালী ব্যাংকের চিত্র। ঢাকা, ০১ নভেম্বর
মতিঝিলে সোনালী ব্যাংকের চিত্র। ঢাকা, ০১ নভেম্বরছবি: সাজিদ হোসেন
সামনের শীতে করোনার সংক্রমণ বাড়তে পারে, এমন আশঙ্কায় সরকার ‘নো মাস্ক, নো সার্ভিস’ নীতি বাস্তবায়ন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে

তখন দুপুর সোয়া ১২টা। রাজধানীর নিউ ইস্কাটনের প্রাইম ব্যাংক শাখায় প্রবেশ করতে চাইলে জীবাণুনাশক স্প্রে নিয়ে হাত বাড়িয়ে দিলেন একজন কর্মী। হাতে জীবাণুনাশক দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে দেখা গেল, সেবা নিতে আসা মানুষের উপস্থিতি কম। তবে যাঁরা এসেছেন, সবাই মাস্ক পরা। লেনদেনের কাজ হচ্ছিল দূরত্ব বজায় রেখে।

ব্যাংকটির শাখা ব্যবস্থাপক নজরুল ইসলামের কক্ষে গেলে দেখা গেল দুজন কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে তাঁর সঙ্গে কথা বলছেন।

নজরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, অফিসের সবাইকে বলে দিয়েছেন, যাতে স্বাস্থ্যবিধি কঠোরভাবে মেনে চলা হয়। আর মাস্ক পরা ছাড়া কাউকে যেন ভেতরে ঢুকতে না দেওয়া হয়।

সামনের শীতে করোনার সংক্রমণ বাড়তে পারে, এমন আশঙ্কায় সরকার ‘নো মাস্ক, নো সার্ভিস’ নীতি বাস্তবায়ন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। গত ২৫ অক্টোবর সরকারের পক্ষ থেকে মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানান, মাস্ক ছাড়া এলে কাউকে সরকারি ও বেসরকারি অফিসগুলোতে সেবা দেওয়া হবে না।

বেসরকারি অফিসগুলোয় এই নীতি মানা হচ্ছে কি না, তা দেখতে পরিদর্শন করা হবে।

বিজ্ঞাপন

সরকারের এই সিদ্ধান্তের এক সপ্তাহ পর আজ রোববার সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবসে সরেজমিন দেখা গেছে, অফিসগুলোতে মাস্ক পরায় ইতিবাচক সাড়া থাকলেও গণপরিবহন হিসেবে বাসে ঢিলেঢালা অবস্থা ছিল।

নিউ ইস্কাটনের প্রাইম ব্যাংকের শাখা থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে শিক্ষা ভবন হিসেবে পরিচিত মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরে গিয়ে দেখা গেল, মূল ভবনের প্রবেশপথে একজন আনসার সদস্য আগত ব্যক্তিদের দূর থেকে যন্ত্র দিয়ে শরীরের তাপমাত্রা মেপে ভেতরে প্রবেশ করতে দিচ্ছেন। তবে মাস্ক পরা থাকলেও কেউ কেউ আবার তাপমাত্রা পরিমাপ ছাড়াও ভেতরে ঢুকে পড়ছেন। দোতলা ও তিনতলার বিভিন্ন কক্ষে গিয়ে দেখা গেল, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অধিকাংশের মুখেই মাস্ক আছে। কেউ কেউ থুতনিতে ঝুলিয়ে রাখেন মাস্ক। বিভিন্ন কক্ষের সামনে লিখে রাখা হয়েছে, ‘মাস্ক ছাড়া রুমে প্রবেশ করবেন না।’ এ সময় বেশ কিছুসংখ্যক সেবাগ্রহীতাকে দেখা গেল কোনো কোনো কক্ষে যাচ্ছেন, আবার কাজ শেষে বের হচ্ছেন। তাঁদের মুখে মাস্ক পরা দেখা গেছে।

default-image

উপপরিচালক রুহুল মমিনের কক্ষে উঁকি দিয়ে দেখা গেল, বেশ কয়েকজন বসা। সবার মুখেই মাস্ক পরা।

অবশ্য তিনতলার যে জায়গাটিতে বসার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, সেখানে কেউ কেউ মাস্ক থুতনিতে পরে বসে ছিলেন। দোতলার একটি কক্ষে প্রবেশ করলে একজন কর্মচারী প্রথম আলোকে জানান, সাধারণত এখন আর কেউ মাস্ক ছাড়া আসেন না।

দুপুরের পর প্রশাসনের প্রাণকেন্দ্র সচিবালয়ে অবস্থিত মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে গিয়ে দেখা গেল, প্রায় সবার মুখেই মাস্ক পরা। যাঁরা সেবা নিতে আসছেন, তাঁদেরও প্রায় সবার মুখে মাস্ক। তবে সেখানেও কারও কারও থুতনিতে ছিল মাস্ক।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন কক্ষের সামনে প্রবেশের ক্ষেত্রে সতর্কবার্তা লেখা দেখা গেছে। একটি কক্ষের সামনে লেখা ছিল, ‘করোনাকালীন এ কক্ষে দর্শনার্থী প্রবেশ না করার জন্য ধন্যবাদ’ এবং ‘মাস্ক ব্যতীত প্রবেশ নিষেধ’। আরেকটি কক্ষে লেখা ছিল, ‘করোনাকালীন পরিস্থিতিতে বিনা অনুমতিতে প্রবেশ নিষেধ’। দর্শনার্থীর উপস্থিতি কম ছিল। ফরিদপুর থেকে একজন কলেজশিক্ষক এসেছিলেন তাঁর কাজে। দেখা গেল তাঁর মুখেও মাস্ক।

মিশ্র চিত্র জিপিওতে

এরপর গুলিস্তানে অবস্থিত ডাক বিভাগের প্রধান কার্যালয়ে (জিপিও) গিয়ে দেখা গেল মিশ্র চিত্র। সেখানে সেবা নিতে আসা মানুষের উপস্থিতি বেশি দেখা যায়। ভবনটির নিচতলায় বিভিন্ন কাউন্টারের মাধ্যমে সেবা দেওয়া হয়। সেখানে সেবা নিতে আসা অনেকের মুখে মাস্ক থাকলেও কারও কারও মুখে তা ছিল না। ১১ নম্বর কাউন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন দুই যুবক। তাঁদের একজনের মুখে মাস্ক থাকলেও আরেকজনের ছিল না।

জানতে চাইলে মাস্ক না পরা যুবকটি নাম প্রকাশ করতে চাননি। বললেন তাঁর বাড়ি শরীয়তপুরে। কথা বলতে বলতেই যুবকটি সঙ্গে থাকা ব্যাগ থেকে মাস্ক বের করে মুখে পরলেন। এ সময় কাউন্টারের ভেতরের অংশে থাকা কর্মীটিও নাম বলতে চাননি। বললেন, মাস্ক পরে আসতে বলা হলেও কিছু কিছু মানুষ মাস্ক ছাড়াই আসেন। কিন্তু ‘মানবতার খাতিরে’ ফিরিয়েও দেওয়া যায় না।

বিজ্ঞাপন

পরে আরও কয়েকটি কাউন্টারে দেখা গেল, ভেতরে দায়িত্বরত বেশির ভাগ কর্মীর মুখেই মাস্ক থাকলেও কেউ কেউ ছিলেন মাস্ক পরা ছাড়া। ১৩ নম্বর কাউন্টারের সামনে সেবা নিতে আসা ব্যক্তিদের মুখে মাস্ক পরা থাকলেও সামাজিক দূরত্ব ছিল না।

জিপিও থেকে বেরিয়ে পল্টন মোড়ে অবস্থিত সোনালী ব্যাংকের রমনা করপোরেট শাখার প্রবেশমুখেই দেখা গেল ‘নো মাস্ক, নো সার্ভিস’ লেখা। ভেতরে গিয়ে দেখা গেল, সেখানকার একাধিক কাউন্টারের সামনেও একই ধরনের লেখা। তখন সেবা নিতে আসা ব্যক্তিদের মুখে মাস্ক পরা থাকলেও একটি কাউন্টারের সামনে সামাজিক দূরত্ব বজায় ছিল না। অন্য কাউন্টারে তখন সেবা নিতে আসা মানুষের উপস্থিতি ছিল একেবারেই কম।

বাসে ঢিলেঢালা

বিকেলে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে অন্তত ১০টি বাস পর্যবেক্ষণ দেখা গেছে, বাসে মাস্ক পরায় বেশ ঢিলেঢালা ভাব। যাত্রীদের যেমন কারও কারও মুখে মাস্ক ছিল না, তেমনি বাসের সহকারীদেরও কারও কারও মুখে মাস্ক দেখা যায়নি। মাস্ক পরা ছাড়াও বাসের গেটে দাঁড়িয়ে বাসের সহকারীদের যাত্রীদের ওঠাতে দেখা যায়। অবশ্য কারও থুতনিতে ছিল মাস্ক।

রজনীগন্ধা বাসের পরিদর্শক (চেকার) নয়ন সরকার প্রথম আলোকে বলেন, মাস্ক পরার জন্য বাসের স্টাফদের বলে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু অনেক যাত্রী মাস্ক ছাড়াই বাসে উঠে পড়ছেন। বাজারের অবস্থাও খারাপ। সে জন্য বেশি কিছু বলাও হয় না। কখনো কখনো মাস্ক পরা নিয়ে যাত্রীদের সঙ্গে তর্ক-বিতর্কও হয়।

মন্তব্য পড়ুন 0