default-image

দেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ চূড়ায় (পিক) উঠেছিল গত বছরের জুন–জুলাই মাসে। ওই সময়টায় বিশেষ করে জুনের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে জুলাই মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত প্রতিদিন গড়ে তিন থেকে চার হাজার রোগী শনাক্ত হতো। বেশ কিছুদিন পরিস্থিতি অনেকটা নিয়ন্ত্রণে থাকার পর এক মাসের বেশি সময় ধরে সংক্রমণ আবার ঊর্ধ্বমুখী। এর মধ্যে পাঁচ দিন ধরে সাড়ে তিন হাজারের বেশি রোগী (প্রতিদিন) শনাক্ত হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আরেকটি চূড়ার (পিক) দিকে যাচ্ছে দেশের সংক্রমণ পরিস্থিতি।

গতকাল শনিবার দেশে সংক্রমণের ৫৫তম সপ্তাহ (২১ মার্চ থেকে ২৭ মার্চ) শেষ হয়েছে। এই এক সপ্তাহে নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছে ২৩ হাজার ১০০ জন। এর আগে গত বছরের ১৪ জুন থেকে ৪ জুলাই পর্যন্ত (তিন সপ্তাহ) প্রতি সপ্তাহে ২৩ হাজারের বেশি রোগী শনাক্ত হয়েছিল। প্রায় ৯ মাস পর আবার এক সপ্তাহে ২৩ হাজারের বেশি রোগী শনাক্ত হলো।

জনস্বাস্থ্যবিদেরা মনে করছেন, ইউরোপের অনেক দেশের মতো বাংলাদেশেও করোনার দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হয়েছে। কয়েক দিন ধরে যেভাবে রোগী বাড়ছে, তাতে পরিস্থিতি গত জুন-জুলাইয়ের চেয়ে খারাপ হওয়ার আশঙ্কা আছে।

দেশে এখন করোনা রোগীর পাশাপাশি মৃত্যুও বাড়ছে। গতকাল শেষ হওয়া সপ্তাহে ২০১ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর আগে সপ্তাহে (১৪ মার্চ থেকে ২০ মার্চ) ২০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছিল সর্বশেষ গত বছরের সেপ্টেম্বরে। গতকাল শেষ হওয়া সপ্তাহে এর আগের সপ্তাহের তুলনায় মৃত্যু বেড়েছে ৪২ দশমিক ৫৫ শতাংশ আর রোগী বেড়েছে ৮৫ শতাংশ।

বিজ্ঞাপন

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, কোনো দেশে সংক্রমণ শনাক্তের হার টানা দুই সপ্তাহের বেশি ৫ শতাংশের নিচে থাকলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে বলে ধরা যায়। গত জানুয়ারির মাঝামাঝি থেকে টানা সাত সপ্তাহ শনাক্তের হার ৫ শতাংশের নিচে ছিল। আর তিন সপ্তাহ ধরে তা ৫ শতাংশের ওপরে। এর মধ্যে গতকাল শেষ হওয়া সপ্তাহে রোগী শনাক্তের হার ছিল প্রায় ১৩ শতাংশ।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, কয়েক দিন ধরে দৈনিক যে নমুনা পরীক্ষা করা হচ্ছে, তার একটি বড় অংশ বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠান ঘিরে। অনুষ্ঠানে যাঁরা যোগ দিয়েছেন, তাঁদের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। এর বাইরে আছেন অনেক বিদেশগামী যাত্রী। এ দুই ক্ষেত্রে যাঁদের নমুনা পরীক্ষা করা হচ্ছে, তাঁদের মূলত কোনো লক্ষণ-উপসর্গ নেই। তাঁরা আক্রান্ত নন, এটা নিশ্চিত করতেই পরীক্ষা করা হচ্ছে। এ অংশ বাদ দিলে রোগী শনাক্তের হার আরও বাড়বে।

২০১৯ সালের শেষ দিকে চীনের উহানে প্রথম করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ধরা পড়ে। ক্রমে তা ছড়িয়ে পড়ে সারা বিশ্বে। বাংলাদেশে প্রথম সংক্রমণ শনাক্তের ঘোষণা দেওয়া হয় গত বছরের ৮ মার্চ। এর ১০ দিনের মাথায় প্রথম মৃত্যুর খবর জানানো হয়। শুরুর দিকে সংক্রমণ ও মৃত্যু কম থাকলেও মে মাসের শেষ দিক থেকে ক্রমে পরিস্থিতি খারাপ হতে শুরু করে। আগস্ট থেকে সংক্রমণে দুই দফা ওঠানামা দেখা যায়। গত বছরের শেষ দিক থেকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি পর্যন্ত সংক্রমণ অনেকটা নিয়ন্ত্রণে ছিল। এরপর থেকে আবার নতুন রোগী বাড়তে শুরু করে। তবে প্রথম দিকে বৃদ্ধির হার ছিল খুব সামান্য। ১০ মার্চ থেকে দৈনিক শনাক্ত আবার হাজার ছাড়ায়।

default-image

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত শুক্রবার সকাল আটটা থেকে গতকাল শনিবার সকাল আটটা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় দেশে ৩ হাজার ৬৭৪ জন রোগী শনাক্ত হয়েছে। এই সময়ে নমুনা পরীক্ষা করা হয় ২৪ হাজার ৬৬৪টি। পরীক্ষার তুলনায় রোগী শনাক্তে হার ১৪ দশমিক ৯০ শতাংশ। গত ২৪ ঘণ্টায় করোনায় আক্রান্ত আরও ৩৯ জনের মৃত্যু হয়েছে।

সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) পরামর্শক মুশতাক হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, প্রথম দফায় করোনার ঢেউ ছিল ‘ঢালু’। এবার ‘খাড়াভাবে’ ঢেউ উঠছে। তিন সপ্তাহ ধরে যেভাবে রোগী বাড়ছে, তা প্রশমন করা না গেলে জুন–জুলাইয়ের পরিস্থিতিকে ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে। তিনি বলেন, গত নভেম্বরে সংক্রমণ বৃদ্ধির একটি লক্ষণ দেখা গিয়েছিল। তখন সামগ্রিকভাবে নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল, যার ফলও এসেছিল। এবার এখন পর্যন্ত যথেষ্ট কার্যকর ব্যবস্থা দেখা যাচ্ছে না। আক্রান্ত রোগীদের চিহ্নিত করে বিচ্ছিন্ন রাখা, তাঁদের সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের কোয়ারেন্টিনে (সঙ্গনিরোধ) নেওয়া খুবই জরুরি। স্বাস্থ্যবিধি প্রতিপালন নিশ্চিত করার পাশাপাশি বদ্ধ জায়গায় সামাজিক, রাজনৈতিক, ধর্মীয় জমায়েতের মতো অনুষ্ঠানে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে হবে। প্যারেড গ্রাউন্ডে যেভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে অনুষ্ঠান হয়েছে, এ ধরনের আয়োজনের জন্য এটি একটি উদাহরণ হতে পারে।

বিজ্ঞাপন
করোনাভাইরাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন