বিজ্ঞাপন

গত বছর দেশে ঈদুল ফিতরের পরপরই করোনাভাইরাসের সংক্রমণে বড় লাফ দেখা দিয়েছিল। স্বাস্থ্যবিধি না মানায় এবারও একই পরিস্থিতি দেখা দিতে পারে। জনস্বাস্থ্যবিদেরা বলছেন, নমুনা পরীক্ষার বিপরীতে রোগী শনাক্তের হারে যে নিম্নমুখী প্রবণতা ছিল, তা একটা পর্যায়ে এসে ইতিমধ্যে থমকে গেছে। গত পাঁচ দিনে খুব সামান্য হলেও রোগী শনাক্তের হার বাড়তে দেখা গেছে।

গত মার্চ থেকে শুরু হওয়া সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকে নিম্নমুখী হতে শুরু করে। ১৬ এপ্রিল থেকে প্রায় প্রতিদিন রোগী শনাক্তের হার কমতে দেখা গেছে। এই প্রবণতা ছিল ৬ মে পর্যন্ত। এরপর তাতে ছেদ পড়েছে। সর্বশেষ পাঁচ দিনে (৭–১১ মে) মোট পরীক্ষার বিপরীতে রোগী শনাক্তের হার ছিল ৮ দশমিক ৯০ শতাংশ। আর তার আগের পাঁচ দিনে (২–৬ মে) শনাক্তের হার ছিল ৮ দশমিক ৮০ শতাংশ।

default-image

জনস্বাস্থ্যবিদ আবু জামিল ফয়সাল প্রথম আলোকে বলেন, এখন যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে তাতে লকডাউনের যে সুফল পাওয়া যাচ্ছিল, তা বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে পড়ে গেল। আগামী দুই–তিন সপ্তাহের মধ্যে সংক্রমণ বেড়ে যাবে। এর মধ্যে দেশে ভারতীয় ভেরিয়েন্ট পাওয়া গেছে। সব মিলিয়ে ঈদের পর একটি সাংঘাতিক সমস্যা দেখা দিতে পারে।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টানা দীর্ঘদিন লকডাউন চালানো সম্ভব নয়। সে ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করা এবং রোগী শনাক্ত করে আইসোলেশন (বিচ্ছিন্ন রাখা), রোগীর সংস্পর্শে আসাদের কোয়ারেন্টিনে (সঙ্গনিরোধ) রাখা এবং সীমান্ত এলাকায় কড়াকড়ি নিশ্চিত করা জরুরি।

গত বছরের ৮ মার্চ দেশে প্রথম করোনাভাইরাসের সংক্রমণের কথা জানানো হয়। সংক্রমণ ঠেকাতে ওই বছরের ২৬ মার্চ থেকে টানা ৬৬ দিন দেশজুড়ে সাধারণ ছুটি ছিল। তখন সব ধরনের যোগাযোগব্যবস্থা, ব্যবসা, বাণিজ্য, কলকারখানা বন্ধ করে অনেকটা ‘লকডাউন’ পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছিল। তবে ছুটি চলাকালে গত বছরের ২৬ এপ্রিল থেকে পোশাক কারখানা এবং ইফতারি বিক্রির দোকান খুলে দেওয়া হয়। এর ঠিক দুই সপ্তাহ পর সংক্রমণের দশম সপ্তাহ (১০–১৬ মে, ২০২০) থেকে পরিস্থিতির অবনতি হতে শুরু করে।

সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, দ্বিতীয় ঢেউয়ে আক্রান্তদের ৬১ শতাংশ হয় বাজারে গেছেন নয়তো গণপরিবহন ব্যবহার করেছেন। এই দুটি স্থান সংক্রমণের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। ‘লকডাউন’ শিথিল হওয়ার পর এই দুটি জায়গাতেই মানুষের ভিড় বেশি দেখা যাচ্ছে।

গত বছরের ২৫ মে ছিল পবিত্র ঈদুল ফিতর। তার আগে ১০ মে থেকে কেনাকাটার জন্য শপিং মল খুলে দেওয়া হয়। প্রচুর মানুষ গ্রামে যাতায়াত করে। গত ঈদুল ফিতরের দিন প্রথম রোগী শনাক্তের হার ২০ শতাংশ ছাড়ায়। ওই সময় থেকে সংক্রমণের প্রথম ঢেউয়ের ‘পিক’ শুরু হয়। ঈদের সপ্তাহ দুয়েক পরে সংক্রমণে আরেকটি লাফ দেখা গিয়েছিল, দৈনিক শনাক্ত রোগীর সংখ্যা গড়ে তিন হাজারের ওপরে চলে যায়। পরীক্ষার তুলনায় শনাক্তের হারও আগের চেয়ে বাড়তে শুরু করে। আগস্টের তৃতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত শনাক্তের হার ২০ শতাংশের ওপরে ছিল। এরপর তা কমতে থাকে। ডিসেম্বরের মাঝামাঝি থেকে সংক্রমণ পরিস্থিতি অনেকটা নিয়ন্ত্রণে ছিল।

চলতি বছরের মার্চ থেকে দেখা দেয় সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ। মার্চের শেষ দিক থেকে এপ্রিলের প্রথম দিকে সংক্রমণ তীব্র আকার ধারণ করেছিল। এ সময় প্রতিদিন সাত হাজারের বেশি নতুন রোগী শনাক্ত হতে থাকে। একপর্যায়ে দৈনিক মৃত্যু চলে যায় শতকের ওপরে। দ্বিতীয় ঢেউ সামলাতে ৫ এপ্রিল থেকে ‘লকডাউন’ দেয় সরকার। এর এক সপ্তাহ পর থেকে দেওয়া হয় ‘সর্বাত্মক লকডাউন’। এর প্রভাবে এপ্রিলের মাঝামাঝি সময় থেকে সংক্রমণে নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা দেয়। চলতি মে মাসের প্রথম দিন থেকে রোগী শনাক্তের হার ১০ শতাংশের নিচে নেমে আসে। এর মধ্যে ২৫ এপ্রিল থেকে শপিং মল খুলে দেওয়া হয়েছে। ৬ মে থেকে চালু হয়েছে গণপরিবহন। আর ৭ মে থেকে সংক্রমণের নিম্নমুখী প্রবণতায় ছেদ পড়েছে।

default-image

কয়েক দিন ধরে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় কেনাকাটার জন্য বিপণিবিতান, মার্কেটগুলোতে ব্যাপক লোকসমাগম দেখা যাচ্ছে। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ ঢাকা ছাড়ছেন গাদাগাদি করে। বিশেষ করে দক্ষিণাঞ্চলে যাওয়ার দুই ফেরি পথে উপচে পড়া ভিড় দেখা যাচ্ছে। এখানে স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। কিছুদিনের মধ্যে সংক্রমণরেখায় এর প্রভাব দেখা যাওয়ার শঙ্কা আছে।

গতকাল এক অনলাইন ব্রিফিংয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম বলেন, ঈদ উৎসবকে কেন্দ্র করে জনসমাগম এবং মানুষের চলাচল যেভাবে বেড়েছে তাতে তাঁরা অত্যন্ত শঙ্কিত। এমন চলাচল ও জনসমাগমের কারণে দ্বিতীয় ঢেউ কমিয়ে আনতে আনতে তৃতীয় ঢেউ শুরু হয়ে যাবে। আবার তৃতীয় ঢেউ কমাতে কমাতে সামনে আসবে কোরবানির ঈদ। তখনো এভাবে চলাচল করতে থাকলে, এটার শেষ হবে না। তিনি বলেন, ‘আমরা যদি নিজেদের সর্বনাশ নিজেরাই ডেকে আনি, তাহলে পরিত্রাণ পাওয়া মুশকিল।’

default-image

সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, দ্বিতীয় ঢেউয়ে আক্রান্তদের ৬১ শতাংশ হয় বাজারে গেছেন নয়তো গণপরিবহন ব্যবহার করেছেন। এই দুটি স্থান সংক্রমণের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। ‘লকডাউন’ শিথিল হওয়ার পর এই দুটি জায়গাতেই মানুষের ভিড় বেশি দেখা যাচ্ছে।

আইইডিসিআরের উপদেষ্টা মুশতাক হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, পশ্চিমা দেশগুলোতে ক্রিসমাসের পর দ্বিতীয় ঢেউ দেখা দিয়েছিল। কারণ, সে সময় লোকসমাগম বেশি হয়েছিল। ঈদের কেনাকাটার জন্য বিপণিবিতানে ভিড় বেড়েছে, ফেরিতেও মানুষের উপচে পড়া ভিড়। এসব জায়গায় স্বাস্থ্যবিধি মানা হচ্ছে না। এর ফল হতে পারে ঈদের সপ্তাহখানেকের মধ্যে সংক্রমণ এবং এর তিন সপ্তাহের মধ্যে মৃত্যু বেড়ে যেতে পারে।

ঈদের জামাত অবশ্যই খোলা জায়গায় এবং দূরত্ব মেনে যেন হয় তা নিশ্চিত করার পরামর্শ দিয়েছেন আইইডিসিআরের উপদেষ্টা মুশতাক হোসেন। তিনি বলেন, কঠোরতা বা আইন দিয়ে সব সময় সবকিছু হয় না। একটি সহযোগিতামূলক দৃষ্টিভঙ্গি নিতে হবে। মানুষের আচরণ পরিবর্তনে কাজ করতে হবে।

করোনাভাইরাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন