এখনো পরিস্থিতি ঝুঁকিপূর্ণ

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা আবার বাড়ছে। জ্বর, ঠান্ডা, কাশি উপসর্গ নিয়ে করোনা শনাক্তকরণ কেন্দ্রে নমুনা দিতে ভিড়ও আগের চেয়ে বেড়েছে। নমুনা দিতে আসা ব্যক্তিরা মানছেন না সামাজিক দূরত্ব। গতকাল সকালে নারায়ণগঞ্জের ৩০০ শয্যাবিশিষ্ট খানপুর হাসপাতালে
ছবি: দিনার মাহমুদ

দেশে করোনার সংক্রমণ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় স্থিতিশীল রয়েছে। এক মাস সংক্রমণের হার একই রকম আছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতিতে আত্মতুষ্টিতে ভোগার সুযোগ নেই। যেকোনো সময় সংক্রমণ বেড়ে যেতে পারে। শীতকালে ঝুঁকি বাড়ার আশঙ্কাও করছেন কেউ কেউ।

গতকাল সোমবার করোনার সংক্রমণের সর্বশেষ বিশ্লেষণের তথ্য তুলে ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক শাফিউন শিমুল প্রথম আলোকে বলেন, ‘দেশে সংক্রমণ পরিস্থিতি শেষের দিকে, এটা ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। গত এক মাস সংক্রমণ পরিস্থিতি স্থিতিশীল আছে। এই পরিস্থিতি ঝুঁকিপূর্ণ। যেকোনো সময় সংক্রমণ বেড়ে যেতে পারে।’

শাফিউন শিমুল গত এপ্রিল থেকে সংক্রমণ পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করছেন। তিনি বলেন, ‘গত ছয় মাসের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে সংক্রমণ হার দশমিক ৮৩।’ এর অর্থ ১০০ আক্রান্ত মানুষ নতুন করে ৮৩ জনকে সংক্রমিত করছে।

সংক্রমণের পাশাপাশি মৃত্যুর তথ্য বিশ্লেষণ করেও পরিসংখ্যানবিদেরা সংক্রমণের হার অনুমান করতে পারেন। এই হিসাবে সংক্রমণের হার দশমিক ৮১ বলে জানিয়েছেন শাফিউন শিমুল। অর্থাৎ ১০০ সংক্রমিত মানুষের মাধ্যমে ৮১ জন সংক্রমিত হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘দুই ধরনের মডেল ব্যবহার করে দেখা যাচ্ছে, এক মাসের কিছু বেশি সময় সংক্রমণ হার দশমিক ৮ বা আটের কাছাকাছি আছে।’

সরকার সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের কাজ অনেকটাই গুটিয়ে নিচ্ছে। চলাচলের ওপর যেসব বিধিনিষেধ ছিল, গতকাল তা শেষ হয়েছে। আজ থেকে গণপরিবহন আগের মতোই চলবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা ছাড়া সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আর বড় কোনো কাজ মাঠপর্যায়ে নেই। অনেকেই স্বাস্থ্যবিধি মানছে না। মাস্ক না পরেই বহু মানুষ ঘরের বাইরে বের হচ্ছেন। রাস্তাঘাটে, হাটবাজারে, অফিস–আদালতে সামাজিক দূরত্ব বজায় থাকছে না। এসব বিষয়ে মানুষকে সচেতন করার কাজ চোখে পড়ে না।

শুরুর দিকে করোনাভাইরাস নিয়ে মানুষের মধ্যে যে ভয়ভীতি ছিল, এখন তা আর নেই বলেই বিশেষজ্ঞরা মনে করেছেন। মানুষ অনেকটা বেপরোয়াভাবে চলাফেরা করছেন। মানুষের এই ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ সংক্রমণ বাড়িয়ে দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি করছে।

সুনির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক তথ্য না থাকলেও অনেকেই আশঙ্কা করছেন, শীতকালের আবহাওয়ায় বাংলাদেশে সংক্রমণ বেড়ে যেতে পারে। ২৮ আগস্ট পাবলিক হেলথ অ্যাডভাইজারি কমিটির সদস্যদের সঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালকের বৈঠকে নতুন এই ঝুঁকি বিষয়ে আলোচনা হয়। পরদিন ২৯ আগস্ট চিকিৎসা ও জনস্বাস্থ্য সাময়িকী ল্যানসেট বাংলাদেশের ওপর এক প্রতিবেদনেও শীতকালে সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ার এই আশঙ্কার কথা আছে।

গত ৮ মার্চ মাসে দেশে প্রথম করোনায় সংক্রমণের তথ্য নিশ্চিত করে সরকার। তবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বা অধিদপ্তরের অধীন কোনো প্রতিষ্ঠান এ পর্যন্ত সংক্রমণের হার নিয়ে বিজ্ঞানভিত্তিক কোনো তথ্য বা পরিসংখ্যান জনসমক্ষে হাজির করতে পারেনি। ১৫ আগস্ট রাজধানীর বিসিপিএস মিলনায়তনে জাতীয় শোক দিবসের অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেছিলেন, করোনা দেশ থেকে বিদায় নেওয়ার পথে। আক্রান্ত বিবেচনায় করোনায় মৃত্যুহার দেশে অনেক কম। টিকা ছাড়াই দেশ এখন স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরার পথে বলে মন্তব্য করেছিলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।

তবে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর এই দাবি বস্তুনিষ্ঠ না বলে মনে করেন জনস্বাস্থ্যবিদ ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক বে-নজির আহমেদ। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘সংক্রমণ ঝুঁকিহীন পরিস্থিতিতে পৌঁছেছে বা মহামারি শেষ হওয়ার পথে, এমন কোনো বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না।’

কিছু ক্ষেত্রে সংক্রমণ বাড়ছে
সংক্রমণ স্থিতাবস্থায় আছে বা কিছু ক্ষেত্রে বাড়ছে, এমন আলামতও দেখা যাচ্ছে। গত এক সপ্তাহে মৃত্যু বেশি হতে দেখা গেছে। এ সময়ে হাসপাতালে রোগী ভর্তির পরিমাণও বেড়েছে।

নমুনা পরীক্ষার বিবেচনায় শনাক্তের হার কমছে, এমন নজির দেখা যাচ্ছে সরকারি তথ্যে। গতকাল সোমবার ১২ হাজার ৪৫৪টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষায় ২ হাজার ১৭৪ জনের কোভিড শনাক্ত হয়। আর মারা গেছেন ৩৩ জন। পরীক্ষার বিবেচনায় রোগী শনাক্তের হার ১৭ দশমিক ৪৩। ২২ আগস্ট থেকে প্রতিদিন শনাক্তের হার ২০ শতাংশের নিচে আছে।

শাফিউল শিমুল বলেন, সরকারের এই তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যাচ্ছে সংক্রমণের হার দশমিক ৬১। অর্থাৎ ১০০ জন আক্রান্ত মানুষের মাধ্যমে নতুন করে ৬১ জন মানুষ সংক্রমিত হচ্ছেন।

তবে সরকারের নমুনা পরীক্ষার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে নানা প্রশ্ন ও সন্দেহ আছে। দেশে জনসংখ্যার তুলনায় পরীক্ষা হচ্ছে কম। ৩৯টি জেলায় কোনো পরীক্ষাকেন্দ্র নেই। এসব জেলার বাসিন্দাদের পরীক্ষার জন্য নানা দুর্ভোগ পোহাতে হয়। পরীক্ষার ফলাফল পেতে মানুষকে এক সপ্তাহের বেশি অপেক্ষা করতে হয়েছে, এমন বহু নজির আছে।

পরীক্ষায় ফলাফলে ভুল হয়েছে, এমন অভিযোগও পাওয়া গেছে। এ ছাড়া জাল সনদ দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। সব মিলে পরীক্ষাপদ্ধতি ও ব্যবস্থাপনার ওপর বিশেষজ্ঞ ও সাধারণ মানুষ কারও আস্থা নেই। তাই পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে সরকার সংক্রমণের যে তথ্য দিয়ে চলেছে, তার গ্রহণযোগ্যতা কম।

আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি) সরকারি ব্যবস্থায় সংগ্রহ করা নমুনা পরীক্ষার পাশাপাশি নির্ধারিত ফি নিয়ে নমুনা পরীক্ষা করছে। আইসিডিডিআরবির সূত্র বলছে, রাজবাড়ী ও ফরিদপুর থেকে আসা নমুনা পরীক্ষায় দেখা যাচ্ছে সংক্রমণ কমছে না। ফির বিনিময়ে যে পরীক্ষা করা হচ্ছে, তাতেও সংক্রমণ কম দেখা যাচ্ছে না।

অন্যদিকে বেশ কয়েকটি জেলায় সংক্রমণ বাড়ছে বলে সরকারি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক মীরজাদী সেব্রিনা প্রথম আলোকে বলেন, ‘সার্বিকভাবে পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে। যদিও গত সপ্তাহে রাজবাড়ী, শরীয়তপুর, চুয়াডাঙ্গাসহ উত্তরবঙ্গের কয়েকটি জেলায় সংক্রমণ বাড়তে দেখা গেছে।’

পরিস্থিতির এমন উন্নতিকে স্থায়ী ধরে নেওয়া ঠিক হবে না বলে মন্তব্য করেছেন মীরজাদী সেব্রিনা। তিনি বলেন, ‘সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে দক্ষিণ কোরিয়াকে সফল দেশ হিসেবে ভাবা হয়েছিল। কিন্তু এখন সেখানে নতুন সংক্রমণ দেখা যাচ্ছে।

আরও একাধিক দেশে দ্বিতীয় দফায় সংক্রমণ বাড়তে দেখা গেছে। সুতরাং আমাদেরও সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম চালিয়ে যেতে হবে।’

এ পরিস্থিতিতে সংক্রমণ মোকাবিলায় ছয়টি কাজ অব্যাহত রাখতে হবে বলে মনে করেন জনস্বাস্থ্যবিদ অধ্যাপক বে-নজির আহমেদ। তিনি বলেন, ‘সরকার তথা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে রোগী অনুসন্ধান, পরীক্ষা, আইসোলেশন (বিচ্ছিন্নকরণ), কোয়ারেন্টিন (সঙ্গনিরোধ), চলাচল সীমিতকরণ এবং সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ—এই ছয়টি কাজ অব্যাহত রাখতে হবে। অন্যদিকে মানুষকে অপ্রয়োজনে ঘরের বাইরে আসা থেকে বিরত থাকতে হবে। পাশাপাশি মাস্ক পরা, সাবান–পানি দিয়ে হাত ধোয়া ও সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার বিধি মেনে চলতে হবে।’