প্রথম দিকে কেন শিশুদের করোনা হতো না

করোনাভাইরাসের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর স্পাইক প্রোটিন। এটা ভাইরাসের চারপাশে আঁকশির মতো ছড়ানো থাকে। করোনাভাইরাস কাউকে সংক্রমিত করতে তখনই সফল হয়, যখন তার আঁকশিগুলো শ্বাসতন্ত্রের দেহকোষের বাইরের আবরণের এসিই-২ রিসেপ্টর পেঁচিয়ে ধরে কোষের ভেতর ঢুকে তার নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করতে পারে। এরপর ভাইরাস অনায়াসে তার বংশ বিস্তার করতে থাকে। কিন্তু সেই রিসেপ্টর না থাকলে ভাইরাস দেহকোষের ভেতরে ঢুকতে না পেরে বিনষ্ট হয়ে যায়।

যেহেতু শিশুদের শ্বাসতন্ত্রের ভেতরের দিকের কোষে (সেল) এই এসিই-২ রিসেপ্টরগুলো প্রায় থাকেই না, তাই শিশুদের করোনায় আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা ছিল খুবই কম। তবে তাদের নাক, মুখ ও গলায় এই রিসেপ্টর সাধারণভাবেই বেশি থাকে। তাই তাদের সংক্রমণ সাধারণত শ্বাসতন্ত্রের ওপরের দিকেই কিছুটা হয়, কিন্তু ফুসফুস পর্যন্ত যেতে পারে না। কারণ, আগেই বলেছি, সেখানে তো রিসেপ্টর প্রায় থাকেই না।

এটা ঠিক যে শিশুরা মাঝেমধ্যেই সর্দি-কাশি–জ্বরে ভোগে। এগুলো হয়তো ভিন্ন ধরনের করোনাভাইরাসের অসুখ। এসব ভাইরাসের অ্যান্টিবডি শিশুদের শরীরে থাকে, ওগুলোই হয়তো কোভিড-১৯–এর বিরুদ্ধে সক্রিয় প্রতিরোধ সৃষ্টি করে। লন্ডনের ফ্রান্সিস ক্রিক ইনস্টিটিউটের গবেষকেরা এই সিদ্ধান্তে এসেছেন, শিশু এবং কিশোর-তরুণদের অনেকের কোভিড–১৯ রোগ প্রতিরোধী ক্ষমতা রয়েছে।

সায়েন্স ম্যাগাজিনে বছর দুয়েক আগে প্রকাশিত এক নিবন্ধে গবেষকেরা বলেছেন, মাত্র ৫ শতাংশ পূর্ণবয়স্কের এ ধরনের রোগ প্রতিরোধী ক্ষমতা রয়েছে, কিন্তু শিশুদের ৪৩ শতাংশ রোগ প্রতিরোধী। যাদের রক্ত কোভিড-১৯ অতিমারির আগে সংগৃহীত হয়েছিল, তাদের রক্তে এই নতুন করোনাভাইরাসের অ্যান্টিবডি থাকবে না বলে বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা ছিল। কিন্তু তারা দেখলেন, শিশু ও পূর্ণবয়স্কদের কারও কারও নতুন করোনাভাইরাস প্রতিরোধী অন্তত একটি গুণসম্পন্ন অ্যান্টিবডি রয়েছে। এই অ্যান্টিবডি করোনাভাইরাসের স্পাইকের সঙ্গে যুক্ত হয়। ফলে ভাইরাস রক্তের সেলে ঢুকতে পারে না।

তা ছাড়া শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার বিশেষ একটি বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা তাদের রক্ষা করে। এখানে তাদের টি-সেল বিশেষ ভূমিকা পালন করে। টি-সেল হলো রক্তের একধরনের শ্বেতকণিকা, যা দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার অংশ। টি-সেল দেহের বোনম্যারো থেকে উৎপন্ন হয় এবং থাইমাস গ্ল্যান্ডে পরিপূর্ণতা লাভ করে। শিশুদের থাইমাস গ্ল্যান্ডগুলো খুব সক্রিয়। যেহেতু শিশুরা দ্রুত টি-সেল উৎপাদন করতে পারে, তাই ভাইরাস শিশুদের টি-সেল ধ্বংসের আগেই শিশুদের দ্রুতগতিতে উৎপন্ন টি-সেল ভাইরাস ধ্বংস করতে পারে।

তাহলে এখন কেন শিশুরাও আক্রান্ত হচ্ছে

সম্প্রতি একটি টিভি আলোচনায় বিশিষ্ট টিকা বিশেষজ্ঞ ডা. তাজুল এ বারি বলেছেন, ‘আমরা যে টিকা ব্যবহার করছি, তা মূলত সেই ২০১৯ সালে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া আদি কোভিড–১৯ ভাইরাসের বিরুদ্ধে কার্যকর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সৃষ্টি করে। কিন্তু এরপর দ্রুতই কোভিডের রূপান্তর ঘটতে থাকে। অর্থাৎ কোভিডের নতুন নতুন ধরন সৃষ্টি হয়। যেমন আলফা, বিটা, গামা, ডেলটা, অমিক্রন এবং এর বিভিন্ন উপধরন, বিশেষত বিএ.৪ ও বিএ.৫ ভাইরাস দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। এর বিপরীতে প্রচলিত টিকা এসব নতুন ধরন রোধে যথেষ্ট কার্যকর নয়। তাই দরকার হাইব্রিড টিকা, যা কোভিডের সাম্প্রতিক ধরনগুলোর বিরুদ্ধেও দেহে অ্যান্টিবডি তৈরি করবে। এ ধরনের তিনটি টিকা এখন প্রায় তৈরি। হয়তো শিগগিরই বাজারে আসবে। এর আগে অমিক্রনের এসব ধরন ও উপধরনের বিরুদ্ধে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তোলার জন্য এখন থেকেই শিশুদের টিকা দেওয়ার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। তবে তাদের টিকা বড়দের টিকার চেয়ে একটু আলাদা এবং এর মাত্রাও কম।

করোনাভাইরাস অবিরাম রূপান্তর ঘটার প্রক্রিয়ায় এমন অবস্থানে এসেছে যে শিশুরাও আর আগের মতো করোনাভাইরাস প্রতিহত করতে পরছে না। বিশেষভাবে বিএ.৪ ও বিএ.৫—এ দুটি ধরন মারাত্মক। এদের স্পাইক প্রোটিন খুব সহজেই সেলের ভেতর ঢুকে পড়তে পারে। এর ফলে এরা দ্রুত তাদের বংশ বিস্তার করে এবং সহজেই ভাইরাসটি টিকে থাকার যোগ্যতা অর্জন করে। তবে সহজে বংশবিস্তারের এই যোগ্যতা অর্জন করার বিপরীতে করোনাভাইরাসকে তাদের অপর একটি বৈশিষ্ট্য হারাতে হয়েছে। সেটা হলো তাদের সংক্রমণের তীব্রতা। এখন করোনা খুব সহজে আক্রান্ত করতে পারে বটে, কিন্তু এর উপসর্গ প্রায় থাকেই না। সামান্য সর্দি–কাশি। দুয়েক দিন গলাব্যথা। এরপর হয়তো পাঁচ দিনেই করোনা নেগেটিভ।

তবে যাদের আগে থেকেই শ্বাসতন্ত্রের সমস্যা থাকে, দুর্বল ফুসফুস বা হৃদ্‌যন্ত্রের রোগ থাকে, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, কিডনি–লিভারের সমস্যা থাকে, তাদের জন্য সংক্রমণ তীব্র হতে পারে। করোনার নতুন ধরন শিশু থেকে প্রবীণ—সবাইকে আক্রান্ত করলেও হয়তো তাদের সবাইকে হাসপাতালে যেতে হয় না। মৃত্যুর হারও কম।

লেখক: আব্দুল কাইয়ুম, সহযোগী সম্পাদক, প্রথম আলো এবং মাসিক ম্যাগাজিন বিজ্ঞানচিন্তার সম্পাদক

করোনাভাইরাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন