default-image

৩২ বছর বয়সী চিকিৎসক সিফা তাসনিম। তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কাজ করছেন। গেল এক বছরে তিনি তিনবার করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। শেষবার তাঁর সঙ্গে পরিবারের পাঁচ সদস্যও আক্রান্ত হয়েছেন। তবু তিনি হাল ছাড়েননি। নিজের দায়িত্ব ছেড়ে যাননি।

২২ দিন ধরে সিফা তাসনিম নিজ বাসায় আইসোলেশনে আছেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘গেল বছরের করোনা সংক্রমণের শুরু থেকে কাজ করছি। বাসার সবাই দুশ্চিন্তা করত। এখনো করে। করোনা পরীক্ষায় নেগেটিভ এলেই আবার কাজে ফিরব।’
করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার পর খুব কাছের মানুষগুলোও যখন চলে যায়, তখন পাশে থাকেন চিকিৎসকেরা। গত এক বছরে হাসপাতালগুলোয় তাঁরা দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নিজেরা আক্রান্ত হয়েছেন, পরিবারকেও আক্রান্ত করেছেন। তবু দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়াননি চিকিৎসকেরা। অন্যকে বাঁচাতে গিয়ে অনেকে মারাও গেছেন। চিকিৎসকদের মৃত্যুতালিকার সেই সংখ্যা এখন দাঁড়িয়েছে ১৩৯।

করোনাকালে বেশির ভাগ মানুষ যখন ঘরবন্দী, তখন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিরামহীন রোগীদের সেবা দিয়ে গেছেন চিকিৎসকেরা। গত বছরে করোনাভাইরাস সংক্রমণের প্রথম দিকে হাসপাতালগুলোয় পর্যাপ্ত সুরক্ষাব্যবস্থা ছিল না। সে সময় দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে একের পর এক চিকিৎসক আক্রান্ত হয়েছেন, মারা গেছেন।

বিজ্ঞাপন

দেশে করোনায় প্রথম চিকিৎসকের মৃত্যু হয়েছিল গত বছরের ১৫ এপ্রিল। সেদিন মারা গিয়েছিলেন সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মঈন উদ্দীন আহমদ (৪৭)। মঈন উদ্দীন আহমেদ করোনায় আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা করতে গিয়েই সংক্রমিত হয়েছিলেন। ঢাকার একটি হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর মৃত্যুর খবরে চিকিৎসক সমাজসহ সব পেশাজীবী শ্রেণি ও সাধারণ মানুষের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে আসে।

গত বছরের জুন মাসটি ছিল চিকিৎসক ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের জন্য দুঃসহ। জুনে প্রতিদিনই দেশের কোনো না কোনো এলাকা থেকে আসত চিকিৎসকের মৃত্যুর খবর। বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএর) তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালের জুনে মারা গেছেন ৪৫ জন চিকিৎসক। সবচেয়ে বেশি চিকিৎসকের মৃত্যু হয়েছে গত ৪ জুন, ওই দিন পাঁচজন চিকিৎসক মারা যান, যা এক দিনে সর্বোচ্চসংখ্যক চিকিৎসকের মৃত্যুর ঘটনা।

গত বছরের সেপ্টেম্বরের পর থেকে চিকিৎসকদের মৃত্যুর হার অবশ্য কিছুটা কমে। তবে তা এ বছরের এপ্রিলে এসে আবার তা বেড়ে যায়। এ বছরের জানুয়ারিতে করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান তিন চিকিৎসক। ফেব্রুয়ারিতে মারা যান একজন। মার্চে মারা যান তিনজন। আর এপ্রিলের প্রথম ১৩ দিনেই করোনাভাইরাসের সংক্রমণে মারা যান আট চিকিৎসক।

করোনা সংক্রমণের শুরুতে ও গেল বছরের জুনে সংক্রমণ প্রতিরোধে নানা ধরনের অব্যবস্থাপনা ছিল। পর্যাপ্ত পরিমাণে ব্যক্তিগত নিরাপত্তাসামগ্রী (পিপিই) ও মানসম্মত মাস্কের সংকট ছিল। পাশাপাশি এগুলো ব্যবহারেও অসচেতনতা ছিল। যে কারণে বেশিসংখ্যক চিকিৎসক আক্রান্ত হয়েছেন এবং মৃত্যুর ঘটনাও বেশি ঘটে।

বিএমএর আজ ১৫ এপ্রিলের সর্বশেষ তথ্য বলছে, সারা দেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণে এ পর্যন্ত ২ হাজার ৯১০ চিকিৎসক আক্রান্ত হয়েছেন। একই সময়ে দেশে ১ হাজার ৯৯৮ নার্স এবং ৩ হাজার ২৯৫ স্বাস্থ্যকর্মী করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন।
চিকিৎসকেরা বলছেন, এ বছরের এপ্রিলে এসে চিকিৎসকদের মৃত্যু বেড়েছে। এর কারণ হচ্ছে, করোনাভাইরাসের নতুন ধরনগুলোতে (ভেরিয়েন্ট) আক্রান্ত হওয়া। বিদেশ থেকে আসা ব্যক্তিদের আইসোলেশন সঠিকভাবে মানা হলে করোনার নতুন ভেরিয়েন্টগুলোর মাধ্যমে এত চিকিৎসক শনাক্তের ও মৃত্যুর ঘটনা ঘটত না।

এক বছরের ব্যবধানে দেশে এত চিকিৎসকের মৃত্যু স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য অপূরণীয় ক্ষতি বলে মনে করেন বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন। তিনি বলেন, করোনাকালের পুরোটা সময়ে চিকিৎসকসহ স্বাস্থ্যকর্মীরা অভাবনীয় সেবা দিয়েছেন। তাঁরা দায়িত্ব থেকে সরে যাননি। কিন্তু চিকিৎসকদের যেসব প্রণোদনা প্রাপ্য ছিল, তা পাননি। এমনকি তাঁরা আবাসন ভাতা পাননি। এটা খুবই দুঃখজনক।

মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন বলেন, করোনাভাইরাস মোকাবিলায় চিকিৎসকেরা এখন অনেক সচেতন। তবে আরও সচেতন হওয়ার কোনো বিকল্প নেই। তবে সরকারের উচিত জরুরি মুহূর্তে সম্মুখসারির সেবাদাতা চিকিৎসকদের প্রতি আরও নজর দেওয়া।

বিজ্ঞাপন
করোনাভাইরাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন