করোনায় মৃত্যু কমানোর পথ খুঁজছে সরকার

করোনায় মৃত্যু কমিয়ে আনতে চায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। মৃত্যু পর্যালোচনার নতুন তথ্য পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে করোনা সংক্রমণের প্রায় ছয় মাস পার হচ্ছে। এখন পর্যালোচনার নামে কালক্ষেপণ করা ঠিক হবে না। এখন পর্যন্ত যে তথ্য-উপাত্ত পাওয়া গেছে, সেগুলো কাজে লাগাতে হবে।
পাবলিক হেলথ অ্যাডভাইজারি কমিটির আট সদস্যের সঙ্গে গত ২৮ আগস্ট স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের সভায় করোনায় মৃত্যুর বিষয়ে আলোচনা হয়। ওই সভার খসড়া কার্যবিবরণী থেকে জানা গেছে, সভায় অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম জানতে চান, করোনায় মৃত্যু বেড়ে যাওয়ার কারণ কী? করোনার পাশাপাশি অন্য রোগ থাকার কারণে কি মৃত্যু হচ্ছে, নাকি অন্য কোনো কারণ আছে, তা–ও তিনি বিশেষজ্ঞদের কাছে জানতে চান।

হাসপাতালে উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছি। তারপরও গবেষকদের কাছ থেকে মৃত্যুর কারণ জানার উদ্যোগ নিয়েছি। কারণ সম্পর্কে ধারণা পেলে সে অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়া হবে
আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম, ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর

গতকাল বুধবার আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম প্রথম আলোকে বলেন, ‘হাসপাতালে উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছি। তারপরও গবেষকদের কাছ থেকে মৃত্যুর কারণ জানার উদ্যোগ নিয়েছি। কারণ সম্পর্কে ধারণা পেলে সে অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’

২৮ আগস্টের সভার কার্যবিবরণীতে দেখা যায়, করোনায় মৃত্যু পর্যালোচনার একটি গবেষণা প্রকল্প নীতিগত অনুমোদনের জন্য বাংলাদেশ মেডিকেল রিসার্চ কাউন্সিলে (বিএমআরসি) ১৭ আগস্ট জমা দিয়েছিল পাবলিক হেলথ অ্যাডভাইজারি কমিটি। দেশের ১০টি হাসপাতালের প্রতিটি থেকে ৬০ জন করে মোট ৬০০ রোগীর তথ্য পর্যালোচনা করার কথা তাতে বলা আছে।

বিজ্ঞাপন
বিএমআরসির অনুমোদন নিয়ে মৃত্যু পর্যালোচনার পর তথ্য কাজে লাগাতে অনেক সময় চলে যাবে। ঢাকা মেডিকেল, মুগদা মেডিকেলের তথ্য কীভাবে দ্রুত কাজে লাগানো যায়, সেই উদ্যোগ নিতে হবে।
অধ্যাপক আহমেদুল কবির মহাসচিব, বাংলাদেশ মেডিসিন সোসাইটি
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সূত্র জানিয়েছে, বিএমআরসির নীতিগত অনুমোদনের জন্য কাজ শুরু করেছেন অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। জনস্বাস্থ্যবিদ ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পাবলিক হেলথ অ্যাডভাইজারি কমিটির সদস্য আবু জামিল ফয়সাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিএমআরসি অনুমোদন দিলে দেড় মাসের মধ্যে আমরা মৃত্যু পর্যালোচনার কাজ শেষ করতে পারব।’

সাধারণ মানুষের মধ্যে করোনার ভয় অনেকটাই কেটে গেছে। এখন দুশ্চিন্তার অন্যতম কারণ করোনায় মৃত্যু। প্রতিদিন করোনায় মৃত্যু হচ্ছে। গতকাল বুধবার আরও ৩৫ জনের মৃত্যুর তথ্য দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এ পর্যন্ত করোনায় ৪ হাজার ৩৫১ জনের মৃত্যু হয়েছে।

অবশ্য এখন পর্যন্ত সরকারি তরফে মৃত্যু কমানোর সুনির্দিষ্ট উদ্যোগ নেই। বিশেষজ্ঞরা করোনায় মৃত্যু কমিয়ে আনা বা মৃত্যৃ না হতে দেওয়ার উদ্যোগ নিতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে অনেক আগেই পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেয়নি।

কোভিড নিয়ে কোনো কথাই আগে বলা সম্ভব নয়। তবে যাঁদের বয়স বেশি, যাঁরা অন্য রোগে ভুগছেন, যাঁরা বিলম্বে হাসপাতালে আসছেন বা যাঁরা প্রয়োজনে অক্সিজেন সহায়তা নিচ্ছেন না, তাঁদের মৃত্যুঝুঁকি বেশি দেখা যাচ্ছে
ঢাকা মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ খান আবুল কালাম আজাদ

ঢাকা মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ খান আবুল কালাম আজাদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘কোভিড নিয়ে কোনো কথাই আগে বলা সম্ভব নয়। তবে যাঁদের বয়স বেশি, যাঁরা অন্য রোগে ভুগছেন, যাঁরা বিলম্বে হাসপাতালে আসছেন বা যাঁরা প্রয়োজনে অক্সিজেন সহায়তা নিচ্ছেন না, তাঁদের মৃত্যুঝুঁকি বেশি দেখা যাচ্ছে।’

মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ৯৩টি মৃত্যু পর্যালোচনা করেছে। এ নিয়ে গণমাধ্যমে একাধিক প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে। হাসপাতালে আসার পর কখন মৃত্যু হচ্ছে, তা দেখার চেষ্টা হয়েছিল ওই পর্যালোচনায়। হাসপাতালে আসার এক থেকে দুই ঘণ্টার মধ্যে মারা গেছেন ১১ জন, প্রথম ২৪ ঘণ্টায় মারা গেছেন আরও ২২ জন। ভর্তি হওয়ার ৪৮ ঘণ্টা বা দুই দিন পর মারা গেছেন ১২ জন, তিন দিন পর মারা গেছেন ৮ জন। বাকিরা মারা যান ৪ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে।

কলেজের অধ্যক্ষ টিটু মিয়া বলেন, ‘মারা যাওয়া রোগীদের বড় অংশটি হাসপাতালে এসেছিল অনেক বিলম্বে। তাঁরা যখন হাসপাতালে এসেছিলেন, তখন অধিকাংশের অক্সিজেন পরিস্থিতি খারাপ ছিল।’ স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সেই তথ্যের ব্যাপারে কোনো আগ্রহ দেখায়নি।

রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানও (আইইডিসিআর) মৃত্যু পর্যালোচনার কাজ করছে। আইইডিসিআরের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে সাড়ে পাঁচ শর বেশি করোনায় মৃত ব্যক্তির কাগজপত্র পর্যালোচনা করছেন প্রতিষ্ঠানের গবেষকেরা। তবে তিনি বলেননি যে কবে নাগাদ পর্যালোচনা শেষ হবে। আইইডিসিআরের সাবেক পরিচালক মীরজাদী সেব্রিনা এ পর্যালোচনার কাজ শুরু করেছিলেন। তিনি এখন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক।

বিজ্ঞাপন

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বলেছেন, সরকারি দুটি প্রতিষ্ঠানের তথ্য কীভাবে ব্যবহার করা যায়, অধিদপ্তরের তা ভেবে দেখা দরকার।

ঢাকা ও মুগদা মেডিকেল কলেজের একাধিক চিকিৎসক ও একজন বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাড়িতে চিকিৎসা নেওয়া রোগীদের একটি অংশ পরিস্থিতি খুব খারাপ হওয়ার পর হাসপাতালে আসছেন। তাঁদের মৃত্যুঝুঁকি বেশি। কিছু হাসপাতালে জরুরি বিভাগে অক্সিজেন সহায়তা ও অন্যান্য সেবা শুরু করতে বিলম্ব হয়, যা পরবর্তী সময়ে মৃত্যুর কারণ হয়। ভুল ওষুধ বা বেশি মাত্রায় ওষুধ সেবনও মৃত্যুর কারণ হতে পারে। এ ছাড়া এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে রোগী স্থানান্তর করার সময় প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম, বিশেষ করে অক্সিজেন সহায়তা না থাকার কারণে রোগী মৃত্যু হয়।

এমনিতেই সময় চলে গেছে। বিএমআরসির অনুমোদন নিয়ে মৃত্যু পর্যালোচনার পর তথ্য কাজে লাগাতে অনেক সময় চলে যাবে। ঢাকা মেডিকেল, মুগদা মেডিকেলের তথ্য কীভাবে দ্রুত কাজে লাগানো যায়, সেই উদ্যোগ নিতে হবে। সেটাই হবে কার্যকর পন্থা
বাংলাদেশ মেডিসিন সোসাইটির মহাসচিব আহমেদুল কবির

বাংলাদেশ মেডিসিন সোসাইটির মহাসচিব আহমেদুল কবির প্রথম আলোকে বলেন, এমনিতেই সময় চলে গেছে। বিএমআরসির অনুমোদন নিয়ে মৃত্যু পর্যালোচনার পর তথ্য কাজে লাগাতে অনেক সময় চলে যাবে। ঢাকা মেডিকেল, মুগদা মেডিকেলের তথ্য কীভাবে দ্রুত কাজে লাগানো যায়, সেই উদ্যোগ নিতে হবে। সেটাই হবে কার্যকর পন্থা।

করোনাভাইরাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন