default-image

দেশের বিভিন্ন স্থানে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেই চলেছে। এর পেছনে বিশেষ কোনো কারণ আছে কি?

নেহাল করিম: শুধু বাংলাদেশে নয়, এখানে যেমন ধর্ষণের ঘটনা ঘটে, বিশ্বের অনেক দেশেও তা ঘটে। তবে বাংলাদেশের পার্থক্য হচ্ছে, এখানে কোনো নিয়ম বা ব্যবস্থাপনা কাজ করে না। দুর্নীতিই সম্ভবত এ দেশে সবচেয়ে ভালোভাবে কাজ করে। বিশ্বের বহু দেশে মানুষের বাসনা পূরণের জন্য সরকারের অনুমোদনে নানা ব্যবস্থাপনা থাকে। কিন্তু আমাদের দেশে সেটা আছে ভিন্নভাবে। তা না হলে পাপিয়ারা পাঁচ তারকা হোটেলে ব্যবসা গড়ে তোলেন কীভাবে! সরকার যতই অস্বীকার করুক, সরকার বা প্রশাসনের জানাশোনার বাইরে এসব হতে পারে না। দুর্নীতি ও অবৈধ পথে এসব চলছে। এসব পথ আমরা দুর্নীতিগ্রস্ত বা অবৈধ করে রেখেছি। অনেকে ভয়ে এসব পথে পা বাড়াতে সাহস পান না। অর্থাৎ আমাদের সমাজে বাসনা পূরণের স্বাভাবিক পথ রুদ্ধ। ধর্ষণের মতো ঘটনা যে ঘটে চলেছে, তার পেছনে এরও একটি ভূমিকা আছে।

আমরা দেখছি, শিশুরাও ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। বিষয়টি কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?

নেহাল করিম: দেখুন, ধর্ষণের ক্ষেত্রে রুদ্ধ বাসনা মেটানোর ব্যাপারটা থাকতে পারে। কিন্তু শিশু ধর্ষণের বিষয়টি তো একেবারেই আলাদা। এখানে তেমন কিছু থাকে বলে আমার মনে হয় না। এর পেছনে কাজ করে মানসিক বিকার। আপনি দেখবেন যে উন্নত বিশ্বেও এ ধরনের বিকারগ্রস্ত লোক রয়েছে। সেখানে হয়তো বাসনা মেটানো আমাদের দেশের মতো কঠিন বিষয় নয়। এতে বোঝা যায়, শিশু ধর্ষণের বিষয়টির সঙ্গে মানসিক অসুস্থতা বা বিকারের সম্পর্ক রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

আমাদের অভিজ্ঞতায় দেখছি, যখন কোনো ধর্ষণের ঘটনা দেশজুড়ে আলোড়ন তোলে, তখন একের পর এক ধর্ষণের ঘটনার খবর আসতে শুরু করে। এখন প্রতিদিনই সংবাদমাধ্যমে ধর্ষণের খবর দেখা যাচ্ছে। হঠাৎ কি ধর্ষণ বেড়ে গেল?

নেহাল করিম: মানুষের বাসনা এবং এর প্রবৃত্তি নিয়ে আমাদের দেশে তেমন গবেষণা নেই। এ ধরনের গবেষণা হয় না। অথচ জৈবিক বাসনা আমাদের পেটের ক্ষুধার চেয়ে কোনো অংশে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। ফলে সমাজে নানা পর্যায়ে নানা ধরনের অপরাধের ঘটনা ঘটে। অথচ গবেষণার অভাবে এসব আমাদের জানা-বোঝার বাইরে থেকে যায়। হঠাৎ করেই বা কোনো বিশেষ কারণে ধর্ষণের ঘটনা বেড়ে গেছে কি না, সেটা বলা কঠিন। তবে আগে এ ধরনের ঘটনা প্রকাশ পেত কম, এখন প্রকাশিত হচ্ছে। একসময় দেশে সরকারি অনুমোদনে যৌনপল্লি ছিল। এখন অধিকাংশই তুলে দেওয়া হয়েছে। ফলে সমাজের মধ্যে রোগের মতো বিষয়গুলো ছড়িয়ে পড়েছে। এর ফল ভালো হলো কি না, তা নিয়ে সরকারি পর্যায়ে কোনো গবেষণা বা চিন্তাভাবনা ছিল বলে মনে হয় না।

  • শুধু বাংলাদেশে নয়, এখানে যেমন ধর্ষণের ঘটনা ঘটে, বিশ্বের অনেক দেশেও তা ঘটে। তবে বাংলাদেশের পার্থক্য হচ্ছে, এখানে কোনো নিয়ম বা ব্যবস্থাপনা কাজ করে না।

  • অ্যাসিড–সন্ত্রাসের মতো সামাজিক অপরাধ তো আমরা কমিয়ে এনেছি। এর পেছনে মূল কারণ হলো সমাজের ভেতর থেকে এর বিরুদ্ধে চাপ ছিল। আর একই সঙ্গে সরকারেরও উদ্যোগ ছিল।

ধর্ষণের মতো গুরুতর সমস্যা থেকে তবে মুক্তির পথ কী?

নেহাল করিম: দেখুন, সমাজ থেকে ধর্ষণ বা যৌন অপরাধ একেবারে নির্মূল করা আদৌ সম্ভব কি না, এটা বলা কঠিন। তবে এর লাগাম টেনে ধরা সম্ভব। এ ক্ষেত্রে সরকারের সদিচ্ছার বিষয়টি খুবই জরুরি। সামাজিক আন্দোলনও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। দেখুন, অ্যাসিড–সন্ত্রাসের মতো সামাজিক অপরাধ তো আমরা কমিয়ে এনেছি। এর পেছনে মূল কারণ হলো সমাজের ভেতর থেকে এর বিরুদ্ধে চাপ ছিল। আর একই সঙ্গে সরকারেরও উদ্যোগ ছিল।

করোনা সংক্রমণের কারণে দেশে দীর্ঘ সময় ধরে এক অস্বাভাবিক পরিস্থিতি বিরাজ করছে। এমন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে আমরা কখনো যাইনি। আমাদের সমাজ ও পরিবারের ওপর এর কী প্রভাব পড়ছে?

নেহাল করিম: এর প্রভাব ধনী-গরিব দুই শ্রেণির ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন। ধনীরা ঘরে থাকতে বাধ্য হয়েছে। আর্থিক চাপ মোকাবিলা করার একরকমের সামর্থ্য তাদের ছিল। ফলে তাদের ওপর প্রভাবটা পড়েছে একধরনের। দরিদ্র জনগোষ্ঠী পড়েছে অর্থনৈতিক সংকটে। এটা তাদের জীবনযাপনকে অসম্ভব চাপের মধ্যে ফেলেছে। সরকার যে সহায়তা করেছে, সেটা চাহিদার তুলনায় খুবই অপ্রতুল।

সচ্ছল শ্রেণির ওপর এই প্রভাবটা কেমন পড়েছে বলে মনে করেন?

নেহাল করিম: তাদের ওপর প্রভাবটা দ্বিমুখী। এসব পরিবারে সদস্যদের দীর্ঘ সময় একত্রে কাটানোর সুযোগ হয়েছে। যে সন্তান তার মা–বাবাকে কাছে পেত না, তারা তা পেয়েছে। স্বামী ও স্ত্রী দুজনই কাজ করেন, এমন পরিবারগুলোর জন্য এটা অনেকটা সুযোগ হিসেবে হাজির হয়েছিল। ফলে অনেক ক্ষেত্রে পারিবারিক সম্পর্ক জোরালো হয়েছে। আবার অনেক ক্ষেত্রে পারিবারিক জটিলতারও সৃষ্টি হয়েছে। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়াঝাটি বেড়েছে। পারিবারিক সহিংসতা বেড়ে যাওয়ার খবরও আমরা নানা গবেষণায় পেয়েছি। যেসব পরিবারে স্বামী-স্ত্রীর কারও মধ্যে সমস্যা চলছিল, করোনাকাল তাঁদের জন্য নতুন জটিলতা নিয়ে এসেছে। বাসায় বন্দী থাকায় যোগাযোগ বিঘ্নিত হওয়ার কারণে নানা অস্থিরতার সৃষ্টি হয়েছে। এসব নিয়ে সমস্যা, সন্দেহ ও অবিশ্বাসের বিভিন্ন খবরও আমরা জেনেছি। সবকিছু মিলিয়ে প্রভাবটি মিশ্র।

default-image

করোনা সংক্রামক রোগ। কে আক্রান্ত আর কে নয়, তা নিয়ে মানুষের মধ্যে সন্দেহ-অবিশ্বাস বেড়ে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। মানুষে মানুষে সম্পর্কের ক্ষেত্রে এর কোনো নেতিবাচক ভূমিকা পড়ছে কি?

নেহাল করিম: করোনা মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। এ ধরনের ভয়ের পরিস্থিতি ও অনিশ্চয়তা মানুষকে স্বার্থপর করে তোলে। এটা মানবিক প্রবৃত্তি। ফলে করোনাকাল ও সংক্রামক রোগের এই পরিস্থিতি সমাজে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে, এটা অস্বাভাবিক নয়। তবে এই যে একটা বিশেষ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে মানুষ যাচ্ছে, এ নিয়ে যে সামাজিক গবেষণা হওয়া প্রয়োজন, সেটা আমাদের দেশে হচ্ছে না। আমাদের কাছে কোনো তথ্য-উপাত্ত বা পরিসংখ্যান নেই। ফলে সামাজিকভাবে এই পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করা কঠিন।

করোনা পরিস্থিতি আমাদের মধ্যে কিছু আচরণগত পরিবর্তন এনেছে। এটা কতটা স্থায়ী হবে বলে মনে করেন?

নেহাল করিম: কিছু কিছু পরিবর্তন তো আমাদের জীবনে চলেই এসেছে। আমরা এখন অনেক কিছুই নিয়ম মেনে করছি। সামাজিক অনুষ্ঠান এড়িয়ে চলছি। পরিচ্ছন্নতার দিকে নজর দিচ্ছি। খুব বিপদে না পড়লে বা সামান্য অসুখ-বিসুখে হাসপাতালে যাচ্ছি না। নানা কিছু নিয়ে একধরনের সন্দেহ–অবিশ্বাসের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। আসলে আমাদের মধ্যে একধরনের ভয় ঢুকে গেছে। করোনার সংক্রমণ এখনো চলছে। বরং সামনে তা বাড়ার কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা। এই পরিস্থিতি থেকে দ্রুত ও সহজে আমাদের পরিত্রাণ মিলবে না।

বিজ্ঞাপন

বলা হচ্ছে, করোনার পরের জীবন আর কখনো আগের মতো হবে না। অনেকে একে ‘নিউ নরমাল’ বা ‘নতুন স্বাভাবিক’ বলে অভিহিত করছেন। আপনার কাছে নতুন স্বাভাবিক কী?

নেহাল করিম: করোনার এই পরিস্থিতি কত দিন থাকবে, তা আমাদের কাছে এখনো পরিষ্কার নয়। কিছু পরিবর্তন আমাদের জীবনে এর মধ্যেই হয়ে গেছে। এমনিতেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক কিছুই বদলে যেতে থাকে। অতীতে আমরা যেমন ছিলাম বা আমাদের বাবা-দাদারা যেভাবে জীবন যাপন করতেন, আমরা এখন সেভাবে করছি না। তবে করোনা আমাদের জীবনযাপনকে বড় ধাক্কা দিয়েছে। অর্থনৈতিকভাবে অনেকে বিপর্যস্ত হয়েছেন। অনেকে কাজ হারিয়েছেন। আমাদের জীবন দ্রুত বদলে যাওয়ার অনেক উপাদান এসে হাজির হয়েছে। ফলে আমাদের নতুন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হবে। এটাই নতুন স্বাভাবিক। এর সঙ্গে আমাদের মানিয়ে নেওয়ার উপায় খুঁজতে হবে।

করোনার কারণে কাজ হারিয়ে অনেকে গ্রামে ফিরেছেন। গ্রাম আর শহরের জীবনযাপন অনেকটাই আলাদা। যাঁরা গ্রামে ফিরতে বাধ্য হয়েছেন, তাঁরা গ্রামে গিয়ে কোনো ধরনের সামাজিক সমস্যার মধ্যে পড়তে পারেন কি?

নেহাল করিম: যারা গ্রামে ফিরেছে, তাদের মধ্যে বহু শিশুও আছে। আমি মনে করি, ১৫ বছর বয়স পর্যন্ত যে শিশুরা রয়েছে, তারা সহজেই গ্রামের পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারবে। কিন্তু পরিবারের গৃহিণীরা সমস্যায় পড়বেন। কারণ, তাঁরা সংসার চালানোর ক্ষেত্রে শহরে যে সুযোগ-সুবিধা পেতেন, গ্রামে তা থেকে অনেকটাই বঞ্চিত হবেন। তাঁরা বেশ কষ্টের মধ্যে পড়বেন। সামাজিক কিছু সমস্যা হবে। কর্মসংস্থানের একটি ব্যাপার রয়েছে। শহর থেকে যাঁরা গেছেন, তাঁদের সেখানে কাজের সন্ধান করতে হবে। স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে এ নিয়ে সমস্যা হতে পারে।

করোনাকালের এখনো বছর পার হয়নি। আমরা যে এত বদলের কথা বলছি, মানুষ আসলে কতটা বদলাতে পারে?

নেহাল করিম: কিছু বদল তো নিশ্চিতই হবে। করোনাকালে আর্থিক, সামাজিক ও পারিবারিক নানা সমস্যার কারণে অনেকের জীবনে নানা পরিবর্তন ঘটে গেছে। সেগুলো চাইলেও কেউ উল্টে দিতে পারবেন না। এই বদলের অনেক কিছুই ব্যক্তির নিজের ইচ্ছা–অনিচ্ছার ওপর নির্ভর করে না। এখন পরিস্থিতি অনেকটা স্বাভাবিক হলেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ রয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো খুলে গেলে পরিস্থিতি আরেকটু স্বাভাবিক মনে হবে। এখন যে বিচ্ছিন্নতা চলছে, তা হয়তো খুব দীর্ঘস্থায়ী হবে না। কিন্তু যে অভিজ্ঞতা ও বাস্তবতার মধ্য দিয়ে মানুষ গেল, তার প্রভাবে মানুষের মধ্যে স্থায়ী কিছু বদল আসতে বাধ্য।

প্রথম আলো: আপনাকে ধন্যবাদ।

নেহাল করিম: আপনাকেও ধন্যবাদ।

মন্তব্য পড়ুন 0