আমাদের দেশে প্রথম বুস্টার ডোজ গ্রহণের মাত্রা বেশ কম, যা ২০ শতাংশের নিচে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এখনো দুই ডোজ টিকার পুরো কোর্সের আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে হয়তো ১০ শতাংশের কম জনসংখ্যাকে। এটা একটি সমস্যা। আমাদের দেশে প্রথম বুস্টার ডোজ গ্রহণের মাত্রা ২০ শতাংশের নিচে বলে আবার করোনা সংক্রমণের হার বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থেকেই যায়।

ডা. তাজুল বলেন, গত কয়েক মাস করোনায় সংক্রমণের হার কম ছিল বলে আমাদের মধ্যে একধরনের উদাসীনতার ভাব দেখা দেয়। স্বাস্থ্যবিধি মানার অভ্যাস যতটুকু গড়ে উঠেছিল, সেটা এখন নেই বললেই চলে। এর ফলেও সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়তে থাকে।

কমপক্ষে ১০টি কারণে এখন দেশে করোনার সংক্রমণ বাড়তে শুরু করেছে। প্রথম কারণ হলো টিকা গ্রহণ করার পর অথবা করোনায় সংক্রমিত হওয়ার পর শরীরে যে অ্যান্টিবডি সৃষ্টি হয়, তার কার্যকারিতা কমে আসা।
ডা. তাজুল ইসলাম এ বারি, টিকা বিশেষজ্ঞ

এখন তো খুব কমসংখ্যক মানুষ মাস্ক পরে চলাফেরা করেন। প্রথম থেকেই বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, সবাই যদি ঘরের বাইরে চলাফেরায় সব সময় মাস্ক পরেন এবং সামাজিক দূরত্ব অন্তত ৩ থেকে ৬ ফুট রাখার নিয়ম মেনে চলেন, তাহলে করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। আমাদের দেশে অন্তত দুই ডোজ টিকা গ্রহণের হার অনেক, যা ৭০ শতাংশের ওপর। এর ফলে আমরা অনেকটাই নিরাপদে রয়েছি। এর পর মাস্ক ও সামাজিক দূরত্ব মেনে চললে হয়তো এ সময় করোনার সংক্রমণ আবার বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা কমে যেত। কিন্তু আমরা এসব ব্যাপারে নিস্পৃহ থাকার ফলে বিপদ বাড়ছে।

টিকায় সৃষ্ট টি–সেল এবং বি–সেলের স্থায়িত্বকাল

টিকা গ্রহণের পর অথবা করোনা আক্রান্ত হলে শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়। দেখা গেছে, এরা বেশি দিন স্থায়ী হয় না। এ রকম অনেক ভাইরাসের টিকায়ও হয়ে থাকে। তখন হয়তো কয়েক মাস পর আবার টিকা নিতে হয়। সংক্রমণ দীর্ঘস্থায়ী হলে মূল ভাইরাসের নতুন ধরন (ভেরিয়েন্ট) সৃষ্টি হয়। তখন শরীরে সৃষ্ট অ্যান্টিবডি নতুন ধরনের ভাইরাস চট করে চিনতে পারে না এবং টিকার কার্যকারিতা কমে যায়। করোনাভাইরাসের ক্ষেত্রেও এ রকম দেখা গেছে।

তবে টি–সেল এবং বি–সেল অনেক দিন স্থায়ী হওয়ার কথা। কিন্তু করোনা সংক্রমণরোধী টিকায় সৃষ্ট টি–সেল এবং বি–সেলের সংখ্যা খুবই কম, স্থায়িত্ব তো পরের কথা। শরীরের ভেতর লম্বা লম্বা হাড়ের মজ্জায় এ সব টি–সেল অবস্থান করে এবং অনেক দিন পর্যন্ত রোগ প্রতিরোধ করতে সক্ষম হয় বলে জানান ডা. তাজুল। কিন্তু করোনাভাইরাসরোধী টিকার ক্ষেত্রে এ সুবিধা পুরোপুরি পাওয়া যায় না। ফলে করোনা আক্রান্ত অথবা করোনারোধী টিকা দেওয়ার পরও টি এবং বি–সেলগুলো কার্যকর ভূমিকা রাখতে অনেক ক্ষেত্রে সক্ষম হচ্ছে না। এ কারণে ঘুরেফিরে করোনা সংক্রমণ বাড়তে থাকে।

হাইব্রিড টিকা বাজারে আসেনি

দুই ডোজ টিকা এবং বুস্টার ডোজ গ্রহণের পরও অনেকে কোভিডে আক্রান্ত হন। একে ব্রেক–থ্রু কোভিড সংক্রমণ বলা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের চিকিৎসাবিজ্ঞানী ও ইমিওনোলজিস্ট, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব অ্যালার্জি অ্যান্ড ইনফেকশাস ডিজিজের পরিচালক এবং মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রধান স্বাস্থ্য উপদেষ্টা অ্যান্থনি ফাউচি সম্প্রতি করোনা আক্রান্ত হয়েছেন। অথচ তিনি দুই ডোজ টিকা গ্রহণের পর বুস্টার ডোজ নিয়েছেন
দুবার। তারপরও আক্রান্ত হলেন। এ ধরনের ব্রেক–থ্রু কেন হয়? ডা. তাজুল ইসলাম বলেন, এটা হতে পারে, কারণ এখন পর্যন্ত হাইব্রিড টিকা
তৈরি হয়নি।

হাইব্রিড টিকা কোভিড ১৯–এর মূল ভাইরাসের পাশাপাশি এর বিভিন্ন ভেরিয়েন্টকে কার্যকরভাবে নিষ্ক্রিয় করার সক্ষমতাসম্পন্ন। বর্তমানে যত ধরনের করোনারোধী টিকা আমরা ব্যবহার করছি, তার সবগুলোই ২০১৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর চীনের উহানে যে করোনাভাইরাসের প্রথম সংক্রমণ ঘটে এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে, শুধু তার স্পাইক প্রোটিনকে অকার্যকর করার সক্ষমতাসম্পন্ন অ্যান্টিবডি সৃষ্টি করে। কিন্তু এরপর প্রায় দুই–আড়াই বছরে সেই আদি করোনাভাইরাসের শত শত ভেরিয়েন্ট তৈরি হয়েছে। সাধারণত কোনো ভাইরাসের বিভিন্ন ভেরিয়েন্টের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী টিকারও নতুন গুণসম্পন্ন নবায়ন ঘটানো হয়। কিন্তু করোনারোধী টিকার নতুন কোনো ভার্সন আজও বাজারে আসেনি। অনেক সময় বলা হয়েছে, নতুন কিছু করার দরকার নেই। অর্থাৎ কোভিড ১৯–এর কোনো হাইব্রিড টিকা এখনো নেই। ফলে সহজে ব্রেক–থ্রু সংক্রমণ ঘটছে এবং বুস্টার ডোজ নেওয়ার পরও অনেকে করোনা আক্রান্ত হচ্ছেন। এভাবে একের পর এক করোনা সংক্রমণের নতুন ঢেউ সৃষ্টি হচ্ছে।

শিশুরা কি করোনা ছড়ায়

করোনা মহামারির প্রথম দিকে আমরা জানতাম, কম বয়সী শিশুদের সংক্রমিত হওয়ার আশঙ্কা প্রায় নেই। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, শিশুরাও আক্রান্ত হয়। তাদের লক্ষণ তেমন না থাকলেও অন্যদের সংক্রমিত করতে পারে। সুতরাং এই পথেও করোনা সংক্রমণ ঘটতে পারে।

ডা. তাজুল বলেন, উপসর্গবিহীন কোভিড ১৯–এ আক্রান্ত শিশুও করোনা ছড়াতে পারে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের এফডিএর ভ্যাকসিন রিলেটেড বায়োলজিক্যাল প্রোডাক্ট অ্যাডভাইজারি কমিটি (ভিআরবিপিএসি) ৬ মাস বয়সী শিশুদের জন্য ফাইজার ও মডার্নার টিকা অনুমোদন করেছে। এখন হয়তো নীতিগতভাবে তা গৃহীত হবে। তাহলে করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি অনেকটা কমিয়ে আনা যাবে।

মাস্ক পরা কেন গুরুত্বপূর্ণ

সাধারণ বিবেচনা থেকে আমরা ধরে নিই যে মাস্ক পরলে আমি নিরাপদ। এটা ঠিকই আছে। কিন্তু অনেক সময় এটাও ভাবি যে শেষ পর্যন্ত আমি মাস্কের ভেতর দিয়ে বাইরের বাতাস তো গ্রহণ করছিই। তাহলে আমি তো একেবারে ঝুঁকিমুক্ত হতে পারছি না। এই চিন্তা থেকেও আমাদের অনেকে মাস্কের প্রতি কম গুরুত্ব দিয়ে থাকে। কিন্তু এই চিন্তাটা ভুল। মাস্ক শুধু আমার সংক্রমণের ঝুঁকি কমায় না, আশপাশের লোকজনের ঝুঁকিও কমায়। মাস্ক পরলে আমি যেমন কিছুটা নিরাপদ, আশপাশের অন্য দশজন আরও বেশি নিরাপদ হতে পারেন।

এই ব্যাপারটা বিভ্রান্তিকর মনে হতে পারে। কিন্তু করোনা বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, কথাটা ঠিক। কারণ, আমি হয়তো লক্ষণমুক্ত করোনায় আক্রান্ত অথবা আজই করোনায় আক্রান্ত হয়েছি। এ অবস্থায় আমি মাস্ক ছাড়া অন্যদের সঙ্গে অবাধে মেলামেশা করলে তাদের মধ্যে করোনা ছড়ানোর আশঙ্কা থাকবে। এ অবস্থায় মুখে মাস্ক থাকলে নিশ্বাসের সঙ্গে যে ড্রপলেট বের হবে, তা মাস্ক ও মুখের মাঝখানের অংশে আর্দ্র বাতাসের সংস্পর্শে আসবে এবং বাইরে বেশি দ্রুতগতিতে ছড়াবে না, বরং দু–চার ইঞ্চি দূরে গিয়েই মাটিতে পড়ে যাবে। তার মানে আমার খুব কাছে না থাকলে অন্য দশজনও মাস্কের কল্যাণে করোনায় সংক্রমিত হওয়ার ভয়মুক্ত থাকবেন।

এখন ধরা যাক, আমার চারপাশে যাঁরা আছেন, তাঁদের প্রত্যেকের মুখেই মাস্ক আছে। তাহলে তাঁদের নিশ্বাসের সঙ্গে বের হওয়া করোনাভাইরাসে আমিসহ অন্য আরও দশজনও অনেকটা ঝুঁকিমুক্ত থাকব। সুতরাং বলা যায়, মাস্ক আমাকে বাঁচায় এবং অন্য দশজনকে আরও বেশি বাঁচায়। তাই করোনা বিশেষজ্ঞরা বলেন, জনসমাগমের মধ্যে সবাই যদি মাস্ক পরে চলাফেরা করেন, তাহলে করোনা সংক্রমণের হার আশাতীতভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব।

একই সঙ্গে হাঁচি–কাশির সময় নাক–মুখ রুমালে ঢাকার অভ্যাস আমাদের সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি অনেক কমিয়ে দেয়। আমরা এসব বিষয় জানি। তা সত্ত্বেও অনেক সময় মেনে চলি না। তাই করোনা সংক্রমণ কমলেও আবার তা বাড়তে থাকে।

নাসিকা পথে টিকার ব্যবস্থা

ডা. তাজুল একটি নতুন সম্ভাবনার কথা বলেছেন। তিনি বলেন, শ্বাস নেওয়ার সময় নাসারন্ধ্রে স্প্রে করার মাধ্যমে টিকা গ্রহণের ব্যবস্থা এখনো নেই। এটা হলো ‘নেজাল রুট ভ্যাকসিন’। অনেক দিন থেকেই এ ধরনের টিকা আবিষ্কারের কথা আমরা শুনছি। তিনটি টিকা পরীক্ষা–নিরীক্ষার শেষ পর্যায়ে রয়েছে। যদি এ ব্যবস্থা করা যায়, তাহলে হয়তো করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ অনেক সহজ হবে। কারণ, সবার হাতের কাছে এই টিকা পৌঁছানো খুব সহজ।

করোনাভাইরাস মূলত শ্বাস গ্রহণের সময় বাতাসের সঙ্গে শ্বাসনালিতে ঢুকে পড়ে এবং শ্বাসতন্ত্রে সংক্রমণ ঘটায়। তাই যদি নাসিকাপথে স্প্রে করার মাধ্যমে এই ভাইরাসকে নিষ্ক্রিয় করা যায়, তাহলে খুব সহজেই করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। আমরা এই টিকার অপেক্ষায় থাকব।

কী করতে হবে

এখন অন্তত কয়েকটি বিষয়ে আমাদের বিশেষ উদ্যোগ নিতে হবে। করোনা শনাক্তের পরীক্ষা যথাসম্ভব বাড়ানো। একই সঙ্গে বেশি হারে টিকা দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। কোনোভাবেই স্বাস্থ্যবিধি অমান্য করা যাবে না। ‘নো মাস্ক, নো সার্ভিস’ কথাটা সবার মুখে মুখে চলছে বটে, কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে তা মানা হয় না। এ বিষয়ে আরও সতর্ক হতে হবে।

আরও টিকা দেওয়া, প্রকাশ্যে চলাফেরায় মাস্ক ব্যবহার এবং প্রচলিত স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা। করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে হলে এগুলো অবশ্যই বাস্তবায়ন করতে হবে।

এটা ছাড়া করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন।


আব্দুল কাইয়ুম সহযোগী সম্পাদক, প্রথম আলো

করোনাভাইরাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন