বিজ্ঞাপন

টিকা নিয়ে এই নানা ধরনের তৎপরতা যখন চলছে, তখন ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট থেকে আনা টিকার মজুত দেশে প্রায় ফুরিয়ে এসেছে। গতকাল রোববার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত সংবাদ বুলেটিনে বলা হয়, এই টিকা আর এক সপ্তাহের মতো দেওয়া হতে পারে। কোনো কেন্দ্রে এক দিনের মধ্যে টিকা শেষ হতে পারে। কোনো কেন্দ্রে এক সপ্তাহের পর আরও দু-এক দিন টিকা দেওয়া হতে পারে। তবে দেশের কোনো কেন্দ্রেই আপাতত স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে আর টিকা পাঠানো হবে না।

ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট থেকে আনা টিকা দেশের সব জেলায় জনসংখ্যার অনুপাতে ভাগ করে দেওয়া হয়েছিল। প্রথম সারির কর্মী ও ৪০ বছরের বেশি বয়সীরা এই টিকা পাওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকারের তালিকায় ছিলেন। কিন্তু চীনের উপহারের টিকার ক্ষেত্রে তা হচ্ছে না। এই টিকার পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম। চীন বাংলাদেশকে পাঁচ লাখ টিকা দিয়েছে। এর মধ্য থেকে ৩০ হাজার টিকা তারা চেয়েছে এ দেশে থাকা ও কাজ করা চীনা নাগরিকদের জন্য।

কারা পাচ্ছে চীনা টিকা

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগনিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক ও অধিদপ্তরের মুখপাত্র অধ্যাপক মো. নাজমুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, সরকারি-বেসরকারি মেডিকেল ও ডেন্টালের শিক্ষার্থী, নার্সিং শিক্ষার্থী এবং মেডিকেল টেকনোলজি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা এই টিকা পাওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পাবেন।

তবে এসব প্রতিষ্ঠানে মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা দুই লাখের কম। বাকি টিকা কাদের দেওয়া হবে, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, টিকার বিষয়ে আজ সোমবার একটি সভা হওয়ার কথা আছে। চীনের টিকা শিক্ষার্থীদের বাইরে অন্য কাদের দেওয়া হবে, সে ব্যাপারে সভায় সিদ্ধান্ত হতে পারে। তবে সেরাম ইনস্টিটিউট থেকে আনা টিকার প্রথম ডোজ পাওয়া ব্যক্তিদের দ্বিতীয় ডোজ হিসেবে চীনের টিকা দেওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।

প্রথম ডোজ পাওয়ার পর ১২ সপ্তাহ পর্যন্ত দ্বিতীয় ডোজ নেওয়া যাবে বলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে। অবশ্য এই সময়কাল আরও চার সপ্তাহ বাড়ানো যায় কি না, তা বিভিন্ন দেশের চলমান গবেষণা পর্যালোচনা করে দেখছে অধিদপ্তর।

গতকাল পর্যন্ত ৫৮ লাখ ১৯ হাজার ৯১২ জন প্রথম ডোজ টিকা পেয়েছেন। এঁদের মধ্যে ৩৭ লাখ ৮৩ জন দ্বিতীয় ডোজ পেয়েছেন। এ ছাড়া টিকা প্রয়োগের সময় কিছু অপচয় বা নষ্ট হয়েছে। বর্তমান যে টিকা আছে তা দিয়ে প্রথম ডোজ পাওয়া সবাইকে দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া সম্ভব হবে না। দ্বিতীয় ডোজের অপেক্ষায় থাকবেন প্রায় ১৫ লাখ মানুষ।

সরকারি-বেসরকারি মেডিকেল ও ডেন্টালের শিক্ষার্থী, নার্সিং শিক্ষার্থী এবং মেডিকেল টেকনোলজি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা চীনের টিকা পাওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পাবেন।
অধ্যাপক মো. নাজমুল ইসলাম, মুখপাত্র, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর

টিকার বিকল্প উৎস

পবিত্র ঈদুল ফিতরের আগের দিন ১৩ মে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, সবচেয়ে কার্যকর ও পরীক্ষিত অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা দিয়েই দেশে গণটিকাকরণ কার্যক্রম শুরু হয়। ভারতীয় কর্তৃপক্ষ টিকা রপ্তানির ওপর সাময়িক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে, সেই কারণে সরবরাহ ব্যবস্থায় কিছুটা সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, রাশিয়া ও চীনের টিকা উৎপাদনকারী সংস্থার সঙ্গে বাংলাদেশের আলোচনা চলছে। উপহার হিসেবে চীনের টিকা এসেছে। টিকা পাওয়ার ব্যাপারে আমেরিকার কাছেও অনুরোধ জানানো হয়েছে। বিশ্ব টিকাকরণ সংস্থা কোভ্যাক্সের কাছ থেকেও বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য পরিমাণ টিকা পাবে। তিনি বলেন, বিভিন্ন উৎস থেকে এক কোটি টিকা ক্রয়ের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। খুব শিগগির দেশে টিকা আসতে শুরু করবে। তা ছাড়া দেশেই যাতে টিকা উৎপাদন করা যায়, সে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

রাশিয়ার টিকা স্পুতনিক-ভি কেনা এবং দেশে উৎপাদন বিষয়ে বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যে চুক্তির খসড়া নিয়ে মতামত দেওয়া-নেওয়া চলছে। একই ধরনের প্রক্রিয়া চলছে চীনের সিনোফার্মার টিকা নিয়েও। সরকার ইতিমধ্যে দেশে টিকা উৎপাদন করতে সক্ষম এমন প্রতিষ্ঠানও বাছাই করেছে। আজ-কাল একটি প্রতিষ্ঠানকে করোনার টিকা উৎপাদনের অনুমোদনও দিতে পারে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর।

টিকা বিক্রির উদ্যোগ

সরকার সেরাম ইনস্টিটিউটের কাছ থেকে প্রতি ডোজ টিকা কিনেছে ৫ ডলার বা ৪২৫ টাকা দামে। একই টিকা সরকারের কাছে প্রতি ডোজ ২ হাজার ৫৭ টাকায় বিক্রি করার প্রস্তাব দিয়েছে ইউরোপের দেশ মাল্টার একটি প্রতিষ্ঠান।

হ্যালোক্লাইন প্রাইভেট লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠান স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে লেখা চিঠিতে বলেছে, তারা অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার ১০ লাখ টিকা সরকারের কাছে বিক্রি করতে পারবে। বাংলাদেশে তাদের প্রতিনিধিত্ব করছেন ‘ফুনা ইনফো টেক লিমিটেড’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. রফিকুল ইসলাম।

মো. রফিকুল ইসলাম গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, মাল্টার প্রতিষ্ঠানটি অ্যাস্ট্রাজেনেকার সঙ্গে সম্পর্কের কারণে তুলনামূলকভাবে সহজে টিকা কিনতে পারবে। তবে দামের বিষয়টি আলোচনাসাপেক্ষ।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের টিকা কমিটির প্রধান অধ্যাপক মীরজাদী সেব্রিনা প্রথম আলোকে বলেন, বিভিন্ন দেশের দূতাবাসগুলোর মাধ্যমে অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা সংগ্রহের চেষ্টা চলছে। টিকা বিক্রির প্রস্তাবকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দাম বা সরবরাহ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো আলোচনা হয়নি। এ ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।

করোনাভাইরাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন