default-image

চীনের হুবেই প্রদেশের উহান শহর থেকে করোনাভাইরাস দ্রুত বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ার সময়ে জনস্বাস্থ্যবিদ ও বিজ্ঞানীরা বলেছিলেন, মহামারির ইতি টানতে বিশ্বের দরকার নতুন টিকা। নতুন টিকার গবেষণা শুরু হতে বেশি সময় লাগেনি। বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক, সেরা গবেষণা প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞানী, শীর্ষস্থানীয় ওষুধপ্রতিষ্ঠান যুক্ত হয় টিকা উদ্ভাবনে। ইতিহাসের দ্রুততম সময়ে টিকা উদ্ভাবনের খবর আসতে থাকে গণমাধ্যমে। একই সঙ্গে এই বার্তা বিশ্বব্যাপী রটে যায় যে টিকা হবে সোনার হরিণ। প্রয়োজন হলেও সব মানুষ, সব দেশ এই টিকা পাবে না।

সরকারের কর্মকাণ্ড বিশ্লেষণ করে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বাংলাদেশ টিকা নির্বাচনের প্রক্রিয়ায় শুরু থেকে ভুল করেছে। টিকা নির্বাচনের ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়নি বা অনুসরণ করার মতো সক্ষমতা নেই। উদ্ভাবন প্রক্রিয়ার গবেষণায় যুক্ত থাকলে টিকা নির্বাচন বাংলাদেশের জন্য ঠিক হতো, টিকা প্রাপ্তির সুযোগ বাড়ত। টিকা গবেষণায় যুক্ত হওয়া থেকে বাংলাদেশ নিজেকে শুরু থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছে। চীন, ভারত এমনকি বাংলাদেশের বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবিত টিকার পরীক্ষার সিদ্ধান্ত মাসের পর মাস আটকে রেখেছে বাংলাদেশ মেডিকেল রিসার্চ কাউন্সিল (বিএমআরসি)। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এটি খারাপ ঘটনার উদাহরণ হয়ে থাকবে। অন্যদিকে টিকা গবেষণায় যে জ্ঞান অর্জনের সুযোগ ছিল, তা থেকেও আপাতত বঞ্চিত হয়ে থাকলেন দেশের বিজ্ঞানীরা।

বিজ্ঞাপন

পর্যবেক্ষক মহল মনে করে, বাংলাদেশ টিকা নির্বাচনের ক্ষেত্রে কূটনীতিকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। কোন টিকা কার্যকর, কোন টিকা নিরাপদ, কোন টিকা পর্যাপ্ত—এই তথ্যে নির্ভর না করে বাংলাদেশ বন্ধুর ওপর নির্ভর করতে চেয়েছে। টিকা উৎপাদন নিয়ে, টিকার কাঁচামাল নিয়ে কত ধরনের বাণিজ্য দ্বন্দ্ব হতে পারে, হতে যাচ্ছে তা বুঝেও উঠতে পারেননি কর্মকর্তারা। বিপুল চাহিদার তুলনায় সারা বিশ্বে সরবরাহ সীমিত—এই পরিস্থিতিতে একক উৎসের ওপর নির্ভর করেছে বাংলাদেশ। ভারত থেকে টিকা কেনা এবং কোভ্যাক্স থেকে সংগ্রহ করা—এই ছিল টিকার উৎস। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বিকল্প উৎসের কার্যকর সন্ধান করা হয়েছে, এমন প্রমাণ পাওয়া যায় না।

শক্তিশালী প্রতিবেশী সবারই উদ্বেগের কারণ। ইতিহাস বলছে, গঙ্গার পানিতে আগে ভারতের মানুষের তেষ্টা মিটবে, তারপর বাংলাদেশের হিস্যা। একই যুক্তিতে ভারত তিস্তার পানি দিতে চায় না। একই যুক্তি টিকার ক্ষেত্রে।

জনস্বাস্থ্যবিদ ও বিজ্ঞানীরা বলছেন টিকার কাজ তিনটি: টিকা করোনায় মৃত্যু কমাবে, টিকা দেওয়া থাকলে করোনার উপসর্গের তীব্রতা কম হবে এবং টিকা সংক্রমণ প্রতিরোধ করবে। মৃত্যুর পরিসংখ্যান বলছে, ৫০ বছর বা তার বেশি বয়সী ব্যক্তিদের মৃত্যুঝুঁকি বেশি। কিন্তু সরকার টিকা দেওয়ার বয়সসীমা ৪০ বছরে নামিয়ে এনেছে। এতে কম ঝুঁকিপূর্ণ মানুষ টিকা পাচ্ছে। অধিক বয়সী বা মৃত্যুঝুঁকি বেশি, এমন নাগরিকদের টিকা না পাওয়ার আশঙ্কা বেড়েছে।

টিকা উদ্ভাবন ও উৎপাদনের শুরু থেকে বিশ্বব্যাপী এর বিলিবণ্টনে ন্যায্যতা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছিল। বলা হয়েছিল, গ্রাম ও শহর, নারী ও পুরুষ, ধনী ও দরিদ্র, শিক্ষিত ও নিরক্ষর—এসব ক্ষেত্রে যেন বৈষম্য না হয়। বাংলাদেশে এসব ক্ষেত্রে বৈষম্য হয়নি, এমন নিশ্চয়তা সরকারের পক্ষ থেকে এখনো দেওয়া হয়নি।

বাংলাদেশের আছে শক্তিশালী এক স্বাস্থ্য অবকাঠামো, আর আছে টিকাদানের ঐতিহ্য। এক দিনে সাত লাখ মানুষকে বাংলাদেশ টিকা দিতে সক্ষম। তবে দেওয়ার মতো টিকা বাংলাদেশের নেই। যে অল্প টিকা বাংলাদেশ পেয়েছে, তা দক্ষতার সঙ্গে প্রয়োগ করতে পেরেছে, করছে। এ নিয়ে প্রশংসাও পেয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ।

তবে সময় শেষ হয়ে যায়নি। বাংলাদেশ স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদে পরিকল্পনা করে সামনে এগোতে পারে। প্রথমেই দরকার অক্সফোর্ড–অ্যাস্ট্রাজেনেকার প্রথম ডোজ দেওয়া প্রত্যেক ব্যক্তির দ্বিতীয় ডোজ নিশ্চিত করা। ১৩ লাখের কিছু বেশি মানুষের জন্য দ্বিতীয় ডোজ টিকার মজুত নেই। ভারত থেকে আনা সম্ভব না হলে যেসব দেশে এই টিকা উদ্বৃত্ত আছে, সেখান থেকে আনার চেষ্টা করা দরকার।

বিলম্বে হলেও রাশিয়া ও চীনের টিকার জরুরি ব্যবহারের অনুমোদন দিয়েছে সরকার। এখন এসব টিকা বেশি পরিমাণে আনার সম্ভাব্য সব ধরনের উদ্যোগ অব্যাহত রাখতে হবে। সময় নষ্ট না করে এসব টিকা দেশে উৎপাদনের উদ্যোগ নিতে হবে। সরকারের নিজস্ব টিকা উৎপাদনের কারখানা নেই। তিনটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান টিকা উৎপাদনে সক্ষম। এদের সঙ্গে নিতে হবে, সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করতে হবে। এ ক্ষেত্রে প্রযুক্তি হস্তান্তরের মতো বিষয়ে যেন সময় নষ্ট না হয়, সে ব্যাপারে মনোযোগী হতে হবে।

বিজ্ঞাপন

শুধু টিকা নির্বাচনই সমস্যার সমাধান নয়। যখনই করোনার নতুন ধরন (ভেরিয়েন্ট) নিয়ে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, তখনই উদ্ভাবিত টিকা কার্যকর হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় তৈরি হচ্ছে। দেশে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান করোনার জিন বিশ্লেষণে কাজ করছে। তবে এদের মধ্যে সমন্বয় ও যোগাযোগ নেই।

এ ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান বিশিষ্ট ওষুধবিজ্ঞানী অধ্যাপক সায়েদুর রহমান একটি জাতীয় টাস্কফোর্স এবং ন্যাশনাল মলিকুলার সার্ভিল্যান্স প্ল্যান করার পরামর্শ দিতে চান। একটির কাজ হবে সারা দুনিয়াতে কোথায় টিকা নিয়ে কী গবেষণা হচ্ছে, অগ্রগতি কী, তার খোঁজ রাখা। অন্যটির কাজ হবে দেশের মধ্যে ভাইরাসের ধরনে কোনো পরিবর্তন আসছে কি না, তা নজরদারি করা। এরা মিলে ঠিক করবে বাংলাদেশের জন্য কোন টিকাটি কার্যকর হবে।

সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান কার্যালয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সম্মেলনে ২০১১ সালের ১৭ মে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও যুক্তরাষ্ট্রের বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশনের কো–চেয়ার বিল গেটস এই মঞ্চে বক্তব্য দিয়েছিলেন। বিল গেটস মূলত টিকার ওপর বক্তব্য দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, টিকা হচ্ছে শীর্ষস্থানীয় অভিজাত প্রযুক্তি। ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউটের প্রশংসা করেছিলেন কম খরচে বিপুল পরিমাণ টিকা উৎপাদন করার জন্য।

করোনাকালে গেটস ফাউন্ডেশন সেরাম ইনস্টিটিউটকে বিপুল অর্থসহায়তা করেছে করোনার টিকা উৎপাদনের জন্য। এই সেরাম ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞরা ২০০৭ সালে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য বিভাগকে পরামর্শ দিয়েছিল জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটকে আধুনিক টিকা উৎপাদন প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার। সরকারকে টিকা উৎপাদনে সক্ষমতা অর্জনে গেটস ফাউন্ডেশন ও সেরামের মতো প্রতিষ্ঠানকে পাশে পাওয়ার উদ্যোগ নিতে হবে।

করোনাভাইরাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন