default-image

করোনার সংক্রমণ মোকাবিলায় টিকার প্রাপ্যতা নিয়ে যেমন অনিশ্চয়তা রয়েছে, তেমনি মজুতও দ্রুত শেষ হয়ে আসছে। সরকার গঠিত ‘কোভিড-১৯ ভ্যাকসিনপ্রাপ্তি উৎস ও সংগ্রহসংক্রান্ত কোর কমিটির’ আলোচনায় উঠে এসেছে, টিকার বর্তমান মজুত আগামী ১৫ মের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে। এর আগে ভারত থেকে টিকা আসবে কি না বা এলেও তার পরিমাণ কত হবে, সে বিষয়ে এখনো স্পষ্ট করে কিছু বলতে পারছে না স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।

ফলে যাঁরা ইতিমধ্যে টিকার প্রথম ডোজ নিয়েছেন, সময়মতো তাঁদের সবার দ্বিতীয় ডোজ পাওয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে জরুরি ভিত্তিতে বিকল্প উৎস থেকে দ্রুত পর্যাপ্ত পরিমাণে টিকা আমদানি করতে না পারলে দেশে ‘অস্থিতিশীল অবস্থা’র সৃষ্টি হবে বলে মনে করছেন সরকার গঠিত উচ্চপর্যায়ের ওই কোর কমিটির সদস্যরা। চীন, রাশিয়াসহ অন্য উৎস থেকে টিকা পাওয়া নিয়ে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চললেও শিগগির সফলতা আসবে, এমন সম্ভাবনা খুব একটা দেখছেন না তাঁরা।

ভারত থেকে কেনা ও উপহার হিসেবে ১ কোটি ৩ লাখ টিকা পেয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এখন আছে ২৫ লাখ ৫৩ হাজারের কিছু বেশি টিকা।

বিজ্ঞাপন
‘কোভিড-১৯ ভ্যাকসিনপ্রাপ্তি উৎস ও সংগ্রহসংক্রান্ত কোর কমিটির’ আলোচনা। জরুরি ভিত্তিতে বিকল্প উৎস থেকে টিকা আনার তাগিদ।

ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর সূত্র জানায়, টিকা আমদানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সাধারণত উন্নত সাতটি দেশ—যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সুইজারল্যান্ড, জার্মানি, ফ্রান্স, জাপান ও অস্ট্রেলিয়া এবং ইউরোপীয় ওষুধ সংস্থার (ইএমএ) সনদ বিবেচনায় নেয়। রাশিয়ার তৈরি টিকা ‘স্পুতনিক-ভি’ এবং চীনের তৈরি ‘সিনোফার্মা’ ও ‘সিনোভ্যাক’ ইএমএ সনদের শর্ত পূরণ করে না। ফলে ওই দুই দেশের টিকা আমদানি করতে হলে সরকারিভাবে নীতি পরিবর্তনের প্রয়োজন হবে।

এমন প্রেক্ষাপটে চীনের তৈরি সিনোভ্যাক টিকা বাংলাদেশের জন্য বিবেচনায় না নিতে গত বুধবার অনুষ্ঠিত কোর কমিটির সদস্যরা ভার্চ্যুয়াল সভায় মত দেন। এ ছাড়া কোনো নির্দিষ্ট দেশের টিকা ব্যবহারের জন্য ওষুধ আমদানির নীতি পরিবর্তন সহজ কাজ নয়। তবে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, যেহেতু টিকার মজুত দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে, সে কারণে স্বাস্থ্যমন্ত্রী প্রয়োজনে নীতি পরিবর্তন করে টিকা আমদানির নির্দেশ দিয়েছেন।

স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, দেশের ৮০ শতাংশ মানুষকে করোনার টিকার আওতায় নিয়ে আসার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। এ জন্য প্রথম পর্যায়ে ১ কোটি ৫০ লাখ মানুষের জন্য অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার (ভারতের প্রতিষ্ঠান সেরাম তৈরি করছে) টিকা কিনে রাখা হয়েছে। এর বাইরে কোভ্যাক্স (টিকা বিতরণের বৈশ্বিক উদ্যোগ) থেকে পাওয়া যাবে ৩ কোটি ৪০ লাখ মানুষের টিকা। কিন্তু দেশে প্রয়োজন ১৩ কোটি ডোজ টিকা।

ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর সূত্র জানায়, বুধবার অনুষ্ঠিত কোর কমিটির বৈঠকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মীরজাদী সেব্রিনা বলেছেন, কোন উৎস থেকে পর্যাপ্ত পরিমাণে অল্প সময়ের মধ্যে টিকা আমদানি করা সম্ভব হবে, সে বিষয়ে অতি দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এটি করা না গেলে একটি অস্থিতিশীল অবস্থার সৃষ্টি হবে। ওই বৈঠকে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের যুগ্ম সচিব এস এম আলমগীর যুক্তরাষ্ট্রের জনসন অ্যান্ড জনসনের টিকা বিবেচনায় না নিতে নিজের মত তুলে ধরেন। বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের মডার্নার টিকা নিয়েও আলোচনা হয়। তবে এই টিকা মাইনাস ২০ ডিগ্রি তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করতে হয় বিধায় তা বাংলাদেশের বাস্তবতায় অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং হবে বলে বৈঠকে মত দেওয়া হয়।

কোর কমিটির ওই বৈঠকের সভাপতি ছিলেন ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মাহবুবুর রহমান। অধিদপ্তরের একটি সূত্র জানিয়েছে, আলোচনায় তিনি বলেছেন, টিকা আমদানি করতে যারা আগ্রহী, তাদের উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ‘ডিড অব অ্যাগ্রিমেন্ট’ (চুক্তির দলিল) আছে কি না, তা দেখতে হবে। এ ছাড়া কত পরিমাণ আমদানি করতে পারবে, কত সময়ের মধ্যে পারবে, সেটি স্পষ্ট জানাতে হবে। চীনের সিনোভ্যাক টিকার কার্যকারিতা সবচেয়ে কম বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (লাইন ডিরেক্টর) মো. সামসুল হক ওই বৈঠকে করোনার টিকা আমদানির জন্য যেসব প্রস্তাব এসেছে, তা বৈঠকে উপস্থাপন করেন। এর মধ্যে ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউটের টিকার দাম ৪ ডলার—কার্যকারিতা ৮১ দশমিক ৩০ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্রের জনসন অ্যান্ড জনসনের টিকার দাম ৯ থেকে ১০ ডলার—কার্যকারিতা ৬৬ থেকে ৭২ শতাংশ। রাশিয়ার স্পুতনিক-ভি টিকার দাম ১০ থেকে ২৭ ডলার—কার্যকারিতা ৯১ দশমিক ৬ শতাংশ। ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান রেনাটা লিমিটেড ও আল-মদিনা ফার্মাসিউটিক্যাল এই টিকা আমদানির প্রস্তাব করেছে। চীনের সিনোভ্যাকের দাম ৫ থেকে ৩৩ ডলার—কার্যকারিতা ৫০ দশমিক ৪০ শতাংশ। চীনের সিনোফার্মের টিকার দাম ১৯ থেকে ৪০ ডলার—কার্যকারিতা ৭৯ শতাংশ। বাংলাদেশ বেসরকারি ক্লিনিক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন ও ট্রিক্স ট্রেডিং এই টিকা আমদানির প্রস্তাব দিয়েছে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের মডার্নার টিকা আমদানির জন্য রেনাটা লিমিটেড সরাসরি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছে।

সরকার গঠিত কোর কমিটির একজন সদস্য নাম না প্রকাশের শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, সরকারকে খুব দ্রুত অন্তত দুটি টিকা নির্বাচন করতে হবে। এ মুহূর্তে টিকার প্রাপ্তি নিশ্চিত করাটা জরুরি। যেসব দেশে টিকা উৎপাদিত হচ্ছে, সেসব দেশের সঙ্গে সরকারি-বেসরকারি দুই পর্যায়েই যোগাযোগ করে টিকা পাওয়ার সর্বাত্মক চেষ্টা চালাতে হবে।

বিজ্ঞাপন
করোনাভাইরাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন