বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হওয়া পর্যন্ত গণটিকাদানের এই কর্মসূচি চলবে।
আহমদ কায়কাউস, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব

অবশ্য গতকাল গণটিকাদান এক দিনেই শেষ হয়ে গেছে, এমন নয়। রাজধানীর ধানমন্ডিতে একটি টিকাদানকেন্দ্র পরিদর্শনে গিয়ে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব আহমদ কায়কাউস বলেছেন, লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হওয়া পর্যন্ত গণটিকাদানের এই কর্মসূচি চলবে।

গত ৭ ফেব্রুয়ারি দেশে করোনার টিকাদান শুরু হয়েছে। নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম চালানোর পাশাপাশি এখন পর্যন্ত গণটিকাদানের দুটি বিশেষ কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়। গতকালের আগে ৭ থেকে ১২ আগস্ট একটি বিশেষ সম্প্রসারিত কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছিল। তার প্রথম দিনেই ৩০ লাখের বেশি টিকা দেওয়া হয়েছিল। ওই কর্মসূচির প্রথম দিনে গ্রাম, শহর প্রায় সবখানেই মানুষের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। গতকালের বিশেষ কর্মসূচিতে তেমনটা দেখা যায়নি। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কেউ কেউ মনে করছেন, এবারের কর্মসূচি নিয়ে প্রচার–প্রচারণা তুলনামূলক কম হয়েছে।

শহরে ভিড় কম

গতকাল সকাল নয়টা থেকে সারা দেশে এই কর্মসূচি শুরু হবে—এমন ঘোষণা ছিল। কিন্তু ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে (ডিএনসিসি) টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয় বেলা আড়াইটায়। অবশ্য গত সোমবার সন্ধ্যা সাতটার দিকে এ বিষয়ে গণমাধ্যমে বিজ্ঞপ্তি দিয়েছিল ঢাকা উত্তর সিটি।

যদিও অনেকের কাছেই সময়সূচি পরিবর্তনের এই তথ্য যথাসময়ে পৌঁছায়নি। এর ফলে সকালে টিকা দিতে গিয়ে অনেককে ফিরে যেতে হয়েছে। ঢাকা উত্তর সিটিতে ৫৪টি ওয়ার্ডে এবং তিনটি বস্তিতে এই কর্মসূচির মাধ্যমে দুই দিনে ৬০ হাজার টিকা দেওয়ার লক্ষ্য ছিল। গত রাতে এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কত টিকা দেওয়া হয়েছে, তা জানা যায়নি।

গতকাল ঢাকা উত্তরের ২৯, ৩০, ৩১, ৩৩ ও ৩৪ নম্বর ওয়ার্ডের পাঁচটি টিকাদানকেন্দ্র ঘুরে দেখেছেন প্রথম আলোর তিনজন প্রতিবেদক ও আলোকচিত্রী। এর মধ্যে শুধু ৩৪ ওয়ার্ডের রায়েরবাজার কমিউনিটি সেন্টার টিকাদানকেন্দ্রে মানুষের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। বাকি কেন্দ্রগুলোতে খুব একটা ভিড় ছিল না। ঢাকা উত্তর সিটি জানিয়েছে, টিকাদানের বিশেষ এই কর্মসূচি আজ বুধবারও চলবে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে অবশ্য সকাল নয়টা থেকেই কর্মসূচি শুরু হয়। এখানকার ৭৫টি কেন্দ্রে ৫২ হাজার ৫০০ ডোজ টিকা দেওয়ার লক্ষ্য ছিল। ঢাকা দক্ষিণ সিটি জানিয়েছে, গতকাল তারা মোট ২৮ হাজার ৭০২ জনকে টিকা দিয়েছে। বিশেষ এই কর্মসূচি আর বাড়ছে না।

সিলেট সিটি করপোরেশন এলাকায় বেশ কিছু কেন্দ্রে সকালের দিকে ভিড় দেখা গেলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে ভিড় কমে যায়। ৮২টি কেন্দ্রের প্রতিটিতে ৩০০ থেকে ৫০০ ডোজ টিকা দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু অনেক কেন্দ্রে ১০০-১৫০ ডোজ করে টিকা দেওয়া হয়েছে। আজ বুধবারও নগরীর ২৭টি ওয়ার্ডে এই কর্মসূচি চলবে।

সিলেট সিটির ১৩ নম্বর ওয়ার্ডের মির্জাজাঙ্গাল কেন্দ্রে দুপুর ১২টার দিকে তিনজন টিকাগ্রহীতার উপস্থিতি দেখা গেছে। ওয়ার্ড কাউন্সিলর শান্তনু দত্ত বলেন, গত মাসে গণটিকা কার্যক্রমে যেভাবে চাপ ছিল, এবার তার উল্টো। তার এলাকায় সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত সময়ে ৭০ জনের মতো টিকা নেন।

সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা মো. জাহিদুল ইসলাম বলেন, শহরে ভিড় কিছুটা কমেছে। নগরের প্রায় ২ লাখ ৪০ হাজার মানুষ টিকা নিয়েছেন। আবার সিলেট প্রবাসী–অধ্যুষিত হওয়ায় অনেকে নিবন্ধন করেও সিনোফার্মের টিকা হওয়ায় নিচ্ছেন না।

প্রধানমন্ত্রীর জন্মদিন উপলক্ষে টিকাদানের বিশেষ কর্মসূচিতে গতকাল এক দিনে ৭৫ লাখ ডোজ টিকা দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল স্বাস্থ্য বিভাগ।

গ্রামে ভিড়

রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার ভায়ালক্ষ্মীয়পুর ইউনিয়নের টিকাকেন্দ্রে সকাল থেকেই ভিড় ছিল। ভিড় ঠেলে বাইরে এসে রায়পুর গ্রামের গৃহিণী আকলিমা বেগম (৫০) বলছিলেন, ‘সকাল আটটায় আইচি। আমার ডায়াবেটিস, প্রেসার। পায়ে ব্যথা। পায়ের মোদ্দে কটকট কোরতিচে। দাঁড়াতে পারতিছি না। তাই লাইন থাইকি বারা আইছি।’

এর উল্টোচিত্র দেখা গেছে রাজশাহী মহানগরের মহিলা ক্রীড়া কমপ্লেক্স কেন্দ্রে। সেখানে আগের বুথের পাশাপাশি বিশেষ টিকাদান কর্মসূচির জন্য তিনটি নতুন বুথ করা হয়েছে। নতুন বুথগুলোর দুটিতে মাঝেমধ্যে দু-একজন করে এসে টিকা নিয়ে গেছেন। আরেকটি বুথে কোনো মানুষই ছিলেন না। সেখানে একজন স্বেচ্ছাসেবককে টেবিলে মাথা দিয়ে বসে থাকতে দেখা গেছে।

ঢাকা ও সিলেটের মতো রাজশাহী সিটি করপোরেশন এলাকায় টিকা নিতে আসা মানুষের চাপ কম ছিল।

রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা এফ এ এম আঞ্জুমান আরা বেগম বলেন, শহরের ৮০ ভাগ মানুষ আগেই টিকা নিয়েছেন। সেই জন্য টিকা নেওয়ার চাপ কম। তারপরও বলতে হবে, এবার উপস্থিতি একটু কম।

তবে ইউনিয়ন পর্যায়ে ব্যাপক ভিড় ছিল। সকাল সাড়ে আটটায় পুঠিয়া উপজেলার বেলপুকুর ইউনিয়ন পরিষদ চত্বরে গিয়ে দেখা গেছে, টিকা নিতে আসা মানুষের সারি রাজশাহী-নাটোর মহাসড়কে এসে ঠেকেছে। একই অবস্থা দেখা গেছে, চারঘাট উপজেলার নন্দনগাছি ইউনিয়ন পরিষদ ও ভায়ালক্ষ্মীপুর ইউনিয়ন পরিষদ কেন্দ্রে। ভায়ালক্ষ্মীপুর ইউনিয়ন পরিষদ কেন্দ্রের বাইরে টিকা নিতে আসা মানুষের ভ্যান ও রিকশার ভিড়ের কারণে রাস্তায় যানবাহনের স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হয়েছে। পরিষদের সামনে থেকে মানুষের সারি পাশের ডাকরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠ পর্যন্ত চলে গেছে। আবার এই ইউনিয়নের দুটি ওয়ার্ডের টিকাকেন্দ্র করা হয়েছিল ডাকরা হাইস্কুল কেন্দ্রে। ওই স্কুলের মাঠেও ছিল উপচে পড়া ভিড়।

পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলায় সকাল থেকেই ছিল গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি। এর মধ্যেও নাজিরপুর, কালাইয়া ও সূর্য্যমণি ইউনিয়ন পরিষদের টিকাদানকেন্দ্রে অনেক মানুষের উপস্থিতি দেখা গেছে। পটুয়াখালীর স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা প্রশান্ত কুমার সাহা বলেন, গতকাল ২২ হাজার মানুষকে টিকা দেওয়া হয়েছে।

তবে সব ইউনিয়নেই যে প্রচুর ভিড় ছিল, তেমন নয়। গোয়ালন্দ উপজেলার ৫০ শয্যা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, পৌরসভাসহ উপজেলার উজানচর, দৌলতদিয়া, দেবগ্রাম ও ছোটভাকলা ইউনিয়ন পরিষদ কেন্দ্রে টিকা দেওয়া হয়। হাসপাতাল ছাড়া অন্য কেন্দ্রগুলোতে তেমন ভিড় দেখা যায়নি। দৌলতদিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবদুর রহমান মণ্ডল বলেন, কিছুদিন আগে গণটিকাদান কর্মসূচিতে অনেক ভিড় ছিল। এবার তেমন হয়নি।

টিকা না পেয়ে ফিরে গেছেন অনেকে

গোপালগঞ্জের সিভিল সার্জন কার্যালয়ের চিকিৎসা কর্মকর্তা সাকিবুর রহমান বলেন, কিছু কিছু কেন্দ্রে টিকা না পেয়ে অনেকে ফিরে গেছেন। আবার পৌরসভার অধিকাংশ কেন্দ্রে টিকা থেকে গেছে।

ফেনীর সোনাগাজী উপজেলায় গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি উপেক্ষা করে প্রচুর মানুষ কেন্দ্রগুলোতে টিকার জন্য এসেছিলেন। অনেকে টিকা পাননি। অবশ্য তাঁদের অনেকে নিবন্ধন না করেই টিকা নিতে এসেছিলেন বলে জানা গেছে।

টিকার সঙ্গে খাবার

চট্টগ্রামের আনোয়ারার বারশত ইউনিয়ন পরিষদে (ইউপি) টিকা নিলেই পাওয়া গেছে গোলাপ ফুল, মিষ্টি, কেক আর দুপুরের খাবার। স্থানীয় সূত্র জানায়, সকাল থেকে টিকাকেন্দ্রে আসা সবার হাতে গোলাপ তুলে দেন ইউপি চেয়ারম্যান ও স্বেচ্ছাসেবকেরা। এরপর মিষ্টিমুখ করিয়ে টিকার বুথে নিয়ে টিকা দেওয়া হয়। পরে দুপুরে কেক কাটার পর খাবারের আয়োজনও করা হয়।

বারশত ইউপির চেয়ারম্যান এম এ কাইয়ুম শাহ বলেন, ‘আমরা প্রধানমন্ত্রীর জন্মদিনে ব্যতিক্রমী আয়োজন করেছি। লোকজন উৎসবমুখর পরিবেশে টিকা নিয়েছেন।’


[প্রতিবেদন তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন প্রথম আলোর সংশ্লিষ্ট এলাকার নিজস্ব প্রতিবেদকপ্রতিনিধিরা]

করোনাভাইরাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন