বিজ্ঞাপন

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীতে করোনা রোগীদের জন্য নির্ধারিত সরকারি হাসপাতাল রয়েছে ১৬টি। এর মধ্যে ৩টি হাসপাতালে আইসিইউ নেই। বাকি ১৩টি হাসপাতালের মধ্যে ৮টিতেই গতকাল কোনো আইসিইউ শয্যা ফাঁকা ছিল না। ৫টি হাসপাতালে ফাঁকা ছিল ৬৫টি আইসিইউ শয্যা।

করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে ডেলটা ধরন (ভারতে উৎপত্তি) ছড়িয়ে পড়ার পর রাজধানীর বাইরে বিভিন্ন জেলায় পরিস্থিতির বেশি অবনতি হয়েছে। এতে জেলা হাসপাতালগুলোতে আইসিইউ না থাকা এবং যেসব হাসপাতালে আইসিইউ আছে, সেখানে অপেক্ষায় থাকতে থাকতে রোগীর মৃত্যুর ঘটনা সামনে আসছিল। এখন দেখা যাচ্ছে, ঢাকার হাসপাতালেও একই পরিস্থিতির তৈরি হচ্ছে। রাজধানীর তিনটি বড় হাসপাতাল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, হাসপাতালে ভর্তি করোনা রোগীদের প্রায় ৫০ শতাংশই ঢাকার বাইরের।

হাসপাতালগুলোর আইসিইউ শয্যা সব সময় রোগীতে পূর্ণ থাকছে। আইসিইউ প্রয়োজন, এমন ১৫ থেকে ২০ জন রোগী সব সময় অপেক্ষমাণ থাকছেন। অনেক ক্ষেত্রে রোগীর অবস্থা সংকটাপন্ন হওয়ার পর হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। রোগীর জরুরি ভিত্তিতে আইসিইউ দরকার। তবে শয্যা খালি নেই। রোগী একপর্যায়ে মারা যান।

সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপাধ্যক্ষ ও করোনা চিকিৎসার সমন্বয়কারী অধ্যাপক শাহাদাত হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, মাসখানেক ধরে কোনো আইসিইউ শয্যা খালি থাকছে না। সব সময় ১৫ থেকে ২০ জন অপেক্ষমাণ থাকছেন। আইসিইউতে ভর্তি কেউ সুস্থ হলে বা মারা গেলে সঙ্গে সঙ্গে আরেকজনকে দেওয়া হচ্ছে। অপেক্ষমাণ থাকতে থাকতে মৃত্যুর ঘটনা নেই, তা বলা যাবে না।

গতকাল ওই তিনটি বড় হাসপাতালে করোনা চিকিৎসাসেবা পরিস্থিতি ঘুরে দেখেন প্রথম আলোর দুজন প্রতিবেদক। তাঁরা ঢাকা ও ঢাকার বাইরে থেকে ভর্তি হতে আসা এবং হাসপাতালে ভর্তি থাকা করোনা রোগীর স্বজন ও চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলেন। গতকাল এই তিন হাসপাতালের ৫৪টি আইসিইউ শয্যার একটিও ফাঁকা ছিল না। আর ১ হাজার ৩১৮টি সাধারণ শয্যার মধ্যে ১৬৪টি ফাঁকা ছিল।

একটি আইসিইউর জন্য অপেক্ষা

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ২ নম্বর ভবনটি করোনা ওয়ার্ড। সকাল সাড়ে ১০টা থেকে বেলা দুইটা পর্যন্ত দেখা যায়, এ সময়ে ভবনের সামনে রোগী নিয়ে ১৭টি অ্যাম্বুলেন্স এসেছে। এসব রোগীর কেউ করোনা আক্রান্ত, আবার কারও করোনার উপসর্গ রয়েছে। তাঁরা শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন জটিলতায় ভুগছেন।

১৭টি অ্যাম্বুলেন্সের মধ্যে ১৫টিতে থাকা রোগীদের এ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। বাকি দুজনের আইসিইউ সাপোর্ট প্রয়োজন ছিল। কিন্তু আইসিইউ ফাঁকা নেই বলে তাঁদের ফেরত যেতে হয়েছে। এ ছাড়া আইসিইউ খালি না থাকায় ভর্তি ছিলেন এমন আরও দুজন সংকটাপন্ন রোগীকে অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতাল ছাড়তে দেখা যায়।

রাবেয়া খানমকে সিলিন্ডারের মাধ্যমে অক্সিজেন দেওয়া হচ্ছিল। তাঁর তীব্র শ্বাসকষ্টও ছিল। তিন দিন ধরে তিনি ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি থেকেও আইসিইউতে একটি শয্যা ফাঁকা পাননি। অথচ তাঁর এখনই জরুরি ভিত্তিতে আইসিইউ সেবা প্রয়োজন। গতকাল বেলা তিনটার দিকে তাঁকে এ হাসপাতাল থেকে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেলে নেওয়ার জন্য অ্যাম্বুলেন্সে ওঠানো হয়।

default-image

রাবেয়া খানমের ছেলে লুৎফর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরে তাঁদের বাসা। তাঁর মায়ের করোনা উপসর্গ দেখা দেওয়ায় প্রথমে বারডেমে ভর্তি করা হয়। সেখানে পরীক্ষায় করোনা ধরা পড়ে। শারীরিক অবস্থা আরও খারাপ হওয়ায় আইসিইউ সাপোর্ট প্রয়োজন হয়। কিন্তু ঢাকা মেডিকেলে আইসিইউ খালি নেই।

বেলা দেড়টার দিকে ঢাকা মেডিকেলের করোনা ইউনিট থেকে বের করে সামনে অপেক্ষমাণ অ্যাম্বুলেন্সে তোলা হচ্ছিল নারায়ণ নামের বয়োজ্যেষ্ঠ এক ব্যক্তিকে। তাঁর স্বজনেরা জানান, আইসিইউ ফাঁকা না থাকায় চিকিৎসকেরা তাঁকে অন্য হাসপাতালে নিয়ে যেতে বলেছেন। তাঁরা সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছেন।

সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের করোনা ইউনিটের সামনে বেলা তিনটার দিকে দাঁড়িয়ে কাঁদছিলেন মিথুন মির্জা। কথা বলতে গিয়ে জানা গেল, কিছুক্ষণ আগেই তাঁর মামা আলমগীর হোসেন মারা গেছেন। মিথুন প্রথম আলোকে বলেন, ‘মামার করোনার উপসর্গ ছিল। শুক্রবার রাতে হাসপাতালে নিয়ে আসি। অবস্থা খারাপ হলে ডাক্তার আইসিইউতে নিতে বলে। অনেক ছোটাছুটি করছি একটা আইসিইউর জন্য। কিন্তু কোনো আইসিইউ ফাঁকা ছিল না।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে করোনা রোগীদের জন্য সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে আইসিইউ রয়েছে ১ হাজার ২৯১টি। এর মধ্যে গতকাল ১ হাজার ৫টি আইসিইউতে রোগী ভর্তি ছিল। ঢাকা মহানগরীতে সরকারি আইসিইউ রয়েছে ৩৯৩টি। গতকাল ৬৫টি আইসিইউ ফাঁকা ছিল। এর মধ্যে শুধু ডিএনসিসি কোভিড হাসপাতালে ফাঁকা ছিল ৪৪টি।

মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আইসিইউ ২৪টি। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, জরুরি সংকটাপন্ন রোগীদের এ হাসপাতালে এসে ফেরত যেতে হচ্ছে। ভর্তি সব রোগীরই অক্সিজেন দেওয়া লাগছে। গতকাল ৩০৯ জন করোনা রোগী চিকিৎসাধীন ছিলেন।

মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক অসীম কুমার নাথ প্রথম আলোকে বলেন, ‘তিন সপ্তাহ ধরে সব সময় ভরা থাকছে আইসিইউ এবং এইচডিইউ। যদি একটা খালি হয়, তখন হাসপাতালের সংকটাপন্ন রোগীকে আইসিইউতে নেওয়া হচ্ছে। অনেকেরই আইসিইউ সেবা দরকার, দেওয়া যাচ্ছে না।’

ঢাকার হাসপাতালগুলোতে বাইরের রোগী বাড়ছে

নরসিংদীর শিবপুর উপজেলার সিরু লস্কর (৭৫) হৃদ্‌রোগের সমস্যা নিয়ে গত বুধবার সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে ভর্তি হন। পরীক্ষায় তাঁর করোনা ধরা পড়ে। গতকাল বেলা দুইটার দিকে সিরু লস্কর ও তাঁর ছেলে আল-আমিন লস্কর বসে ছিলেন হাসপাতালের করোনা ইউনিটে ভর্তির অপেক্ষায়। আল-আমিন বলেন, বাবার শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। করোনা ধরা পড়ায় অন্য ওয়ার্ড থেকে এখানে পাঠিয়ে দিয়েছে।

ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও হৃৎপিণ্ডের সমস্যা আছে ৬০ বছর বয়সী আনোয়ারা বেগমের। করোনা আক্রান্ত হয়ে তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। গতকাল দুপুরে ঢাকা মেডিকেলে আনা হয় তাঁকে ভর্তি করাতে। তাঁর মেয়ে শাহনাজ বেগম বলেন, মায়ের শরীরটা ভালো হচ্ছে না। চিকিৎসকদের পরামর্শে ঢাকায় এসেছেন।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নাজমুল হক প্রথম আলোকে বলেন, এখন হাসপাতালে ভর্তি হতে আসা রোগীদের অর্ধেকের বেশি ঢাকার বাইরে থেকে আসা। বেশির ভাগেরই হাই ফ্লো নাজাল ক্যানুলা লাগছে। শয্যাসংখ্যা বাড়িয়েও রোগীর চাপ সামলানো যাচ্ছে না। সকালে ৪০ জন রোগী ছাড়া পেলে দেখা যায় বিকেল নাগাদ আরও ৮০ জন রোগী হাসপাতালে এসে ভর্তির অপেক্ষায় থাকছেন।

ঢাকা মেডিকেল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, রোগীদের চিকিৎসা দিতে গিয়ে হাসপাতালের অক্সিজেন সঞ্চালন লাইনে চাপ পড়েছে। অক্সিজেন ছাড়া কোনো রোগী আসছে না। ১০৭টি হাই ফ্লো নাজাল ক্যানুলা দিয়ে রোগীদের সেবা দেওয়া হচ্ছে। প্রতিদিন আট থেকে দশজন করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছেন এ হাসপাতালে।

গত বছরের জুনে প্রধানমন্ত্রী সব জেলা হাসপাতালে আইসিইউ ইউনিট স্থাপনের নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু ১৩ মাসেও ৩৬টি জেলায় আইসিইউ সুবিধা গড়ে ওঠেনি। এমন একটি জেলা নরসিংদী সদরের বাসিন্দা এম মাহবুব আলম (৭০) করোনায় আক্রান্ত হয়ে শ্বাসকষ্ট নিয়ে ৮ জুলাই ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি হন। ১৫ লিটার করে তাঁর অক্সিজেন দেওয়া লাগছে।

করোনাবিষয়ক জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির সদস্য এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) সাবেক উপাচার্য নজরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘এখনো ৩৬ জেলায় আইসিইউ নেই। সেখানকার রোগীরা কোথায় যাবে? তারা ঢাকায় আসায় চাপ বাড়ছে।’ তিনি বলেন, স্বাস্থ্য বিভাগের গাফিলতিতে রোগী ব্যবস্থাপনার এ হাল। আইসিইউর অপেক্ষায় রোগীর মৃত্যু হলেও তো স্বাস্থ্য বিভাগকে জবাবদিহি করতে হয় না।

করোনাভাইরাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন