default-image

করোনার দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হতেই রায়েরবাজার কবরস্থানে বেড়েছে লাশ দাফনের চাপ। সেখানে করোনায় মৃত্যুবরণ করা লোকজনের জন্য নির্দিষ্ট স্থানে এখন দিনে গড়ে আটটি লাশ দাফন করা হচ্ছে। ভোর থেকে শুরু করে মধ্যরাত পর্যন্ত দাফনের কাজ করতে করতে ক্লান্ত গোরখোদকেরা।

ঢাকার রায়েরবাজারে শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধের পেছনে দেশের সবচেয়ে বড় কবরস্থানটি পরিচালনা করে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। এই কবরস্থানে মোট জমির পরিমাণ প্রায় ৯৬ একর। এখানে কবর দিতে মৃত ব্যক্তির স্বজনদের কোনো ফি বা মাশুল দিতে হয় না। শুধু কবর খোঁড়ার খরচ ও বাঁশ-চাটাই কেনার টাকা দিতে হয়। আর গোরখোদকের কিছু বকশিশ।

উত্তর সিটি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, রায়েরবাজার কবরস্থানে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে গতকাল শনিবার বেলা ৩টা পর্যন্ত করোনায় মারা যাওয়া ২৩১ জনকে দাফন করা হয়েছে। এর মধ্যে শুধু চলতি মাসের প্রথম ১৭ দিনে দাফন করা হয় ১৪০ জনকে। এই কবরস্থানে করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া লোকজনের দাফন শুরু হয় গত বছরের ২৭ এপ্রিল। সেই থেকে এ পর্যন্ত প্রায় এক বছরে দাফন করা হয়েছে ১ হাজার ১৪১ জনকে।

বিজ্ঞাপন

রায়েরবাজারে এখন দিন-রাত চলে কবর খোঁড়া ও করোনায় মারা যাওয়া লোকজনের দাফনের কাজ। মাঝে গত শীতে যখন করোনার সংক্রমণ কমেছিল, তখন দাফনের জন্য আসা লাশের সংখ্যাও কমে যায়। সম্প্রতি আবার বেড়েছে।

রায়েরবাজারে দেড় বছর ধরে গোর খোঁড়ার কাজ করেন ৩৭ বছর বয়সী সিরাজ ভূঁইয়া। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, মহামারির আগে রায়েরবাজার কবরস্থানে দিনে দুই থেকে তিনটি লাশ দাফন হতো। এখন কোনো কোনো দিন ১০টি লাশও আসছে।

রায়েরবাজার কবরস্থানে গোরখোদক আছেন ২৮ জন। তাঁরা জানান, করোনার সংক্রমণ শুরুর আগে এবং প্রথম কয়েক মাস তাঁরা কোদাল দিয়ে নিজেরাই কবর খুঁড়তেন। তবে করোনায় যখন মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ে, তখন চাপ বেড়ে যায়। এ জন্য সিটি করপোরেশন থেকে একটি মাটি খোঁড়ার যন্ত্র বা এক্সকাভেটর দেওয়া হয়।

রায়েরবাজারে গতকাল সকালে গিয়ে দেখা যায়, কবরস্থানে ঢুকতেই হাতের বাম দিকে এক্সকাভেটরটি রাখা। কবরস্থানের উত্তর দিকে
৮ নম্বর ব্লক। ব্লকটি করোনায় মারা যাওয়া লোকজনকে দাফন করার জন্য নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। দেখা গেল, অন্তত ৫০টি নতুন কবর খুঁড়ে রাখা হয়েছে।

রায়েরবাজার কবরস্থানের জ্যেষ্ঠ মোহরার আবদুল আজিজ প্রথম আলোকে বলেন, প্রতিদিনই করোনায় লাশের সংখ্যা বাড়ছে। তাই এক্সকাভেটর দিয়ে আগেই কবর খুঁড়ে রাখা হয়েছে।

রায়েরবাজারে গতকাল বেলা তিনটা পর্যন্ত তিনটি লাশ দাফন হয়। এর মধ্যে একটি ৮২ বছর বয়সী মোয়াজ্জেম হোসেনের। স্বজনেরা জানান, সম্মিলিত সামরিক হাতপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়। মোয়াজ্জেমের মৃতদেহ দাফন করতে এসেছিলেন তাঁর ভাইয়ের ছেলে ফরিদ হোসেন দেওয়ান।
তিনি বলেন, ‘১২ দিন আগেই করোনায় মা মারা গেছেন। চাচাও চলে গেলেন। আমাদের পরিবারটা ভেঙে পড়েছে।’

দেশে করোনার সংক্রমণে গত বছরের ১৮ মার্চ প্রথম মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। শুরুর দিকে রাজধানীতে করোনায় মৃতদের ব্যাপক সুরক্ষা ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে শুধু খিলগাঁও তালতলা কবরস্থানে দাফন করা হতো। অবশ্য সেখানে জায়গার সংকট দেখা দেওয়ায় গত বছরের ২৭ এপ্রিল থেকে রায়েরবাজার কবরস্থানে করোনায় মৃতদের দাফন শুরু হয়। অবশ্য এখন স্বজনেরা চাইলে পছন্দ অনুযায়ী স্থানে করোনায় মৃতদের দাফন করতে পারেন।

রায়েরবাজারের গোরখোদকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এই কবরস্থানে যে ২৮ জন গোরখোদক রয়েছেন, তাঁরা প্রতিদিন দুই পালায় দায়িত্ব পালন করেন। একদল কাজ করেন সকাল ৬টা থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত। আরেক দল কাজ করেন বেলা ২টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত। তবে লাশ এলে মধ্যরাতেও দাফনের কাজ চলে।

দাফনের কাজে নির্ধারিত কোনো পারিশ্রমিক নেই। গোরখোদকেরা জানিয়েছেন, তাঁরা একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অধীনে কাজ করেন। তাঁদের আয় কেবল মৃত ব্যক্তিদের স্বজনদের দেওয়া বকশিশ। কেউ এক হাজার, কেউ কেউ পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত বকশিশ দেন। সেটা সবাই ভাগ করে নেন।

গোরখোদক লিয়াকত সরকার বলেন, গোরখোদকদের মধ্যে কেউ করোনায় আক্রান্ত হয়েছে বলে শনাক্ত হননি। তাঁরা কেউ টিকাও নেননি। কীভাবে টিকা নিতে হয়, তা-ও জানেন না।

বিজ্ঞাপন
করোনাভাইরাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন