default-image

করোনার টিকা গ্রহণের সম্মতিপত্রে করোনার টিকা সম্পর্কে কোনো তথ্য দেওয়া নেই। এটা নজিরবিহীন বলে মন্তব্য করেছেন ওষুধ বিশেষজ্ঞ ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা একে ত্রুটিপূর্ণ সম্মতিপত্র উল্লেখ করে তা দ্রুত পরিবর্তনের কথা বলেছেন।

করোনার টিকা নেওয়ার আগে গ্রহীতাকে একটি সম্মতিপত্রে সই করতে হচ্ছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে টিকা দেওয়ার আগে এ ধরনের সম্মতিপত্র ব্যবহার করা হচ্ছে।

গত বৃহস্পতিবার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) কনভেনশন সেন্টারে ১৯৮ জনকে করোনার টিকা দেওয়া হয়। টিকা দেওয়ার আগে প্রত্যেকের কাছ থেকে একটি করে সম্মতিপত্রে সই নেওয়া হয়। টিকা নেওয়ার জন্য সুরক্ষা ওয়েবসাইটে নিবন্ধন করার সময় এই সম্মতিপত্র দেখা যায়। এ ছাড়া স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য তৈরি করা কোভিড-১৯ টিকাদান সহায়িকাতেও এই সম্মতিপত্র আছে। কিন্তু সম্মতিপত্রের কোথাও বলা নেই একজন ব্যক্তি কোন বিষয়ে সম্মতি দিচ্ছেন।

এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগনিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক ও করোনাবিষয়ক মুখপাত্র অধ্যাপক মো. নাজমুল ইসলাম গতকাল শনিবার প্রথম আলোকে বলেন, ‘সম্মতিপত্রে যে ত্রুটির কথা বলা হচ্ছে, তা দ্রুতই আমরা সংশোধনের চেষ্টা করব।’

‘কোভিড-১৯ টিকা গ্রহণকারীর অবহিতকরণ সম্মতিপত্র’-এ পাঁচটি বিষয়ে সম্মত হয়ে একজন ব্যক্তি করোনার টিকা নেবেন। বিষয়গুলো হচ্ছে: করোনার টিকা সম্পর্কিত তথ্য আমাকে অনলাইন ও সামনাসামনি উপায়ে ব্যাখ্যা করা হয়েছে; আমি সম্মতি দিচ্ছি যে টিকা গ্রহণ ও এর প্রভাব সম্পর্কিত তথ্যের প্রয়োজন হলে আমি তা প্রদান করব; জানামতে আমার কোনো রকম ওষুধজনিত এলার্জি নেই; টিকাদান পরবর্তী প্রতিবেদন/গবেষণাপত্র তৈরির ব্যাপারে অনুমতি দিলাম; এবং আমি স্বেচ্ছায়, সজ্ঞানে এই টিকার উপকারিতা ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পর্কে অবগত হয়ে টিকা গ্রহণে সম্মত আছি।’

এ ছাড়া সম্মতিপত্রে নিবন্ধন নম্বর, নিবন্ধনের তারিখ, জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর, নাম, লিঙ্গ, জন্মতারিখ, বয়স, ঠিকানা লেখার জন্য জায়গা রাখা আছে। কিন্তু টিকা সম্পর্কে কোনো তথ্য তাতে নেই। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএসএমএমইউর একজন বিভাগীয় প্রধান প্রথম আলোকে বলেন, ‘একটি আদর্শ সম্মতিপত্রে ওষুধ বা টিকার সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য থাকে। কিন্তু আমি যে সম্মতিপত্রে সই করেছি, তাতে তা ছিল না। আমি যখন নিবন্ধন করি, তখন আমাকে এসব ঝুঁকি সম্পর্কে কেউ ব্যাখ্যা করেনি।’ ওই অধ্যাপক ২৮ জানুয়ারি দুপুর ১২টার দিকে বিএসএমএমইউ কনভেনশন সেন্টারে টিকা নেন।

বিজ্ঞাপন

সম্মতিপত্রে টিকা সম্পর্কে কোনো তথ্যের উল্লেখ না থাকাকে বড় ধরনের বিচ্যুতি বলে মন্তব্য করেছেন বিএসএমএমইউর ফার্মাকোলজি বিভাগের অধ্যাপক মো. সায়েদুর রহমান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘সম্মতিপত্রে একধরনের দায়মুক্তি দেওয়া হয়। একজন ব্যক্তি কোন কোন বিষয়ে সম্মতি দিচ্ছেন, তা সম্মতিপত্রে লেখা থাকতে হবে। টিকার কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকলে বা কোনো ধরনের ঝুঁকি থাকলে তা স্পষ্ট করে উল্লেখ করতে হবে। সেসব জানার পরই একজন ব্যক্তি সম্মতি দিতে পারেন। অথবা সম্মত না হয়ে টিকা নেওয়া থেকে বিরত থাকতে পারেন।’

সম্মতিপত্রে এক জায়গায় বলা আছে, ‘করোনার টিকা সম্পর্কিত তথ্য আমাকে অনলাইন ও সামনাসামনি উপায়ে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।’ এ বিষয়ে অধ্যাপক মো. সায়েদুর রহমান বলেন, ‘টিকার তথ্য একজন জানবেন এটা ধরে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু অনলাইনে নিবন্ধন করার সময় কীভাবে জানবেন, তা স্পষ্ট নয়। অন্যের মাধ্যমে নিবন্ধন করলে জানার সম্ভাবনা আরও কম। অন্যদিকে সামনাসামনি কে ব্যাখ্যা করবে, তা বলা নেই। কেউ ব্যাখ্যা করবে এমন নিশ্চয়তাও নেই।

নিরাপদ ও কার্যকর নতুন টিকা উদ্ভাবনে বছরের পর বছর পার হয়ে যায়। এক বছরের কম সময়ে বিজ্ঞানীরা করোনার টিকা উদ্ভাবন করেছেন। গত ডিসেম্বর থেকে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম করোনার টিকাদান শুরু হয়। ১৬ জানুয়ারি থেকে ভারতেও টিকা দেওয়া শুরু হয়েছে। এসব দেশেও টিকা নেওয়ার আগে গ্রহীতাকে সম্মতিপত্রে সই দিতে হচ্ছে।

যুক্তরাজ্যে যে সম্মতিপত্র ব্যবহার করা হচ্ছে তার শুরুতেই টিকার উপকারিতা সম্পর্কে বলা আছে। তাতে বলা আছে: কোভিড-১৯ টিকা কোভিড-১৯ রোগের ভোগান্তি কমাবে। টিকা দেওয়ার পরও মানুষ করোনায় আক্রান্ত হতে পারে। গর্ভবতী নারী টিকা নিতে চাইলে একটি ওয়েবসাইট দেখে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। আরও বলা আছে, অন্যান্য ওষুধের মতো টিকারও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে। তবে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া মৃদু ও ক্ষণস্থায়ী। সবার এই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দেবে না। এরপর বলা আছে, আমি এই সম্মতিপত্র পাঠ করে টিকা নিতে সম্মত হয়েছি।

যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের স্বাস্থ্য বিভাগ দুই পাতার যে সম্মতিপত্র ব্যবহার করছে তাতে বলা আছে, কোভিড-১৯ টিকাবিষয়ক তথ্য আমাকে দেওয়া হয়েছে, আমি তা পড়েছি বা আমার কাছে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। আমার কাছে টিকার উপকারিতা ও ঝুঁকি সম্পর্কে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

করণীয় সম্পর্কে জানতে চাইলে অধ্যাপক মো. সায়েদুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার জনসাধারণকে কোভিড-১৯ টিকা সম্পর্কে সচেতন করার জন্য সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন দিচ্ছে। সেখান থেকে প্রয়োজনীয় দুটো অনুচ্ছেদ সম্মতিপত্রের ওপরের দিকে রাখলেই এটি পূর্ণাঙ্গ ও গ্রহণযোগ্য হবে।

করোনাভাইরাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন