দেশে করোনার টিকায় বয়স্কদের গুরুত্ব কম, মৃত্যু বেশি
দেশে ৬০ বছরের বেশি বয়সীদের মধ্যে করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুহার বেশি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, এই বয়সীদের ৩১ শতাংশ এখনো এক ডোজও করোনার টিকা পাননি। গবেষকেরা বলছেন, দেশে করোনার টিকা বিতরণ পরিকল্পনায় বয়স্কদের ব্যাপারে কম গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, গতকাল শনিবার পর্যন্ত দেশে করোনায় মৃত্যু হয়েছে ২৮ হাজার ৯৪৪ জনের। এঁদের মধ্যে ১৬ হাজার ১১৩ জনের বা ৫৬ শতাংশের বয়স ৬০ বছরের বেশি।
সারা বিশ্বে করোনায় মৃত্যু বেশি দেখা গেছে বয়স্কদের মধ্যে। জনস্বাস্থ্যবিদ ও চিকিৎসকেরা বলছেন, বয়স্কদের মধ্যে ডায়াবেটিস, ক্যানসার, হৃদ্রোগ, দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসতন্ত্রের রোগের প্রকোপ বেশি। এসব রোগ থাকা ব্যক্তিদের করোনা সংক্রমণ ঘটলে তাঁদের মৃত্যুঝুঁকি বেশি। এটি বৈশ্বিক প্রবণতা। এই প্রবণতা বাংলাদেশেও দেখা গেছে।
বিভিন্ন হাসপাতালে এখন যাঁরা মারা যাচ্ছেন, তাঁদের তিন-চতুর্থাংশের বয়স ৬০ বছর বা এর বেশি। গত দুই সপ্তাহে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক এ বি এম খুরশীদ আলম একাধিক অনুষ্ঠানে বলেছেন, যাঁরা মারা যাচ্ছেন, তাঁদের ৮৫ শতাংশ করোনার টিকা নেননি।
দেশি-বিদেশি গবেষকদের প্রবন্ধেও বয়স্ক বা করোনা সংক্রমণের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর টিকা কম পাওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে। অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব নিউসাউথ ওয়েলস, ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি ও ওয়েস্টার্ন সিডনি ইউনিভার্সিটি, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের জেমস পি গ্রান্ট স্কুল অব পাবলিক হেলথ এবং নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাতজন গবেষক বলেছেন, বাংলাদেশে বয়স্ক জনগোষ্ঠীর মধ্যে করোনার টিকাদানের হার খুবই কম। গবেষণায় তাঁরা ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর মাসের তথ্য ব্যবহার করেছেন। তাঁদের গবেষণা প্রবন্ধটি গত শুক্রবার হিউম্যান ভ্যাকসিন অ্যান্ড ইমিউনোথেরাপিউটিকসে প্রকাশিত হয়েছে।
ওয়েস্টার্ন সিডনি ইউনিভার্সিটির স্কুল অব হেলথ সায়েন্সেসের গবেষক নাজমুল হুদা মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের গবেষণা পাঁচ মাস আগের হলেও তা বাংলাদেশের জন্য প্রাসঙ্গিক। বাংলাদেশে বয়স্করা করোনার টিকা কম পেয়েছেন। টিকা প্রয়োগ পরিকল্পনায় বয়স্করা গুরুত্ব কম পেয়েছেন।’
গবেষকদের এমন দাবি অস্বীকার করেছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের টিকাবিষয়ক কমিটির সভাপতি অধ্যাপক মীরজাদী সেব্রিনা। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘গত সেপ্টেম্বর মাসের দিকে আমাদের টিকা প্রাপ্তির বিষয়ে সমস্যা ছিল। পাঁচ-ছয় মাসে পরিস্থিতির অনেক উন্নতি হয়েছে। বয়স্কদের ব্যাপারে আমাদের গুরুত্ব কম ছিল না।’
যদিও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্য বলছে, গতকাল পর্যন্ত ৬০ বছর বা এর বেশি বয়সীদের ২৩ শতাংশ এখনো টিকার নিবন্ধনের আওতায় আসেননি। এই বয়সীদের ৩১ শতাংশ এখনো এক ডোজ টিকাও পাননি। আর পূর্ণ দুই ডোজ পাননি ৪৭ শতাংশ। অর্থাৎ যাঁদের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি, তাঁদের একটি বড় অংশ টিকা পাননি।
বয়স্কদের কম টিকা পাওয়ার কারণ হিসেবে ওই গবেষণা প্রবন্ধে বলা হয়েছে, টিকা বিতরণ পরিকল্পনায় বয়স্ক ব্যক্তিরা গুরুত্ব কম পেয়েছেন। টিকা প্রয়োগ পরিকল্পনার প্রথম ধাপের প্রথম পর্যায়ে বয়স্ক ব্যক্তিরা অগ্রাধিকার পাননি। টিকা দেওয়ার ক্ষেত্রে বৈশ্বিক অঙ্গনে বাংলাদেশের সুনাম থাকলেও বয়স্কদের দেওয়ার জন্য করোনার টিকা পরিবহন, সরবরাহ ও বিতরণের সক্ষমতা কম। এ ছাড়া গ্রামাঞ্চলে অতিশীতল তাপমাত্রায় টিকা রাখার ব্যবস্থা নেই। টিকার ব্যাপারে ভুল ধারণা থাকার কারণেও অনেকে টিকা নেওয়া থেকে বিরত থেকেছেন বলে গবেষণা প্রবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে।
গবেষক নাজমুল হুদা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সর্বশেষ পরিসংখ্যান উদ্ধৃত করে প্রথম আলোকে বলেন, কম্বোডিয়ার অর্থনৈতিক অবস্থা বাংলাদেশের মতোই। ইতিমধ্যে কম্বোডিয়ার ৬০ বছরের বেশি বয়সী ১০০ শতাংশ মানুষ প্রথম ডোজ এবং ৯৯ শতাংশ মানুষ দ্বিতীয় ডোজ টিকা পেয়েছেন। এ রকম উদাহরণ আরও আছে। বাংলাদেশ শুরু থেকেই টিকা দেওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার ঠিক করতে পারেনি।