করোনা সংক্রমণ মোকাবিলায় দেশে এক বছরের বেশি সময় ধরে টিকাদান কার্যক্রম চলছে। এরই মধ্যে বাংলাদেশ টিকা দেওয়ার ক্ষেত্রে ভারতকে পেছনে ফেলেছে। সর্বশেষ গতকাল রোববার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশ জনসংখ্যার ৭৫ শতাংশকে প্রথম ডোজ এবং ৬৭ শতাংশকে পূর্ণ দুই ডোজ টিকা দিয়েছে। ভারতে এ হার যথাক্রমে ৭০ ও ৫৯ শতাংশ। বাংলাদেশ পূর্ণ দুই ডোজ টিকা দেওয়ার ক্ষেত্রে শ্রীলঙ্কা, নেপাল ও মিয়ানমারকেও পেছনে ফেলেছে। শুধু ভুটান প্রথম ও দ্বিতীয় ডোজ দেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে আছে।

শুরুর দিকে টিকাদানে কিছুটা হোঁচট খেয়েছিল বাংলাদেশ। মূলত টিকাপ্রাপ্তির একক উৎস ছিল ভারত। দেশটির সেরাম ইনস্টিটিউট থেকে ৫ মার্কিন ডলার বা ৪৩০ টাকা দামে প্রতি ডোজ টিকা কেনা হচ্ছে—এ তথ্য স্বাস্থ্য বিভাগ সে সময় জানিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে সরকার একাধিক উৎস থেকে টিকা সংগ্রহ করে এবং কেনে। এতে টিকাদানে গতি আসে। যদিও এসব টিকার উৎস ও পরিমাণ বিভিন্ন সময় স্বাস্থ্য বিভাগ প্রকাশ করলেও দাম নিয়ে কোনো তথ্য তারা জানায়নি।

কত দামে টিকা

দেশে টিকাদান শুরুর ৯ মাস পর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আয়োজিত ওই ভার্চ্যুয়াল অনুষ্ঠানে দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের আটটি দেশের টিকা কেনার ব্যয়ের হিসাব তুলে ধরা হয়। এ অঞ্চলের দেশ না হওয়ায় পাকিস্তানকে ওই তালিকায় রাখা হয়নি। দেড় ঘণ্টার বেশি সময় ধরে চলা ওই অনুষ্ঠানে শুরুতে বক্তব্য দেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আঞ্চলিক কার্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থায়ন ও সুশাসন শাখার আঞ্চলিক উপদেষ্টা ভ্যালেরিয়া ডি ওলিভেরা ক্রুজ। তিনি বলেন, কোভিড-১৯ টিকাদান সফল ও টেকসই করতে নীতি সহায়তায় জন্য এ আয়োজন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিভিন্ন অঞ্চলের কর্মকর্তারা এতে অংশ নেন। মূল তিনটি উপস্থাপনার একটিতে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের বিভিন্ন দেশের টিকা কেনা ও টিকাদান কর্মসূচি পরিচালনার ব্যয় নিয়ে আলোচনা হয়। অনুষ্ঠানে বলা হয়, বিভিন্ন দেশ ও অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা করে ব্যয়ের হিসাব তৈরি করা হয়েছে। ব্যয়ের ক্ষেত্রে কিছু তারতম্য হতে পারে বলেও অনুষ্ঠানে জানানো হয়।

অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, ইন্দোনেশিয়া, মালদ্বীপ, মিয়ানমার, নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও থাইল্যান্ডের প্রতি ডোজ টিকা কেনার হিসাব উপস্থাপন করা হয়। তাতে দেখা যায়, সবচেয়ে কম দামে টিকা কিনেছে নেপাল। দেশটি প্রতি ডোজ করোনার টিকা কিনেছে বাংলাদেশি ৩৬২ টাকা দামে। বাংলাদেশের পর সবচেয়ে বেশি টাকা দিয়ে টিকা কিনেছে ইন্দোনেশিয়া। দেশটি প্রতি ডোজ টিকা কিনেছে ১ হাজার ৫৫৯ টাকা করে। ভারত প্রতি ডোজ কিনেছে ৪৩৯ টাকা দামে।

বাংলাদেশ উপহার, অনুদান, ভাগাভাগির মাধ্যমে কেনা এবং সরাসরি কেনা—এ চার উপায়ে টিকা পেয়েছে। গত শনিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে এ পর্যন্ত মোট ২৯ কোটি ৬৪ লাখ ৯৫ হাজার ডোজ টিকা এসেছে।

৯ কোটি ২০ লাখ ৬ হাজার টিকা বাংলাদেশ সরাসরি চীন ও ভারত থেকে কিনেছে। সরাসরি কেনার বাইরে স্বাস্থ্য বিভাগ আরও ৮ কোটি ৭১ লাখ ৮৭ হাজার ডোজ টিকা কিনেছে ব্যয় ভাগাভাগির মাধ্যমে। এতে ভর্তুকি দিয়েছে করোনার টিকা সংগ্রহ ও বিতরণবিষয়ক বৈশ্বিক উদ্যোগ কোভ্যাক্স। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলেছেন, এ টিকা কেনা হয়েছে চীন থেকে। টিকা কেনায় সহায়তা করে ইউনিসেফ। সরাসরি ও কোভ্যাক্সের মাধ্যমে মোট ১৭ কোটি ৯১ লাখ ৯৩ হাজার ডোজ টিকা কেনা হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ওই সভায় ভাগাভাগি ও সরাসরি কেনা টিকার দামের আলাদা হিসাব দেওয়া হয়নি।

প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশ কেন বেশি দামে টিকা কিনল, সে বিষয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম প্রথম আলোকে বলেন, তিনি টিকার দামের ব্যাপারে নেগোসিয়েশন বা আলাপ–আলোচনা করেননি, করেছে মন্ত্রণালয়। এ ব্যাপারে না জেনে মন্তব্য করা ঠিক হবে না বলে তিনি জানান।

যদিও স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষে টিকা কেনার চুক্তিতে সই করেছিলেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক। সে বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক প্রথম আলোকে বলেন, ওটা ছিল ‘নন–ডিসক্লোজার অ্যাগ্রিমেন্ট’। অর্থাৎ এমন চুক্তির শর্ত প্রকাশ করতে নেই।

জাতীয় সংসদের একাধিক অধিবেশনে টিকার দাম নিয়ে কথা উঠেছে। একাধিক সাংসদ টিকার দাম জানতে চেয়েছেন। সংসদে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেছেন, ‘নন–ডিসক্লোজার’ চুক্তির কারণে টিকার দাম প্রকাশ করা যাবে না।

টিকা উৎপাদন, টিকা কেনা, অনুদান পাওয়া—এসব বিষয় নিয়ে বৈশ্বিকভাবে আলাপ–আলোচনা শুরু হলে বাংলাদেশ ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট থেকে টিকা কেনার প্রাথমিক উদ্যোগ নেয়। ওই সময় অনেকে অভিযোগ করেছিলেন, টিকার ব্যাপারে বাংলাদেশের এককভাবে ভারতের ওপর নির্ভরতা ভুল ছিল। ভারতে টিকার বিপুল চাহিদা থাকার কারণে সেরাম ইনস্টিটিউট টিকা রপ্তানি স্থগিত করে দেয়। সমস্যার মুখোমুখি হয় বাংলাদেশ। বাংলাদেশ টিকার জন্য সম্ভাব্য সব উৎস খুঁজতে থাকে। স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা বলেছেন, যেকোনো মূল্যে টিকা পাওয়া নিশ্চিত করাই তখন গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব লোকমান হোসেন মিয়া গত কয়েক মাসে একাধিক অনুষ্ঠানে বলেছেন, টিকা কেনায় প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা খরচ হয়েছে। সর্বশেষ গত ২৩ ফেব্রুয়ারি দুবলারচরের জেলেদের করোনার টিকা দেওয়ার অনুষ্ঠানে তিনি একই কথা বলেছিলেন।

অন্যদিকে গত ১০ মার্চ রাজধানীর জাতীয় কিডনি রোগ ও ইউরোলজি ইনস্টিটিউটে কিডনি দিবসের অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেন, করোনার টিকা কেনা ও টিকাদান কার্যক্রম মিলে সরকারের প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। টিকা কেনা ও টিকা কার্যক্রমে পৃথকভাবে কত খরচ হয়েছে, তা অবশ্য স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেননি।

বাংলাদেশের প্রতি ডোজের টিকার দামের বিষয়ে জানতে গত শনিবার মুঠোফোনে যোগাযোগ করে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি।

টিকা কেনায় যেমন খরচ হয়েছে, টিকাদান কার্যক্রম পরিচালনাতেও খরচ আছে। ইউনিসেফ টিকাদান কর্মসূচি পরিচালনা করতে কোন কোন খাতে খরচ হয়, তার একটি তালিকা তৈরি করেছে। তার মধ্যে আছে জনবল, অনিয়মিত কর্মীদের সম্মানী, জনসচেতনতা তৈরি, পরিবহন, সিরিঞ্জ ও অন্যান্য সামগ্রী, নিয়মিত ক্লোন্ড চেইন, কারিগরি সহায়তা, হাত পরিষ্কার রাখার ব্যবস্থা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পরিকল্পনা ও সমন্বয়, টিকা সনদ, ব্যক্তিগত সুরক্ষাসামগ্রী (পিপিই), টিকার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ, আলট্রা কোল্ড চেইন ও প্রশিক্ষণ।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ওই অনুষ্ঠানে বলা হয়, টিকাদান কার্যক্রম পরিচালনায় সবচেয়ে বেশি খরচ হয় বাংলাদেশে। অন্যদিকে সবচেয়ে কম খরচ হয় মালদ্বীপে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল রোববার পর্যন্ত দেশে প্রথম ডোজ টিকা পেয়েছেন ১২ কোটি ৮২ লাখ মানুষ, দ্বিতীয় ডোজ পেয়েছেন ১১ কোটি ৫০ লাখ মানুষ। আর বুস্টার ডোজ পেয়েছেন ১ কোটি ৭ লাখ মানুষ।