চমেক হাসপাতালে গতকাল বেলা পৌনে দুইটায় দেখা গেল, নাজমা চিকিৎসকের কক্ষের সামনে দেয়ালে মাথা এলিয়ে কাঁদছেন। তিনি জানান, করোনায় আক্রান্ত স্বামীকে গত রোববার হাসপাতালে নিয়ে এসেছেন। গতকাল সকাল থেকে শ্বাসকষ্ট বেড়ে যাওয়ায় চিকিৎসকেরা আইসিইউতে ভর্তি হতে বলেন, কিন্তু সেটা পারছেন না।

নাজমার স্বামী কনটেইনারবাহী লরির চালক। তাঁর আয়েই সংসার চলে। এই দম্পতির চার সন্তান—তিনটি মেয়ে, একটি ছেলে। স্বামীর জন্য আইসিইউর ব্যবস্থা করতে না পেরে অসহায় নাজমা কাঁদছিলেন। আর বলছিলেন, ‘আমি এখন কী করব?’

চট্টগ্রাম দেশের দ্বিতীয় প্রধান শহর, বাণিজ্যিক রাজধানী। সেই শহরে সরকারি হাসপাতালে স্বজনেরা চিকিৎসকের পরামর্শের পরও রোগীর জন্য আইসিইউর ব্যবস্থা করতে পারছেন না। এমনই নানা সংকট আর সমস্যা নিয়ে করোনার চিকিৎসা চলছে রাজশাহী, খুলনা, কুষ্টিয়া, সাতক্ষীরা, বরিশাল ও ময়মনসিংহের করোনা চিকিৎসায় নিবেদিত সরকারি হাসপাতালে। কোথাও আইসিইউ দরকার, সিট খালি নেই; কোথাও অক্সিজেন দেওয়া জরুরি, সিলিন্ডারের অভাব; কোথাও রোগীর চিকিৎসা জরুরি, তবে চিকিৎসকের ঘাটতি। কোথাও মেঝেতে রোগীকে ঠাঁই দিতে হয়েছে, কোথাও তীব্র শ্বাসকষ্টে থাকা রোগীকে ভর্তিতেই অনেকটা সময় পেরিয়ে যাচ্ছে, কোথাও ওষুধের সংকটও দেখা দিয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার ওই সাতটি হাসপাতাল ঘুরে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।

হাসপাতালগুলোর ফটকে, আঙিনায়, করিডরে, বারান্দায় রোগীর স্বজনেরা উৎকণ্ঠা নিয়ে ছোটাছুটি করছেন। একটু পরপর রোগী আসছেন, নিয়মিত বিরতিতে মানুষের লাশ নিয়ে অ্যাম্বুলেন্স বেরিয়ে যাচ্ছে। মানুষকে বাঁচাতে চিকিৎসক–নার্সদের আপ্রাণ চেষ্টা আছে। আবার কোথাও কোথাও অবহেলার অভিযোগও আছে। কর্তৃপক্ষ বলছে, এত কম জনবল দিয়ে কি এত রোগী সামলানো যায়!

যেমন বরিশাল বিভাগের সবচেয়ে বড় চিকিৎসাকেন্দ্র বরিশাল শের–ই–বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালকে কয়েক বছর আগে এক হাজার শয্যায় উন্নীত করা হয়। তবে জনবল এখনো সেই ৩৫০ শয্যার। হাসপাতালটিতে এখন প্রতিদিন গড়ে দুই হাজারের বেশি রোগী ভর্তি থাকছেন। এর ওপরে করোনার জন্য ৩০০ শয্যার আলাদা ইউনিট খোলা হয়েছে। পুরোনো ৩৫০ শয্যার জনবলকাঠামো অনুযায়ী এই হাসপাতালে চিকিৎসকের মোট পদ ২২৪টি, কর্মরত মাত্র ১১৮ জন।

হাসপাতালের পরিচালক এইচ এম সাইফুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘চিকিৎসক–কর্মচারীর সংকটের কথা আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি।’

বাবা একটা জায়গা (শয্যা) খুঁজে দেও না। তুমার (তোমার) চাচা একটু শুবে (শোবে)।
আরিফা খাতুন, রোগীর স্বজন

‘একটা জায়গা (শয্যা) খুঁজে দেও না বাবা’

কুষ্টিয়ায় করোনা রোগীদের জন্য নিবেদিত সরকারি জেনারেল হাসপাতালে ২৫০টি শয্যার বিপরীতে গতকাল রোগী ভর্তি ছিলেন ২৮৬ জন। অনেকের ঠাঁই হয়েছিল মেঝেতে। দুপুর ১২টার দিকে গিয়ে দেখা যায়, করোনা ওয়ার্ডের সামনে বারান্দায় দেয়ালে হেলান দিয়ে জোরে জোরে নিশ্বাস নিচ্ছেন আবদুল হান্নান নামের এক ব্যক্তি, বয়স ৬০ বছরের বেশি। পাশে বসে তাঁর স্ত্রী আরিফা খাতুন হাতপাখা দিয়ে বাতাস করছেন। কাছে যেতেই আরিফা খাতুনের আকুতি, ‘বাবা একটা জায়গা (শয্যা) খুঁজে দেও না। তুমার (তোমার) চাচা একটু শুবে (শোবে)।’

করোনা ওয়ার্ডে শয্যা খালি নেই। বারান্দায়ও রোগী। পা ফেলার জায়গা পাওয়াও কঠিন। পরে হাসপাতালে একজন স্বেচ্ছাসেবকের সহায়তায় হান্নানের স্থান হয় মেঝের এক জায়গায়।

হাসপাতালটির বারান্দার মেঝেতে যখন ৮০ জনের মতো রোগী, তখন বেলা একটার দিকে মুষলধারে বৃষ্টি নামল। রোগীদের গায়ে বৃষ্টির ছটা আসতে শুরু করল। স্বজনেরা ব্যস্ত হয়ে পড়লেন রোগীকে ভিজে যাওয়া থেকে রক্ষা করতে। ৭০ বছর বয়সী সাইফুদ্দীন বিশ্বাসের ছেলে আরিফ হোসেনকে দেখা গেল, বৃষ্টির ছটা ঠেকাতে বারান্দার গ্রিলে কাঁথা টানিয়ে দিচ্ছেন। আর তাঁর মেয়ে ফারহানা পারভীন তাঁর বাবাকে আড়াল করে রাখছেন, যাতে পানি গায়ে না লাগে। বারান্দায় ঠাঁই হওয়া রোগীদের অনেককে বৃষ্টির পানিতে ভিজতেই হলো।

হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা তাপস কুমার সরকার বলেন, বৃষ্টির ছটা যাতে ঢুকতে না পারে, তা নিশ্চিতের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

কুষ্টিয়ায় কয়েক সপ্তাহ ধরে করোনা পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। তবে হাসপাতালটিতে আইসিইউ সুবিধা নেই বললেই চলে। চিকিৎসকেরা বলছেন, সরকারিভাবে চারটি আইসিইউ শয্যা থাকলেও সেটা নামমাত্র। শুধু শয্যা আছে, কিন্তু প্রয়োজনীয় কোনো যন্ত্রপাতি সংযোগ নেই। এই হাসপাতালে গতকাল সকাল আটটা পর্যন্ত করোনা ও উপসর্গ নিয়ে ১৭ জনের মৃত্যু হয়। হাসপাতালটির একটি ওয়ার্ডে দুপুর ১২টার দিকে চিৎকার শোনা গেল। গিয়ে জানা গেল, একজন মারা গেছেন। কয়েক মিনিট পরেই মারা যান মেঝের আরেক রোগী।

দায়িত্বরত চিকিৎসক আকরামুজ্জামান বলেন, শরীরে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা কমে দুজনের মৃত্যু হয়েছে। দুজনই বয়স্ক। তাঁরা করোনার উপসর্গ নিয়ে অন্তত ১০ দিন বাড়িতে ছিলেন। শেষ সময়ে স্বজনেরা নিয়ে এসেছেন। এমন অনেককে শেষ সময় হাসপাতালে আনলে আর কিছুই করার থাকে না।

বাবাকে নিয়ে একাকী কিশোর

হাসপাতালে রোগী নিয়ে এলেই দ্রুত চিকিৎসা পাওয়া যাবে, বিষয়টি তেমন নয়। দৌড়ঝাঁপ করার পরও অনেক সময় ঠাঁই হয় না। তেমনই একটি চিত্র দেখা গেল সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। ভ্যান, ইজিবাইক ও অটোরিকশায় ৫৫ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে বাবাকে নিয়ে হাসপাতালে এসেছিল কিশোর তাইজুল ইসলাম। সকাল সাড়ে ১১টার দিকে দেখা যায়, হাসপাতালের সামনে জরুরি বিভাগের বেঞ্চে বসে আছে সে ও তার বাবা আফসার মোড়ল (৬০)।

তাইজুল জানায়, গত বুধবার রাতে তাঁর বাবার শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। তাই সে হাসপাতালে নিয়ে এসেছে। হাসপাতালে ঘুরতে ঘুরতে বেলা আড়াইটার দিকে দেখা যায়, করোনা ওয়ার্ডের বাইরে একটি ভাঙা শয্যায় বাবাকে জড়িয়ে ধরে বসে আছে সে। ভর্তি হয়েছে কি না জিজ্ঞেস করতেই কিশোর করুণ স্বরে বলে ‘আধঘণ্টা ধরে ভর্তির জন্য বসে ছিলাম। আপনি আমাদের সঙ্গে কথা বললেন, তাই ডেকে নিয়ে ভর্তি করেছে।’ অবশ্য তখন পর্যন্ত তাইজুলের বাবা কোনো চিকিৎসা পাননি, পেরিয়ে গেছে তিন ঘণ্টা।

সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক কুদরত-ই-খোদা বলেন, ‘ইচ্ছা থাকার পরও সব রোগী ভর্তি করা যায় না। শয্যা না থাকলে নতুন করে বসাতে ও স্থান ঠিক করতে সময় লেগে যায়। তিনি পাল্টা প্রশ্ন করেন, ‘শয্যা বাড়িয়ে কী করব? চিকিৎসক ও অন্যান্য লোকবলসংকট রয়েছে। রোগী ভর্তি করলে তাদের চিকিৎসা তো দিতে হবে?’

শয্যা বাড়িয়ে কী করব? চিকিৎসক ও অন্যান্য লোকবলসংকট রয়েছে।
কুদরত-ই-খোদা, তত্ত্বাবধায়ক, সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল

‘আমরা দিতে পারছি না’

খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কাগজে-কলমে ১৩০ শয্যার। হাসপাতালটিতে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ১৯৩ জন রোগী। রোগীদের প্রয়োজনীয় আইসিইউ সেবা দেওয়া যে সম্ভব হচ্ছে না, তা জানান হাসপাতালটির আইসিইউ ইউনিটের তত্ত্বাবধায়ক দিলীপ কুমার কুন্ডু। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, আইসিইউর সব শয্যাই পূর্ণ থাকে। প্রতিদিন আরও ১৫-২০ জনের আইসিইউ দরকার হয়। তবে আমরা দিতে পারছি না। হাই ফ্লো দিয়ে আবার অক্সিজেন ফ্লো বাড়িয়ে কাজ চালানো হচ্ছে।’

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বুধবার এক দিনেই করোনা ইউনিটে মৃত্যু হয়েছে ১৭ জনের। এটি এই হাসপাতালে এখন পর্যন্ত এক দিনে সর্বোচ্চ মৃত্যুর ঘটনা। অতিরিক্ত রোগীর চাপে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। এর মধ্যে চিকিৎসক–সংকট প্রকট আকার ধারণ করছে বলে দাবি চিকিৎসকদের।

হাসপাতালটির মেডিকেল অফিসার রামীম ইসলাম বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে মানসিক চাপ বেড়ে যায়।

আগেই অক্সিজেন ‘দখল’

বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের করোনা ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা গেল, একজন রোগীর শ্বাসকষ্ট থাকায় তাঁকে অক্সিজেন মাস্ক পরিয়ে সিলিন্ডার থেকে অক্সিজেন দেওয়া হচ্ছে। তাঁর শয্যার নিচে আরও চারটি অক্সিজেন সিলিন্ডার রাখা। আরেক রোগীর সিলিন্ডারের অক্সিজেন প্রায় শেষের পথে। কিন্তু স্বজনেরা চেয়েও পাচ্ছেন না। তাঁরা অক্সিজেনের জন্য ছোটাছুটি করছিলেন।

করোনা ওয়ার্ডে ভর্তি রোগী মনির হোসেনের ভাই এমাদুল হাসান বলছিলেন, ‘অক্সিজেন নিয়ে যে কী অবস্থা চলছে, তা বলে বোঝাতে পারব না। কারও সিটের নিচে ৪-৫টা করে অক্সিজেন সিলিন্ডার মজুত রাখা হয়েছে। আবার কেউ অক্সিজেন চেয়েও পাচ্ছেন না।’

সাড়ে ১১টা থেকে ১টা পর্যন্ত দেড় ঘণ্টা এই হাসপাতাল ঘুরে দেখা গেল, সিঁড়ি, মেঝে থেকে শুরু করে শৌচাগার—সর্বত্র নোংরা-দুর্গন্ধময়। হাতে দুটি বড় প্লাস্টিক বোতল নিয়ে খাওয়ার পানির জন্য ছুটছিলেন রায়হান নামের এক তরুণ। শ্বাসকষ্ট বেড়ে যাওয়ায় মঙ্গলবার তাঁর মাকে এখানে ভর্তি করিয়েছেন। বললেন, ‘এত বড় হাসপাতাল, কিন্তু খাওয়ার পানির জন্য যেতে হয় বাইরে। দুটি নলকূপ থাকলেও তাতে পানি ওঠে না।’

কর্তৃপক্ষ বলেছে, হাসপাতালটিতে অক্সিজেনের সংকট নেই। শয্যার নিচে সিলিন্ডার রেখে দেওয়ার বিষয়টি নজরে আসেনি। এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পরিচ্ছন্নতাকর্মী সীমিত। ফলে পুরো হাসপাতাল পরিচ্ছন্ন রাখা দুঃসাধ্য।

‘এত লাশ দেখিনি’

করোনা সংক্রমণ শুরুর পর ১৬ মাস কেটে গেছে। প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য পাওয়া গেছে অনেক সময়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০২০ সালের ২ জুন এক সভায় প্রতিটি জেলা হাসপাতালে আইসিইউ ইউনিট স্থাপনের নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে প্রতিটি হাসপাতালে ভেন্টিলেটর স্থাপন এবং উচ্চ মাত্রার অক্সিজেন সরবরাহব্যবস্থা বাড়াতে বলেন তিনি। কিন্তু তা পুরোপুরি সম্ভব হয়নি।

এদিকে জেলা ও গ্রামে করোনার ডেলটা ধরন (ভারতে উৎপত্তি) ছড়িয়ে পড়ায় রোগী বাড়ছে। বাড়ছে মৃত্যু। পরিস্থিতি গত ১৬ মাসের মধ্যে এখনই সবচেয়ে ভয়াবহ। দেশে গত বুধবার সকাল আটটা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়ায় ২০১। আর গতকাল সংখ্যাটি ছিল ১৯৯। গতকাল আক্রান্ত ছিল ১১ হাজার ৬৯১ জন, যা এ পর্যন্ত সর্বোচ্চ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইসিইউ, উচ্চমাত্রায় অক্সিজেন দেওয়ার ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত চিকিৎসা সুবিধা ও রোগীদের আগে থেকেই চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে আনা গেলে এত মৃত্যু হতো না। কিন্তু সময় পেরিয়ে গেছে। ঢাকার গোর খোদকেরা এখন বিশ্রাম নেওয়ার সময় পাচ্ছেন। ব্যস্ততা বেড়েছে জেলায় জেলায়। পৌরসভায়–গ্রামে নতুন কবর বাড়ছে।

কুষ্টিয়া কেন্দ্রীয় পৌর কবরস্থানের তত্ত্বাবধায়ক লিয়াকত আলী বললেন, ‘সাধারণ সময়ে দিনে কখনো একটি লাশ দাফনের জন্য আসত, কখনো দুটি। এখন দিনে চার–পাঁচটি লাশ আসছে। এত লাশ আমি আগে কখনো দেখিনি।’

প্রতিবেদনটি তৈরিতে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম, সাতক্ষীরা, বরিশাল, কুষ্টিয়া; প্রতিনিধি, খুলনাময়মনসিংহ অফিস