আমার ১৯ বছরের প্রবাসী ছেলের ইংরেজিতে লেখা মেসেজ, যা আমার কাছে ছেলের চিঠি। আমার হাতে ওই চিঠির অনুবাদ। মা হিসেবে কাজটা অনেক কষ্ট আর দুঃসাধ্য ছিল।

মা,
আমার ভালো লাগে না। আমি দেশে যাব। মা আমি তোমার কাছে যাব। তোমাকে খুব ছুঁতে ইচ্ছে করছে। খুব দেখতে ইচ্ছে করছে তোমাকে। কী ভীষণ একাকিত্ব মা আমার। কী ভীষণ একা আমি মা। জন্ম শৈশব পেরিয়ে আসা কোলাহলের শহরটায় খুব ফিরে যেতে ইচ্ছে করছে। আমার চারপাশে ভয়ংকর এক নীরবতা। তেমন শীত না থাকা শহরটায় যেন আরও গড়িয়ে পড়ছে হিমবরফ।

মৃত্যুর হাতছানি আমার আশপাশে বেশ জোরালো। ওত পেতে অপেক্ষা করছে মৃত্যু তার নিয়মের ব্যস্ততায়। এমনিতেই কানাডার ভ্যাঙ্কুভারের ব্রিটিশ কলম্বিয়া শহরে সুনসান নিস্তব্ধতা প্রায় সর্বকালের। পাহাড়ের গা বেয়ে রাস্তা আর বাড়িঘর। বেশ দূরত্বে দূরত্বে অবস্থান বসতিস্থলের। সমুদ্র আর পাহাড়ে ঘেরা চমৎকার সুন্দর এই শহর। যেটুকুও মানুষের চলাচল ছিল এ শহরে। পৃথিবীতে মৃত্যু পরোয়ানা জারি হওয়ার পর থেকে গা শিউরে ওঠা নির্জনতা এখন সর্বত্র। শুধু গ্রোসারি শপের সামনে কেবল মানুষের কিছুটা গন্ধ পাওয়া যায়। তা–ও কারও সঙ্গে কারও কথা নেই। শব্দ নেই, কোলাহল নেই। অবশ্য চেনা মানুষগুলোও চেনার উপায় নেই। কারণ, যেভাবে মাস্ক পরে সবাই সতর্ক। খুব খেয়াল করলে বোঝা যায়, এই নিরাপদ শহরের মানুষগুলোর চোখ আজ মৃত্যুভয়ে কেমন বিবর্ণ হয়ে আছে।

সব সময়ের চেয়ে আজকাল তোমাকে বেশি বেশি মনে পড়ছে মা। তোমাদের নিয়েও আমার ভয় করে। কী অদ্ভুত, তাই না মা! পৃথিবীতে এখন কোথাও কোনো নিরাপদ শহর–গ্রাম–লোকালয় নেই।

অথচ তুমি সব সময় চাইতে আমার ভবিষ্যৎটা নিরাপদ হোক। নিরাপদ শহরে হোক আমার বসবাস। আমিও তাই চাইতাম। অথচ আজ! কতটা অনিরাপদ আমাদের পৃথিবী। আমাদের পৃথিবীর বিশ্বস্ত নিশ্বাসগুলো। কী ভয়ংকর, তাই না মা!

বাবা কি এখনো বাইরে যায়? বাবাকে বলো ঘরে থাকতে। সাবধানে থাকতে। বাবাকেও খুব দেখতে ইচ্ছে করে মা। সারাটা জীবন আমার সঙ্গে ভয় দেখানো শাসনের দূরত্বে থাকা বাবাকেও আমি যথেষ্ট ভালোবাসি জানো। খুব কষ্ট হয় এই ভেবেও যে আমার জন্য বাবার এত কষ্টের উপার্জনের ইনভেস্টমেন্ট বুঝি বৃথাই যাবে। আমি যদি আর বেঁচে না ফিরি। তোমাদের জন্য কিছুই তো করে যেতে পারলাম না, মা। কেমন অদ্ভুত এক ব্যর্থতা নিয়েই চলে যেতে হবে আমায়। চলে যেতে হবে তোমাদের আদরের স্পর্শ ছাড়াই।

মাঝেমধ্যে একেবারেই ঘুমাতে পারি না, মা। আমি যদি সত্যি অসুস্থ হয়ে পড়ি। কে দেখবে আমাকে? কে আমার মাথায় হাত বোলাবে? কে আমাকে চুমু খাবে মা? কে আমার হাতটা শক্ত করে ধরে বলবে সব ঠিক হয়ে যাবে ইনশা আল্লাহ, বাবা। কে বলবে, এই তো মা আছে তোমার কাছে।

মাগো, আমি কি হেরে যাচ্ছি? আমি কি হেরে যাব, মা?

তুমি সব সময় বলো সাবধানে থেকো। আমি তো এই শহরে একা। আমাকেই দেখতে হয় নিজেকে। আমার খাওয়ার ব্যবস্থা আমাকেই করতে হয়। আমাকে তো কম হলেও বাইরে বেরোতে হয়। বাসা থেকে একটা স্টেশন দূরত্বে আমাদের গ্রোসারি শপ। বাসে করে গিয়ে বিশাল বড় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকি। কখনো কখনো শপে ঢোকার সুযোগ পাওয়ার পরে দেখি আমার প্রয়োজনীয় যথেষ্ট খাবার নেই শপে। আবারও অন্য বেলায় আসতে হয়।

আবার খাবার পেলেও অনেক খাবার একসঙ্গে এনে রাখব কোথায়?
আমরা তো ফ্ল্যাটের কয়েকজন মিলে একটা ফ্রিজ ব্যবহার করি।

তোমাকে সেভাবে কিছু বলি না, তুমি আরও মন খারাপ করবে। শত হোক তোমার ছেলেটা তো তোমার থেকে অনেক দূরে। যেমন আমার থেকে আমার মা–টা।

কী অদ্ভুত, তাই না মা!

আমরা এখন মানুষ ভয় পাই। মানুষ থেকে পালাই। কাউকে ধরা যাবে না, ছোঁয়া যাবে না।

ক্যাম্পাস বন্ধ। ভালো খবর হলো এর মধ্যে অনলাইনে সেমিস্টার ফাইনাল দিচ্ছি। এই রকম মানসিক চাপের মধ্যে লেখাপড়া ও পরীক্ষা! হায়রে জীবন! বাঁচো আর মরো নিয়মের সূচিপত্র চলমানই থাকবে তার কেমিস্ট্রিতে। আমিও চেষ্টা করছি সেই নিয়ত সূচিপত্রের সঙ্গে তাল রেখে চলতে। আসলে কখনো কখনো মৃত্যুভয়কে হার মানিয়ে দেয় জীবনের পরাবাস্তবতা। যেমন আমাদের দেশে সরকারি নিষেধাজ্ঞার মধ্যে ক্ষুধার্ত পেটে রিকশা চালাতে বের হয়ে কান ধরে উঠবস করতে হয় শাস্তি হিসেবে একজন বৃদ্ধকে। জীবন বুঝি আমাদের বেশির ভাগ মানুষের একই সমান্তরালে চলে! পোশাকটা যা একটু ভিন্ন।

আমার আগামী সেমিস্টারও অনলাইনেই ক্লাস হওয়ার সম্ভাবনা আছে। যদি বেঁচে থাকি, মা। এখন তো বাঁচাটাই মুখ্য আমাদের। অথচ মৃত্যুর স্বাদ নেওয়ার পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত জীবনের প্রার্থনায়ই আমাদের নিমগ্ন থাকতে হয়।

কী অদ্ভুত বিস্ময় জীবনের, তাই না মা!

তবু সময় কাটে না মা। সময়গুলোও যেন আগের চেয়ে বেশ ভারি হয়ে গেছে আজকাল। কারণে–অকারণে তোমাকেই খুব দেখতে ইচ্ছে করে। অর্থহীন ইচ্ছেতে ছুঁয়ে থাকতে ইচ্ছে করে তোমাকেই। এখানে এখন কোনো বন্ধুকেও ছোঁয়া যায় না। আচ্ছা মা, কাছে থাকলে তুমিও কি আমাকে ছুঁতে দিতে না তোমাকে?

আমার মাঝেমধ্যে খুব দম বন্ধ হয়ে আসে মা। পৃথিবীর তাবৎ জ্ঞান–বিজ্ঞান–গবেষণা সব আজ থমকে গেল মা। ওইটুকুন করোনা নামক অণুজীবের কাছে!
কী ভয়ার্ত বিস্ময়!

এলোমেলো ভাবনা পোড়ায় আমায়। বর্তমান অসহায়ত্বের কারণেই পোড়ায় জানি। মনে হয় কেন এত কষ্ট করে ফিজিকস, কেমিস্ট্রি, বায়োলজি, গণিত পড়লাম, শিখলাম? কী শিখলাম মা? সব তো ফেইল এখন। বড় বড় সায়েন্টিস্ট বধির হয়ে আছে প্রকৃতির একমাত্র করোনা বিস্ফোরণে!

কেন যেন ছোটবেলার কথা খুব মনে পড়ছে, মা।

কত কষ্ট করেছ তুমি আমাকে নিয়ে। সব মা–ই করেছে। ভোর সাড়ে পাঁচটায় উঠিয়ে তৈরি করে স্কুলে নিয়ে গেছ। সাতটার মধ্যে স্কুলে ঢুকতাম জ্যামের ভয়ে। তোমার কাছে শুনে শুনে মুখস্থ হয়ে গেছে যে মাত্র তিন বছর তিন মাস বয়সে ক্লাস শুরু করেছিলাম আমি। ক্লাসের সব থেকে বয়সে ছোট ছিলাম। আমায় স্কুলে নামিয়ে তুমি কত দিন স্কুলের সামনে ফুটপাতে বসে থেকেছ। তুমি কত কষ্ট করেছ, আমাকে কষ্ট করিয়েছ মা, শুধু আমাকে লেখাপড়া শিখতে হবে বলে। আমাকে অনেক বড় মানুষ হতে হবে বলে। আমি আজ তাই এই দূর দেশে বড় হতে এসে। বড় বেশি একা হয়ে গেলাম মা। আমি আমার সবচেয়ে কাছের মানুষ আমার মাকে ছাড়া হলাম পৃথিবীর এই ভয়ংকর বিপর্যয়ের দিনে।

কেন মা? কীভাবে এই আতঙ্ক থেকে বেরিয়ে আসব বলো, মা?

এখন এই একটা অণুজীবের কাছে আমি যদি হেরে যাই মা। আর যদি কোনো দিন আমাদের দেখা না হয়। আমি ভাবতে পারি না। আমিও খুব বিষণ্ন হই, আতঙ্কিত হই মা। আতঙ্কিত হই এই ভেবে যে আমি চলে গেলে তোমার যেমন কষ্ট হবে। তুমি চলে গেলে আমার যেমন কষ্ট হবে। তেমন কষ্ট তো ওই মায়েরও হচ্ছে বলো, যার ছেলেটা মেয়েটা আজ এই মুহূর্তে মারা গেল।
যার মা আজই মারা গেল।
অসময়ে কেন আমরা পরাজিত হচ্ছি। কেন আমরা পরাজিত হলাম, মা।
জানো মা, অনেকেই বলে পাপ।
বলে শাস্তি।
আচ্ছা মা যে শিশুটির পাপের বয়স হয়নি, তার শাস্তিটা কি জন্মপাপ মা? কে দেবে এর জবাব আজ?

গত রাতে চারটার সময় ফ্ল্যাটমেটের হাউমাউ কান্নায় আমি দৌড়ে তার রুমে গেলাম। কেমন উদ্‌ভ্রান্তের মতো সে কাঁদছে। আমার চেয়ে না হলেও বছর পাঁচেকের বড় ভাইয়াটা। তবু সে আমাকে পাগলের মতো আঁকড়ে ধরে শিশুর মতো কাদঁছিল। ভয়ংকর এক স্বপ্ন দেখেছে। সারা শরীর অদ্ভুত পোশাকে আবৃত কতগুলো লোক নাকি তাকে মোটা পলিথিনে পেঁচিয়ে টেনে নিয়ে যাচ্ছে কবরের কাছে। সে মরতে চায় না বলে সেই কী আর্তনাদ!

বাকি রাতটুকু আমরা আর ঘুমাইনি।

জানো মা, আমি তখন তোমার মতো সাহসী হয়ে গিয়েছিলাম। ঘরের আলোগুলো জ্বেলে তাকে খুব শক্ত করে বুকের মধ্যে জাপটে ধরে রাখলাম। সাহস দিলাম। তখনো খুব তোমার কথাই মনে পড়ছিল।

তুমি যে খুব করে চাও, মা। তোমার ছেলে ইনশা আল্লাহ অনেক বড় হবে। সত্যি মা তখন মনে হলো আমি বুঝি একটুখানি বড় হয়েছি। ওই ভাইয়াকে আমিই গ্রোসারি শপ থেকে খাবার এনে দিই এখন। যতটা পারি তাকে সাপোর্ট দিচ্ছি আলহামদুলিল্লাহ।

মাগো,
তবু আমার তোমাকে ছাড়া একা একা খুব কান্না পায়। তোমাকে বিশেষ ধন্যবাদ মা, তুমি আমাকে কখনো কাঁদলে বাধা দিয়ে বলোনি, ছেলেদের কাঁদতে নেই। ছেলেদেরও কাঁদতে হয়, মা। কাঁদলে বুকটা হালকা লাগে মাঝেমধ্যে। আমাকে শুধু ছেলে না, তুমি মানুষ হতে শিখিয়েছ। তাই তো নিজের জন্য, সবার জন্যও কাঁদতে যেমন পারি, তেমনি সাপোর্ট দিতেও পারি।

তবু একাকিত্ব, গুমোট পরিস্থিতি, পৃথিবীর মৃত্যুযজ্ঞ আমাকে মাঝেমধ্যে অসহায় করে তোলে। খুব তোমার কাছে যেতে ইচ্ছে করে। কী অদ্ভুত বাস্তবতা!

এখন না আমি তোমার কাছে যেতে পারছি। না তুমি আসতে পারছ আমার কাছে আসতে। মুহূর্তে সৃষ্টিকর্তা আমাদের সব ক্ষমতাকে কেমন তুচ্ছ আর অসহায় বানিয়ে দিল। এখন আমরা সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ হয়েও মৃত্যুর জন্য পিঁপড়াদের মিছিলে শামিল।

পৃথিবীর যেখানেই তুমি থাকো আর যেখানেই আমি থাকি মা, আমরা এখনো বেঁচে আছি আলহামদুলিল্লাহ। এটাও পৃথিবীর বড় বিস্ময়। আল্লাহর অনেক বড় নিয়ামত। তাই নিজের খেয়াল রেখো। তুমি ছাড়া আমার পৃথিবীটা আমি ভাবতে পারি না মা। তুমি আমার খুব সাহসী মা। আমি জানি। আমিও তোমারই ছেলে। আমিও সাহসী হচ্ছি। আরও হব ইনশা আল্লাহ।

মা,
তুমি খুব সাহসের সঙ্গে বলো, তুমি মৃত্যুকে সেভাবে ভয় পাও না। নির্ধারিত নিয়তিকে তুমি সহজে মেনে নিতে পারো। তোমার সবার প্রতি দায়িত্ব–কর্তব্য প্রায় শেষ। শোনো মা, আমি সাহসী হলেও মৃত্যুকে ভয় পাই। আমি একাকিত্ব ভয় পাই। আমি তোমাকে ছাড়া বেঁচে থাকতেও ভয় পাই। তাই আমার জন্য তোমাকে বেঁচে থাকতে হবে, মা। তোমাকে সুস্থ থাকতে হবে। আর রোজ রোজ আমাকে ফোনে কথা বলে, মেসেজ লিখে সাহস দিতে হবে। আমার জন্য আর পৃথিবীর সবার জন্য দোয়া করতে হবে। মনে থাকবে তো!

এবার এসো তো মা। আমাকে ফোনের ওই পাশ থেকেই এবার খুব করে তোমার বুকের মধ্যে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রাখো। আমিও তোমাকে ধরে রাখি মা। অনেক ভালোবাসি মা তোমায়।

আমার মা ও পৃথিবীর সব মা ভালো থেকো। সব মাকে ভালো রেখো আল্লাহ।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0