default-image

মৌলভীবাজার শহরের সবজির আড়ত, মাছের বাজার, রিকশা কিংবা টমটমে সবাই গায়ে গা লাগিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। মাস্ক ঝুলছে থুতনিতে, কেউ পকেটে রেখেছেন। আর সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) তথ্য অনুযায়ী, মৌলভীবাজার জেলায় করোনা শনাক্তের হার ৪৯ শতাংশ (বিদেশগামী বাদ দিয়ে)। তবে জেলা শহর কিংবা উপজেলাগুলোতে এ নিয়ে মানুষের কোনো বিকার নেই।

গত বুধবার আইইডিসিআরের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মুন্সিগঞ্জ, ফেনী, হবিগঞ্জ, সিলেট, রাজবাড়ী, নওগাঁ, খুলনা ও চট্টগ্রামে শনাক্তের হার ৩০ শতাংশের ওপরে। এসব জেলায়ও স্বাস্থ্যবিধি মানার চিত্র খুবই নাজুক। এসব জেলার স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা বলছেন, জেলার সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে করোনা শয্যা প্রস্তুত করা হয়েছে। তবে রোগী এখনো অনেক কম।

মৌলভীবাজার ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে করোনা রোগীদের জন্য বরাদ্দ বিছানা আছে পাঁচটি। তবে একজন রোগীও সেখানে ভর্তি নেই।

হাসপাতালে আইসিইউ থাকলেও কেন্দ্রীয় অক্সিজেন ব্যবস্থা নেই। জেলা ও উপজেলা মিলিয়ে হাসপাতালগুলোয় করোনা রোগীদের জন্য শয্যা রয়েছে ১৩০টি। এসব শয্যায় মোটে তিনজন রোগী ভর্তি রয়েছেন। বাকি রোগীরা সব বাসা-বাড়িতে চিকিৎসা নিচ্ছেন বলে স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জানান।

বিজ্ঞাপন

জেলার সিভিল সার্জন চৌধুরী জালাল উদ্দিন মুর্শেদ বলেন, মৌলভীবাজার প্রবাসী ও পর্যটন–অধ্যুষিত একটি এলাকা। দ্রুত করোনাভাইরাস সংক্রমণ বাড়ার এগুলো অন্যতম কারণ বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে দেশের অন্যান্য এলাকার মতোই এখানেও কেউ স্বাস্থ্যবিধি মানছেন না। এতে করোনার সংক্রমণ বাড়ছে।

জেলা প্রশাসন থেকে মাইকিং, মাস্ক বিতরণ এবং ভ্রাম্যমাণ আদালতে প্রায়ই জরিমানা করা হচ্ছে। তারপরও মানুষ স্বাস্থ্যবিধি নিয়ে তেমন সচেতন হচ্ছেন না।

গতকাল শনিবার সকাল ও দুপুরে মৌলভীবাজার শহরের পশ্চিম বাজারের কাঁচা বাজার ও মাছবাজার, সবজি ও মাছের আড়ত, শমশেরনগর সড়ক, সাইফুর রহমান সড়ক, চৌমোহনাসহ বিভিন্ন স্থান ঘুরে দেখা গেছে, সবখানেই মানুষের স্বাভাবিক চলাচল।

সকালে শহরের চৌমোহনা চত্বরে দুই শতাধিক শ্রমিক কাজ পাওয়ার উদ্দেশে এসে ভিড় করেন। তাঁদের দু–একজনের থুতনিতে মাস্ক ঝুলতে দেখা গেছে। সবাই কাছাকাছি দাঁড়িয়ে ও বসে গল্প-গুজব করছেন। পশ্চিম বাজার মাছের আড়তে সকালবেলা ভিড় করেন খুচরা মাছ বিক্রেতা। বিভিন্ন স্থান থেকে এখানে মাছ আসে। এদের বেশির ভাগই মাস্ক পরা বা স্বাস্থ্যবিধির ধারেকাছে নেই। একেবারে গায়ে গা লাগিয়ে চলছে বেচা-কেনা। পথের পাশে আখের রস, চানাচুর ও ঝালমুড়ি, চটপটি বেচাকেনা চলছে দেদার। বিক্রেতাদের মুখে মাস্ক নেই। ক্রেতারা সেখানেই খাচ্ছেন এসব মুখরোচক খাবার, বসেছেন গা ঘেঁষে।

মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক মীর নাহিদ আহসান গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘(গতকাল) সকালে প্রাণিসম্পদ বিভাগের একটা কর্মসূচিতে গিয়েছিলাম। দেখলাম রাস্তার উল্টো পাশে একটা ফার্মেসিতে ছয়জন লোক বসে আছেন। কেউই মাস্ক পরেননি। ন্যূনতম সচেতনতা দেখা যাচ্ছে না। পরিস্থিতি ভয়াবহ। মানুষকে সচেতন করতে আমরা মাইকিং করাব। লিফলেট বিলি করব। প্রান্তিক মানুষের মধ্যে ওয়ান টাইম মাস্ক বিতরণ না করে কাপড়ের তৈরি মাস্ক বিতরণ করব। এগুলো বানাতে দেওয়া হয়েছে। রোববার হাতে আসবে।’

মাস্ক ছাড়াই হাটবাজারে

মুন্সিগঞ্জের করোনা শনাক্তের হারও অনেক বেশি। তবে এই জেলায় কোনো আইসিইউ নেই। মুন্সিগঞ্জের জেলা হাসপাতাল ও ৫টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে করোনা রোগীদের জন্য মোট ৮০টি শয্যা রয়েছে। গতকাল এসব হাসপাতালে মোট ১৮ জন ভর্তি ছিলেন। জেলার কোনো হাসপাতালেই কেন্দ্রীয় অক্সিজেনের ব্যবস্থা নেই।

করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় সিভিল সার্জন বলেন, হাসপাতালে গত বছরের মতোই চিকিৎসাব্যবস্থা রয়েছে। চিকিৎসকদের জন্য পর্যাপ্ত মাস্ক ও পিপিই আছে। রোগীদের জন্য বর্তমানে ৮০টি অক্সিজেন সিলিন্ডার রয়েছে। কেন্দ্রীয় অক্সিজেনের অনুমতি পাওয়া গেছে। শিগগিরই স্থাপন করা হবে।

সাধারণ রোগীরা বাড়িতে থেকেই চিকিৎসা নিচ্ছেন। যাঁরা একটু বেশি অসুস্থ তাঁদের হাসপাতালে আনা হচ্ছে। তাঁদের মধ্যে কারও অবস্থা গুরুতর হলে ঢাকায় রেফার্ড করা হচ্ছে।

মুন্সিগঞ্জ সিভিল সার্জন আবুল কালাম আজাদ প্রথম আলোকে বলেন, চলতি মাসে করোনা সংক্রমণের সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। তবে মানুষ এখনো সচেতন হচ্ছে না। তিনি বলেন, গত বছর করোনার শুরুতে মানুষের মধ্যে করোনা নিয়ে আতঙ্ক ছিল। সরকারি বিধিনিষেধের প্রতিও তারা কিছুটা শ্রদ্ধাশীল ছিল। এবার মানুষ সরকারি বিধিনিষেধ মানছে না। শতকরা ৯০ ভাগ মানুষ মাস্ক ছাড়াই ঘর থেকে বাইরে যাচ্ছেন। মানুষের মধ্যে চরম উদাসীনতা তৈরি হয়েছে। যার ফলে করোনার সংক্রমণ দ্রুত বাড়ছে।

সিভিল সার্জনের কথার সত্যতা পাওয়া গেল মুন্সিগঞ্জের পথেঘাটেই। শনিবার সকাল সাড়ে ৮টা থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত মুন্সিগঞ্জ সদর উপজেলার মুন্সিরহাটে ঘুরে দেখা যায়, শতাধিক মাছ ও সবজি ব্যবসায়ী বসে আছেন পণ্য নিয়ে। পাশেই মাঠে গরু, ছাগল, হাঁস, মুরগি, কবুতরের হাট। মরিচের আড়ত, পেঁয়াজের আড়ত, মুদি, ফল, বিপণিবিতান, কনফেকশনারি, হার্ডওয়্যার, খাবারের দোকানসহ অন্যান্য ছয় শতাধিক দোকান খোলা রয়েছে। সব জায়গাতেই মানুষের ভিড়। গায়ে গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে চলছে কেনাকাটা, আড্ডা। অধিকাংশের মুখেই মাস্ক নেই।

একই অবস্থা ছিল জেলার বৃহত্তম হাটবাজার দিঘিরপাড় বাজারেও। প্রতি হাটে শরীয়তপুর থেকে মরিচ বিক্রি করতে আসেন কুদ্দুস সৈয়াল। মুখে মাস্ক নেই। জানতে চাইলে বলেন, ‘আমরা মরিচ নিয়ে সারা দিন পড়ে থাকি। মরিচের ঝাঁজে নাক দিয়ে সব সর্দি বের হয়ে যায়। আর মাস্ক পরে বেচা–বিক্রি করা যায় না।’

মুন্সিগঞ্জ নাগরিক সমন্বয় পরিষদের আহ্বায়ক সুজন হায়দার বলেন, করোনা নিয়ে জনগণের সচেতনতা নেই বললেই চলে। স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষা করে মানুষ যেভাবে হাটে, বাজারে, বিভিন্ন ব্যাংক ও অফিস এবং সভা-সেমিনারে জড়ো হচ্ছে, সেটা গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।

আর জেলা প্রশাসক মো. মনিরুজ্জামান তালুকদার বলেন, ‘গত বছরের তুলনায় মানুষের মধ্যে উদাসীনতাও বেড়েছে। যার ফলে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে।’

বিজ্ঞাপন

ফেনী

ফেনীর অলিগলিতে এখন মাইকিং করে মাস্ক পরা, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার বিষয়ে বলা হচ্ছে। হাটবাজারগুলোতেও পুলিশ ঘুরছে, প্রশাসনের লোকজন গিয়ে জরিমানা করছে।

এসব কর্মকাণ্ডে শহরাঞ্চলে মাস্ক পরার প্রবণতা কিছুটা বাড়লেও গ্রামাঞ্চলে এসব পালন করা হচ্ছে না। আবার এমনও দেখা গেছে, পুলিশ এলে দোকানের ঝাঁপ দ্রুত নামিয়ে দেওয়া হচ্ছে, চলে গেলে আবারও ঝাঁপ উঠছে।

জেলা ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন এস এস আর মাসুদ রানা বলেন, জনগণের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর জন্য নানাভাবে প্রচারণা, ভ্রাম্যমাণ আদালত চালানো হচ্ছে।

জেলার স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জানান, ফেনীতে করোনা রোগীদের জন্য সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে হাসপাতালে পাঁচটি আইসিইউ শয্যা রয়েছে। তবে এগুলোতে এখনো কোনো রোগী নেই। করোনা শয্যা আছে ১০২টি। এসব শয্যায় গতকাল পর্যন্ত ১৮ জন রোগী ভর্তি ছিলেন। ফেনীর হাসপাতালগুলোতে কেন্দ্রীয় অক্সিজেন রয়েছে।

করোনাভাইরাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন